Thursday, June 04, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

পরিকল্পনার অভাবে অবহেলায় শিক্ষাখাত

অর্থমন্ত্রী পাচার করা টাকা ফেরত আনায় সাধারণ ক্ষমা ঘোষণায় যতটা আন্তরিক ততটাই অনাগ্রহী শিক্ষাখাত নিয়ে। কোভিডের পর জাতির মেরুদণ্ড গঠনে এই শিক্ষাখাতই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাওয়ার কথা ছিল

আপডেট : ১৭ জুন ২০২২, ০৭:২৮ পিএম

এবার শিক্ষাখাতে বরাদ্দ সামান্যই বেড়েছে, আর জিডিপির তুলনায় কমেছে। ২০২০-২১ অর্থবছরে শিক্ষায় বরাদ্দ ছিল ৭১ হাজার ৯৫৪ কোটি টাকা। যা মোট বাজেটের ১১.৯২%। আর এবারের বাজেটে এই খাতে বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে ৮১ হাজার ৪৪৯ কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের ১২.০১%।

এবার শিক্ষাখাত আলাদা করা হলেও আগের দুই অর্থবছরে শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতকে এক করে দেখানো হয়েছে। তাই এবারো শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাত একসঙ্গে করলে এবার প্রস্তাবিত বাজেটে বরাদ্দ কমেছে। এবারের বাজেট এই দুইটি খাত মিলিয়ে বরাদ্দ কমেছে ১%।

শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতে চলতি বাজেটে বরাদ্দ আছে ৯৪ হাজার ৮৭৮ কোটি টাকা। প্রস্তাবিত বাজেটে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ৮৭ হাজার ৭৪০ কোটি টাকা। যা চলতি বাজেটের চেয়ে সাত হাজার কোটি টাকা কম।

আর জিডিপির হিসেবেও বরাদ্দ কমেছে। প্রস্তাবিত বাজেটে শিক্ষা ও প্রযুক্তিতে যে বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে, তা জিডিপির ২.২৫%। আর চলতি অর্থ বছরের বাজেটে ২.৭৫%। এবারের প্রস্তাবিত বাজেটের আকার ছয় লাখ ৭৮ হাজার ৬৪ কোটি টাকা।

এইসব তথ্য উপাত্তে এটা স্পষ্ট যে, শিক্ষাখাতে যে কম বাজেট দেওয়া হয় তার মধ্যেই হিসাবের ফাঁকি আছে। আগের দুই বছর শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাত এক করে বরাদ্দ বেশি দেখিয়ে সেখান থেকে অর্থ নেওয়া হয়েছে রূপপুর পারমানবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে।

ইউনেস্কো তথা আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মোট বাজেটের ২০% অথবা জিডিপির ৬% শিক্ষাখাতে বরাদ্দ থাকা উচিত। কিন্তু বাংলাদেশে তা কখনোই বাজেটের ১২% বা জিডিপির ৩%-এর বেশি হয়নি।

বাজেটের শতাংশ হিসেবে সবচেয়ে বেশি শিক্ষাখাতে বরাদ্দ ছিলো বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনামলে ১৯৭২ সালে। ওই বছর মোট ৭৮৬ কোটি টাকা বাজেটের মধ্যে ১৭৩ কোটি টাকা শিক্ষায় বরাদ্দ দেওয়া হয়। যা ছিল মোট বাজেটের ২২%।

শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কায়কোবাদ বলেন, “একমাত্র বঙ্গবন্ধুর সময় ছাড়া আর কখনোই শিক্ষাখাততে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। আন্তর্জাতিক মানের বরাদ্দ তো দূরের কথা আমরা আমাদের সমকক্ষ দেশগুলোর তুলনায় অনেক কম বরাদ্দ দিচ্ছি।”

আর শিক্ষা গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক মজিবুর রহমান বলেন, “এই বরাদ্দের মধ্যেও অনেক ফাঁকি আছে। যেসব খাতে বরাদ্দ প্রয়োজন সেখানে নাই। আর নানামুখী শিক্ষা ব্যবস্থার কারণে সেটা ভাগ হচ্ছে নানাভাবে। কেন্দ্রীয়ভাবে শিক্ষার উন্নয়নে এককভাবে তা ব্যবহার করা যায় না।”

মাহমুদ হোসেন অপু/ঢাকা ট্রিবিউন

শিক্ষায় কেন এই অবহেলা?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ড. সিদ্দিকুর রহমান মনে করেন, বাজেটে শিক্ষায় বরাদ্দ বাড়ানো উচিত। কিন্তু তার আগে দরকার বরাদ্দের অর্থ খরচ করার দক্ষতা অর্জন।

তিনি বলেন, “আপনারা খোঁজ নিয়ে দেখেন, যা বরাদ্দ হয় তাও খরচ করতে পারে না। আর বরাদ্দের একটি অংশ দুর্নীতি খেয়ে ফেলে। তাহলে সমস্যা কোথায়? সমস্যা হলো বাংলাদেশে শিক্ষা খাত নিয়ে কাজ করার জন্য পর্যাপ্ত দক্ষ ও যোগ্য লোক গড়ে তোলা যায়নি। ফলে শিক্ষার মাধ্যমে মানব সম্পদ উন্নয়ন করে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার সঠিক পরিকল্পনা নেই।”

তিনি বলেন, “এখনো আমরা এমএ-বিএ পাস করানোর পরিকল্পনায় আছি। দেশের জন্য প্রয়োজনীয় জনশক্তি তৈরির শিক্ষা পরিকল্পনা আমাদের নেই। যার ফলে বাজেটে বরাদ্দ বাড়ে না। আর যারা বাড়তি বাজেট চান তারা পরিকল্পনা দিতে পারেন না।”

তার কথা, “সঠিক পরিকল্পনা, সঠিক বাস্তবায়ন এবং যোগ্য লোক দরকার শিক্ষার উন্নতির জন্য। তাহলে বাজেট বাড়িয়ে কাজ হবে। তা না হলে বাজেট বাড়ালেও তা খরচ হবে না। আর যা খরচ হবে তার একটি অংশ দুর্নীতিবাজদের পকেটে যাবে।”

শিক্ষাবিদ ড. মোহাম্মদ কায়কোবাদ বলেন, “একটি জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলার জন্য শিক্ষার বিকল্প নেই। কিন্তু আমাদের এখানে আমরা কী করতে চাই তাই তো জানি না। সৃজনশীল প্রশ্নভিত্তিক শিক্ষা চালু করা হলো তাতে কোনো ফল হল না। এখন আবার শিক্ষা পদ্ধতির আমূল পরিবর্তন করা হচ্ছে। তার কি প্রস্তুতি আছে? কোভিডের সময় টেলিভিশন ও অনলাইনে শিক্ষা ঠিকমত দেওয়া গেল না। ডিভাইস না থাকায় শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ শিক্ষা কার্যক্রমে অংশ নিতে পারেনি। এই বাজেটে তাদের জন্য কোনো পরিকল্পনা নাই। মানব সম্পদই যে বড় সম্পদ এটা আমাদের বাজেটে প্রতিফলিত হয়নি। আমরা যে বড় বড় প্রকল্প করব, অর্থনৈতিক পরিকল্পনা  বাস্তবায়ন করব, তা কারা করবেন? সেটা স্পষ্ট হলে শিক্ষায় গুরুত্ব দেওয়া হত।”

শিক্ষা গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক মো. মজিবুর রহমান বলেন, “আমরা ধার করা জ্ঞান ও প্রযুক্তি দিয়েই চলবো কী না সেটার সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না নীতি নির্ধারকেরা। তাই তারা শিক্ষাখাতকে অবহেলা করছেন। আগামী বছর থেকে যে শিক্ষা ব্যবস্থা বাস্তবায়ন হতে যাচ্ছে তার জন্য প্রচুর দক্ষ শিক্ষক লাগবে। বাজেটে তার জন্য বরাদ্দ কোথায়? আর শিক্ষকদের বেতন কাঠামো উন্নত না করলে তো মেধাবীরা শিক্ষক হতে চাইবেন না।”

ফাইল ছবি

গন্তব্য কোথায়?

বাংলাদেশের সমান কাতারের কোনো দেশেই বাজেট অনুপাতে শিক্ষা খাতে এত কম বরাদ্দ দেওয়া হয় না। জিডিপির ৪%-এর বেশি বরাদ্দ ওইসব দেশে।

অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কায়কোবাদ বলেন, “আমাদের সম কাতারে থেকে কোরিয়া, সিঙ্গাপুর শিক্ষায় বিনিয়োগ করে কত উপরে উঠেছে। ওয়ার্ল্ড র‌্যাংকিং-এ দেখা গেল ভারতের ৪৪ টি, পাকিস্তানের ১৩টি বিশ্ববিদ্যালয় জায়গা করে নিয়েছে। আমাদের দেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ই বছরের পর বছর সেখানে জায়গা পাচ্ছে না। এটা দেখেই তো বোঝা যায় শিক্ষাকে অবহেলা করে আমরা কোন দিকে যাচ্ছি।”

বৈশ্বিক জ্ঞান সূচকে বাংলাদেশের অবস্থাও বেশ খারাপ। ১৩৮টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থা ১১২তম। বাংলাদেশের উপরে রয়েছে নেপাল, শ্রীলঙ্কা, ভুটান, ভারত, পাকিস্তান।

মোহাম্মদ মজিবুর রহমান বলেন, “বাজেটের একটি দর্শন আছে। এই বাজেটে যে দর্শন আমরা দেখতে পাচ্ছি তার মধ্যে শিক্ষার দর্শন স্পষ্ট নয়। ফলে আমাদের বাইরে থেকে ধার করা জ্ঞান ও প্রযুক্তিতে চলতে হবে বছরের পর বছর। এটা হলো জ্ঞানের পরাধীনতা। আর সেটা যদি হয় তাহলে শেষ পর্যন্ত কোনো উন্নয়নই টেকসই হয় না।”

তার কথা, “শিক্ষা একটি সার্বিক বিষয়। এর জন্য গবেষণা, যোগ্য শিক্ষক এবং অবকাঠামো দরকার হয়। বাজেটে তার কোনো পরিকল্পনার ছাপ নেই। যার ফল হলো আমরা অন্যদের তুলনায় পিছিয়ে পড়ছি।”

আর অধ্যাপক ছিদ্দিকুর রহমান মনে করেন, “এমনিতেই বরাদ্দ কম, তার ওপর পরিকল্পনাহীন বরাদ্দ আমাদের শিক্ষিত জনগোষ্ঠীকে বোঝায় পরিণত করছে। এক সময় হয়তো আমাদের কৃষি উৎপাদন, শিল্প উৎপাদনসহ আরও অনেক সেবা খাতে লোক পাওয়া যাবে না।”

   

About

Popular Links

x