Saturday, September 12, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে বাড়ছে নদীর পানি, আতঙ্কে স্থানীয়রা

ইতোমধ্যে দুই জেলায় অনেক এলাকার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে, বিপাকে পড়েছে পানিবন্দি পরিবার

আপডেট : ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:৩০ পিএম

রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে বাড়ছে পদ্মা, মহানন্দা ও পুনর্ভবা নদীর পানি। তবে এখনও বিপাদসীমা অতিক্রম করেনি। ইতোমধ্যে দুই জেলায় অনেক এলাকার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। কোথাও ঘরের আঙিনা, কোথাও বসতঘরের আশপাশে পানি জমেছে। তলিয়ে গেছে আমন-আউশ ধান, গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজ ও শাকসবজির ক্ষেত। প্লাবিত হয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এতে করে বিপাকে পড়েছেন পানিবন্দি পরিবারগুলো। 

জানা গেছে, কয়েক দিন আগেও জায়গাটি ছিল মানুষের আনাগোনায় মুখর। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবি ও ভিডিওতে কেউ কেউ জায়গাটিকে বলছিলেন রাজশাহীর ‘মিনি সুইজারল্যান্ড’। সেই চরের বড় অংশ এখন থইথই পানিতে। ঘরবাড়ি ছেড়ে শহরের দিকে চলে গেছেন অধিকাংশ বাসিন্দা। গবাদিপশু, ধান, জ্বালানি ও সংসারের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সঙ্গে নিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছুটছেন তারা। 

এর মধ্যেই পদ্মার পানি বাড়তে থাকায় পবা উপজেলার হরিপুর ইউনিয়নের বেড়পাড়া এলাকায় নদীতীর ভাঙনের শঙ্কা দেখা দিয়েছে। নদীতীর রক্ষায় বসানো ব্লকের কিছু অংশ সরে গেছে। কোথাও কোথাও ব্লকের নিচের মাটি বেরিয়ে পড়েছে। নদীর স্রোত আরও বাড়লে ভাঙন তীব্র হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। 

সরেজমিনে পবা উপজেলার হরিপুর ইউনিয়নের বেড়পাড়া বেড়পাড়া এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, নদীতীরের বিভিন্ন স্থানে ব্লক সরে গেছে। কোথাও ব্লকের নিচ থেকে মাটি ধসে পড়েছে। 

খবর পেয়ে শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফুর রহমান অঙ্কুর। 

তিনি বলেন, ‘‘রাজশাহীতে পদ্মার পানি বাড়ছে। আগামী এক থেকে দুই দিন পানি আরও কিছুটা বাড়তে পারে। তবে আপাতত বিপদসীমা অতিক্রম করার আশঙ্কা নেই।’’ 

নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফুর রহমান অঙ্কুর আরও বলেন, ‘‘আজকে (শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর) বেলা ১২টায় পদ্মার বোয়ালিয়া পয়েন্টে পানির উচ্চতা ছিল ১৭ দশমিক ২২ মিটার। এ পয়েন্টে বিপদসীমা ১৮ দশমিক ০৫ মিটার। অর্থাৎ বিপদসীমার ৮৩ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। পানির উচ্চতা ও স্রোত বাড়ায় নদীর কয়েকটি এলাকায় ভাঙনের প্রবণতা দেখা দিয়েছে।’’ 

রাজশাহীর পবা উপজেলার হরিপুর ইউনিয়নের বেড়পাড়া এলাকার নদীতীরে বাড়ি বেগম জাহানের। আতঙ্কিত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘‘পদ্মার পানি আর এক ধাপ বাড়লেই আমার বাড়ি পানির নিচে চলে যাবে। চোখের সামনে নদীর ব্লক সরে যেতে দেখে প্রতিদিনই ভয় বাড়ছে। আমার বাড়িটি এখন চরম ঝুঁকিতে, কখন কী হয় সেই আতঙ্কে আছি। দ্রুত নদীতীর রক্ষায় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাই।’’ 

পবা উপজেলার হরিপুর ইউনিয়নের স্থানীয় বাসিন্দা ও রাজশাহী জেলা যুবদলের সদস্য ফরিদুল ইসলাম সাহেব জাদা বেড়পাড়া এলাকায় নদী রক্ষা ব্লক সরে যাওয়ার ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘‘পদ্মার তীর রক্ষায় বসানো ব্লকগুলো ক্রমেই সরে যাচ্ছে। কীভাবে কাজটি করা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার কে, তা খতিয়ে দেখা দরকার। কেন ব্লক সরে গেল, সে বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাদের তদন্ত করা উচিত।’’ 

পবা উপজেলার হরিপুর ইউনিয়নের বেড়পাড়া থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে হরিয়ান ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের চর খিদিরপুরের ‘মিডিল চরে’ এখন অন্য রকম দুর্ভোগ। কিছুদিন আগেও যে চর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘মিনি সুইজারল্যান্ড’ নামে পরিচিতি পেয়েছিল, পানি বাড়ায় সেই চরের বড়ো অংশ এখন ডুবে গেছে। 

পবা উপজেলার হরিয়ান ইউনিয়নের ইউপি সদস্য শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘‘চরে এখন হাতে গোনা কয়েকজন মানুষ আছেন। অধিকাংশ পরিবার গরু-ছাগল নিয়ে শহরে চলে গেছে। কেউ আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে, কেউ ভাড়া বাড়িতে উঠেছেন।’’ 

তার হিসাবে, চরটিতে প্রায় ১০ হাজার গবাদিপশু রয়েছে। এসব পশুর জন্য পবার খড়খড়ি এলাকায় বিসিক শিল্পনগর-২ এবং নগরীর বিনোদপুর এলাকার বেতার মাঠে জায়গা করে দিয়েছে জেলা প্রশাসন। তবে এতো বিপুলসংখ্যক গবাদিপশুর খাবার জোগাড় করাই এখন বড় সমস্যা। 

এই চরের বাসিন্দা মনোয়ারা বেগম বলেন, ‘‘শহরে থাকার জায়গা পাওয়া কঠিন। তার ওপর গরু-ছাগল রাখারও জায়গা নেই। নিজেরাই যখন খাবারের সংকটে, তখন গবাদিপশুর খাবার জোগাড় করা বড় চিন্তার বিষয়। চর খিদিরপুরে প্রায় দুই শতাধিক বাড়ি রয়েছে।’’ 

রাজশাহী জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘‘চর খিদিরপুরে পানি ওঠায় প্রায় ২০০ পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাদের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ করা হয়েছে। ত্রাণসামগ্রীর মধ্যে প্রায় ২৫ ধরনের পণ্য রয়েছে। বন্যাকবলিত মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে চর ও মাঝারচরসহ তিনটি স্থানে মেডিক্যাল ক্যাম্প পরিচালনা করা হচ্ছে। পানিবাহিত রোগ প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় ওষুধও দেওয়া হচ্ছে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ ও তাঁদের গবাদিপশুর জন্য আপাতত ভ্রাম্যমাণভাবে আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে। চর খিদিরপুরে প্রায় ১০ ফুট উঁচু দুটি বড় আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণের প্রস্তাব সরকারের কাছে পাঠানো হয়েছে। সেখানে মানুষের পাশাপাশি কয়েক হাজার গবাদিপশু রাখার সুযোগ থাকবে।’’ 

এদিকে, শুক্রবার বেলা সাড়ে ১১ টায় রাসিক প্রশাসক মাহফুজুর রহমান রিটন সরেজমিনে ফুটওভার ব্রিজটি পরিদর্শন করেন। এ সময় তিনি ব্রিজের বিভিন্ন অংশ ঘুরে দেখেন এবং ফাটলের বর্তমান অবস্থা পর্যবেক্ষণ করেন। পরিদর্শনকালে রাসিক প্রশাসক সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের সঙ্গে কথা বলেন এবং ফাটলটি দ্রুত মেরামতের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা প্রদান করেন। 

অন্যদিকে চাঁপাইনবাবগঞ্জে হু হু করে বাড়ছে পদ্মা, মহানন্দা ও পুনর্ভবা নদীর পানি। টানা সাত দিনের পানি বৃদ্ধিতে জেলার সদর ও শিবগঞ্জ উপজেলার নদীতীরবর্তী পাঁচটি ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল  প্লাবিত হয়েছে। কোথাও ঘরের আঙিনা, কোথাও বসতঘরের আশপাশে পানি জমেছে। তলিয়ে গেছে আমন-আউশ ধান, গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজ ও শাকসবজির ক্ষেত। প্লাবিত হয়েছে ১৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। প্রশাসনের হিসাবে ইতোমধ্যে পানিবন্দী হয়ে পড়েছে প্রায় আড়াই হাজার পরিবার। এর মধ্যে সদর উপজেলায় প্রায় ১ হাজার ৮০০ এবং শিবগঞ্জে ৭০০ পরিবার রয়েছে। 

পানি উন্নয়ন বোর্ড বলছে, আপাতত তিন নদীর কোনোটি বিপদসীমা অতিক্রম করার আশঙ্কা নেই। 

শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) পূর্বাভাস অনুযায়ী পর্যন্ত পানি বাড়তে পারে, এরপর কমতে শুরু করার সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু নদীর পানি বিপদসীমার কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়ায় নিম্নাঞ্চলের মানুষের দুর্ভোগ এরই মধ্যে প্রকট হয়ে উঠেছে। 

সবচেয়ে বড় সংকট দেখা দিয়েছে যাতায়াত, বিশুদ্ধ পানি, রান্না, গবাদিপশু ও ফসল রক্ষা নিয়ে। ফলে বড় বন্যার আশঙ্কা না থাকলেও প্রশ্ন উঠেছে, পানি আরও বাড়লে নিম্নাঞ্চলের এই বিপুলসংখ্যক মানুষকে কতটা দ্রুত সহায়তার আওতায় আনা যাবে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) পদ্মার পাঙ্খা গেজ স্টেশনে পানির উচ্চতা ২১ দশমিক ৭৬ মিটার রেকর্ড করা হয়েছে। এ পয়েন্টে বিপদসীমা ২২ দশমিক ০৫ মিটার। অর্থাৎ বিপদসীমার মাত্র ২৯ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে পদ্মার পানি। 

শুধু পদ্মা নয়, জেলার অন্য দুই প্রধান নদী মহানন্দা ও পুনর্ভবার পানিও বাড়ছে। মহানন্দার খালঘাট গেজ স্টেশনে পানির উচ্চতা ১৯ দশমিক ৪৩ মিটার। এ নদীর বিপদসীমা ২০ দশমিক ৫৫ মিটার। অন্যদিকে পুনর্ভবার রহনপুর গেজ স্টেশনে পানির উচ্চতা ১৯ দশমিক ৪৬ মিটার, বিপদসীমা ২১ দশমিক ৫৫ মিটার। গত ২৪ ঘণ্টায় মহানন্দা ও পুনর্ভবা, দুই নদীতেই পানি বেড়েছে ১০ সেন্টিমিটার করে।

পদ্মার পানি বাড়ায় সদর চাঁপাইনবাবগঞ্জ উপজেলার নারায়ণপুর এবং শিবগঞ্জ উপজেলার দুর্লভপুর, পাঁকা ও চরাঞ্চলের নিম্নভূমিতে পানি ঢুকেছে। শিবগঞ্জের পাঁকা ইউনিয়নের চরপাঁকা, লক্ষ্মীপুর ও নতুনপাড়া এলাকায় বেশ কিছু বসতবাড়িতে পানি ঢোকার খবর পাওয়া গেছে। ইউনিয়ন পরিষদ ভবনসহ বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে তলিয়ে যাওয়ার কথাও স্থানীয়ভাবে জানা গেছে। 

চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার নারায়ণপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. নাজির হোসেন জানান, পদ্মায় পানি দ্রুত বাড়ছে। এখনও সব এলাকায় বাড়িঘর ও রাস্তায় পানি ঢোকেনি। তবে কয়েকটি স্থানে নদীভাঙন চলছে। পানি এভাবে বাড়তে থাকলে পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে। 

চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জের দুর্লভপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান গোলাম আজম জানান, ইউনিয়নের কয়েকটি নিম্নাঞ্চলে পানি ঢোকার আশঙ্কা রয়েছে। ইতোমধ্যে কিছু পাকা আউশ ধানখেত পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। কৃষকেরা দ্রুত ধান কেটে ঘরে তোলার চেষ্টা করছেন। 

চাঁপাইনবাবগঞ্জের পাঁকা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল মালেক বলেন, পানি বৃদ্ধির কারণে চরপাঁকা, লক্ষ্মীপুর ও নতুনপাড়া এলাকায় বেশ কিছু বাড়িতে পানি ঢুকেছে। পানিবন্দি পরিবারগুলোর তালিকা তৈরি করে সংশ্লিষ্ট দফতরে পাঠানো হচ্ছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য সহায়তা চাওয়া হয়েছে। 

চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক কৃষিবিদ আতিকুল ইসলাম বলেন, ‘‘বিভিন্ন ফসলি জমি পানিতে তলিয়ে গেছে। প্লাবিত এলাকার মানুষ গবাদিপশু, ঘরের জিনিসপত্র ও ফসল নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে সমস্যায় পড়েছেন।’’ 

চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘‘পানি ঢুকে পড়ায় শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। এছাড়াও সদর ও শিবগঞ্জ উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়নে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, উচ্চবিদ্যালয়, কলেজ ও মাদ্রাসাসহ ১৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্লাবিত হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে সাময়িকভাবে পাঠদান বন্ধ রয়েছে।’’ 

ত্রাণ বিতরণ কর্মসূচির উদ্বোধন করেন শিবগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাজহারুল ইসলাম। তিনি বন্যাকবলিত মানুষের পাশে দাঁড়াতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহায়তা অব্যাহত রাখার কথা জানান।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা প্রশাসক আবু ছালেহ মো. মূসা জঙ্গী বলেন, ‘‘সদর উপজেলার প্রায় ১ হাজার ৮০০ এবং শিবগঞ্জ উপজেলার প্রায় ৭০০ পরিবারসহ মোট আড়াই হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর মধ্যে চাল বিতরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’’ 

   

About

Popular Links

x