নারায়ণগঞ্জে অপহরণের পর তানভীর মুহম্মদ ত্বকী হত্যার নয় বছরেও শুরু হয়নি বিচারকার্যক্রম। দীর্ঘ ৮ বছর পার হয়ে গেলেও শেষ হয়নি এ মামলাটির তদন্ত। তদন্তের শেষ কবে এ বিষয়ে নিজেও জানেন না তদন্ত কর্মকর্তা। তবে ত্বকীর বাবা-মা, আইনজীবীদের দাবি, আসামি ও নির্দেশদাতাকে বাঁচাতেই উপর মহলের নির্দেশে ইচ্ছে করে বন্ধ করে রাখা হয়েছে এ মামলার তদন্ত ও বিচারকাজ।
ত্বকীর বাবা রফিউর রাব্বি বলেন, “কেন, কী কারণে এ হত্যা এবং কারা এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত সকল কিছুই এখন সুস্পষ্ট। কিন্তু নয় বছর হলেও এখনও চার্জশিট দাখিল করতে পারেনি র্যাব। অতএব বোঝাই যাচ্ছে প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ ছাড়া এখন কিছুই সম্ভব না। সেটা ত্বকী হত্যার বিচারও না।”
রবিবার (৬ মার্চ) সকালে বন্দরে সিরাজ শাহ’র আস্তানা, বন্দর, ত্বকীর কবরে পুষ্পস্তবক অর্পণ শেষে সদ্য নির্বাচিত মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী বলেন, “ত্বকী হত্যায় নারায়ণঞ্জের প্রভাবশালী পরিবার জড়িত বিধায় বিচারকার্য বিলম্বিত হচ্ছে। কিন্তু আমরা চাই না প্রতি মাসের ৮ তারিখ ত্বকী হত্যার প্রতিবাদ ও বিচার চেয়ে আর কোনো মোমশিখা প্রজ্জ্বলন হোক। আমরা দ্রুত এ হত্যাকাণ্ডের বিচার চাই।”
মামলার বর্তমান অবস্থা:
আদালত সূত্রে জানা যায়, আগামী ২২ মার্চ মামলার পরবর্তী তারিখ ধার্য করেছেন। এর আগে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি নারায়ণগঞ্জের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট নুসরাত সাহারা বিথীর আদালতে হাজিরা দেন মামলার কয়েক আসামি।
"গত ৯ বছরে একাধিকবার চার্জশিট দ্রুত দাখিল ও বিচারকার্য শুরু করার জন্য আবেদন করা হলেও আদালত তেমন কোনো আমলে নেয়নি" বলে জানান ত্বকী হত্যা মামলার বাদীপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট প্রদীপ ঘোষ বাবু।
তিনি বলেন, “র্যাবের তদন্ত কার্যক্রম এখনও শেষ হচ্ছে না। কেন এ বিচার শুরু হচ্ছে না সেটাও সকলেরই জানা। কারা এবং কে এর পেছনে আছেন তা কারো অজানা নয়। এখন প্রধানমন্ত্রীর কাছে একটাই আবেদন ত্বকী হত্যা মামলার বিচার সম্পন্ন করা হোক।”
এদিকে, মামলার তদন্তের অগ্রগতি প্রসঙ্গে মামলার বর্তমান তদন্তকারী কর্মকর্তা র্যাব-১১ এর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (এএসপি) মশিউর রহমান জানান, এ ব্যাপারে আমাদের বলার কোনো এখতিয়ার নেই।
২০১৩ সালের ৬ মার্চ বিকালে পাঠাগারে যাওয়ার পথে নারায়ণগঞ্জের বঙ্গবন্ধু সড়ক থেকে তানভীর মুহম্মদ ত্বকীকে অপহরণ করা হয়। ঘটনার দিন রাতেই ত্বকীর বাবা রফিউর রাব্বি নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানায় বিষয়টি উল্লেখ করে সাধারণ ডায়েরি করেন এবং র্যাব-১১ এর কার্যালয়ে চিঠি দেন। এর দু’দিন পর ৮ মার্চ সকালে শীতলক্ষ্যা নদীর খালের পাড় থেকে ত্বকীর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। সেই রাতেই ত্বকীর বাবা বাদী হয়ে নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানায় দণ্ডবিধি ৩০২/৩৪ ধারায় আসামি অজ্ঞাত উল্লেখ করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। একই বছর ১৮ মার্চ তিনি জেলা পুলিশ সুপারের কাছে ত্বকী হত্যার জন্য প্রয়াত সাংসদ নাসিম ওসমানের ছেলে আজমেরী ওসমান, শামীম ওসমান ও তার ছেলে অয়ন ওসমানসহ আটজনের নাম উল্লেখ করে একটি অবগতিপত্র দেন।
সদর থানা পুলিশ মামলার তদন্ত শুরু করলে পরবর্তীতে মামলাটি উচ্চ আদালতের নির্দেশে ২০১৩ সালের ২০ জুন ত্বকী হত্যা মামলাটি র্যাবের-১১’র কাছে হস্তান্তর করা হয়। হত্যা মামলায় জড়িত সন্দেহে সুলতান শওকত ওরফে ভ্রমর ও ইউসুফ হোসেন লিটন নামে দুজনকে গ্রেপ্তার করলে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন ইউসুফ হোসেন লিটন ও সুলতান শওকত ওরফে ভ্রমর। তাদের জবানবন্দিতে উঠে আসে হত্যাকাণ্ডে জড়িত ১১ জন ও নির্দেশদাতা আজমেরী ওসমানের নাম।
আজমেরী ওসমান তৎকালীন নারায়ণগঞ্জ ৫ নং আসনের সাংসদ নাসিম ওসমানের ছেলে ও বর্তমানে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের আলোচিত এমপি এমকেএম শামীম ওসমানের ভাতিজা। সে একাধিক হত্যা, মাদক ও চাঁদাবাজি মামলার আসামি।
এ বিষয়ে মামলার আসামি আজমেরী ওসমানের সাথে যোগাযোগ করা হলে তাকে পাওয়া যায়নি।
নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনকে কেন্দ্র করেই এ হত্যাকাণ্ড:
২০১৪ সালের ৫ মার্চ ত্বকী হত্যার ১ বছরের মাথায় র্যাব-১১’র তৎকালীন কর্মকর্তা কর্নেল জিয়াউল আহসান এ হত্যাকাণ্ডের কারণ, আসামি ও নির্দেশদাতার নাম উল্লেখ করে খসড়া চার্জশিট গণমাধ্যমের সামনে তুলে ধরেন।
সেই সময় র্যাবের দেওয়া তথ্যানুসারে বর্তমান মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভী’র ২০১১ সালের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব ছিলেন ত্বকীর বাবা রফিউর রাব্বি। আর আওয়ামী লীগের নেতা শামীম ওসমান ছিলেন দলের সমর্থিত প্রার্থী। ওই নির্বাচনে আইভীর কাছে বিপুল ভোটে পরাজিত হন শামীম ওসমান। এছাড়া ত্বকীর বাবা যাত্রী অধিকার সংরক্ষণ ফোরামের আহ্বায়ক রফিউর রাব্বি বিভিন্ন সময় ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রুটে চলাচলকারী বিভিন্ন পরিবহনের মালিক ওসমান পরিবারের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ আনেন। মূলত রফিউর রাব্বিকে শায়েস্তা করতেই তার ছেলে তানভীর মুহম্মদ ত্বকীকে হত্যা করা হয়, বলেও সেই সময় জানায় র্যাব।
এ বিষয়ে তখন কর্নেল জিয়াউল আহসান এক গণমাধ্যমকে বলেছিলেন, নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের তৎকালীন সাংসদ (প্রয়াত) নাসিম ওসমানের ছেলে ও নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সাংসদ শামীম ওসমানের ভাতিজা আজমেরীর পরিকল্পনা, নির্দেশনা ও উপস্থিতিতেই ওই হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছিল।
উল্লেখ্য, তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী হত্যা ও বিচারহীনতার ৯ বছর উপলক্ষে নারায়ণগঞ্জ ও ঢাকায় পাঁচ দিনব্যাপী কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে। ৬ মার্চ রবিবার সকাল সাড়ে আটটায় বন্দর খেয়াঘাট থেকে সিরাজ শাহ’র আস্তানা, বন্দর, নারায়ণগঞ্জে ত্বকীর কবরে পুষ্পস্তবক অর্পণ ও মিলাদ মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়।
৭ মার্চ সোমবার বিকাল তিনটায় নারায়ণগঞ্জের শেখ রাসেল পার্কে রয়েছে শিশু সমাবেশ, চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা ও পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠান। ৮ মার্চ মঙ্গলবার বিকাল পাঁচটায় শীতলক্ষ্যা নদীর পাঁচ নং খেয়াঘাটে নারায়ণগঞ্জ সাংস্কৃতিক জোটের উদ্যোগে সাংস্কৃতিক পরিবেশনা, ত্বকীকে নিয়ে নির্মিত প্রামান্য চলচ্চিত্র প্রদর্শন ও “আলোরভাসান”। ১১ মার্চ শুক্রবার বিকাল তিনটায় নারায়ণগঞ্জ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সমাবেশ। ১৮ মার্চ শুক্রবার বিকাল তিনটায় ঢাকার জাতীয় জাদুঘরের সুফিয়া কামাল মিলনায়তনে “সপ্তম জাতীয় ত্বকী চিত্রাঙ্কন ও রচনা প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠান।



