মুন্সিগঞ্জ সদর উপজেলার বিনোদপুর রাম কুমার উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষক হৃদয় চন্দ্র মণ্ডলের বিরুদ্ধে ধর্ম অবমাননার কথিত অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। তাকে মামলা থেকে অব্যাহতি দিয়েছেন আদালত।
বুধবার (১৭ আগস্ট) বেলা ১১টার দিকে মুন্সিগঞ্জ আমলী আদালত-১-এর বিচারক জশিতা ইসলাম এ আদেশ দেন।
এর আগে, ৮ আগস্ট আদালতে পুলিশের দেওয়া চূড়ান্ত প্রতিবেদনে হৃদয় মণ্ডলের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হয়। এই শিক্ষকের আইনজীবী শাহীন মোহাম্মদ আমানউল্লাহ ঢাকা ট্রিবিউনকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
আইনজীবী শাহীন মোহাম্মদ আমানউল্লাহ জানান, পুলিশের চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদনে শিক্ষক হৃদয় চন্দ্র মণ্ডলের বিরুদ্ধে আনা ধর্ম অবমাননার অভিযোগ প্রমানিত হয়নি। মঙ্গলবার মামলার তারিখ অনুযায়ী হৃদয় চন্দ্র আদালতে হাজিরা দেন। আদালত পুলিশের চূড়ান্ত প্রতিবেদন আমলে নিয়ে বুধবার তাকে মামলা থেকে অব্যাহতির আদেশ দেন।
‘ভয় কাটছে না, এখনও হুমকি পাচ্ছি’
এদিকে, এখনও তিনি ও তার পরিবারকে হুমকি ও ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষক হৃদয় চন্দ্র।
তিনি বলেন, “আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ যে মিথ্যা ছিল অবশেষে তা প্রমাণিত হলো।”
আরও পড়ুন-
- বিজ্ঞান শেখাতে গিয়ে শিক্ষার্থীদের রোষে পড়া শিক্ষক হৃদয় মন্ডলের জামিন হয়নি
- বিজ্ঞান শেখাতে গিয়ে জেলখাটা শিক্ষক হৃদয় মণ্ডলের বিশেষ সাক্ষাৎকার
- বিজ্ঞান শেখাতে গিয়ে ‘ধর্ম অবমাননা’, অভিযোগ থেকে মুক্তি পেলেন হৃদয় মন্ডল
“কিন্তু মামলায় অব্যাহতি পেলে কী হবে, এখনও নিয়মিত ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে আমাকে। কর্মস্থলে বহিরাগতরা এসে আক্রমণাত্মক কথাবার্তা বলছে। এছাড়া মোবাইল ফোনে হুমকি-ধামকি দেওয়া হচ্ছে। দেড় মাস আগে অজ্ঞাত এক ফোন নম্বর থেকে হুমকি এলে মুন্সিগঞ্জ সদর থানায় জিডি করি। এক মাস পর আরেকটি অজ্ঞাত নম্বর থেকে হুমকি আসে। বিষয়টি জানালে পুলিশের উপ-পরিদর্শক অমর রায় নম্বরটি ব্লক করে দিতে বলেন।”
বিজ্ঞানের এই শিক্ষক বলেন, “এখন বেশিরভাগ সময় বাসায়ই থাকি। কারণ আমার বাসা সিসিটিভি ক্যামেরার আওতাভুক্ত। পুলিশ রাতের বেলায় কম বের হতে পরামর্শ দিয়েছে।”
গত ২০ মার্চ মুন্সিগঞ্জের বিনোদপুর রামকুমার উচ্চ বিদ্যালয়ে দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞান ক্লাস নিচ্ছিলেন হৃদয় মণ্ডল। এ সময় তিনি শিক্ষার্থীদের প্রশ্নের জবাবে প্রাসঙ্গিকভাবে ইসলাম ধর্ম বিষয়েও কথা বলেন।
কয়েকজন শিক্ষার্থী মোবাইল ফোনের ক্যামেরায় তার বক্তব্য রেকর্ড করে। সেই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো হলে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। এ নিয়ে অসন্তোষের জেরে স্কুল ছুটির পর ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে প্রধান শিক্ষকের কাছে লিখিত আবেদন করে শিক্ষার্থীরা।
এর পরিপ্রেক্ষিতে হৃদয় চন্দ্র মণ্ডলকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয় স্কুল কর্তৃপক্ষ।
আরও পড়ুন-
- তদন্ত কমিটি: শিক্ষক হৃদয় মণ্ডলের বিরুদ্ধে ‘ধর্ম অবমাননা’র প্রমাণ পাওয়া যায়নি
- ক্লাসে ফিরলেন হৃদয় মণ্ডল, আবার আলো আসুক বিনোদপুর স্কুলে
- হৃদয় মণ্ডলকে নিয়ে যা কিছু ঘটলো, তা কি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা?
বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় একটি পক্ষের অসন্তোষের জেরে আলোচনায় বসে স্কুল ম্যানেজিং কমিটি ও শিক্ষকরা। তবে শিক্ষার্থীদের একাংশ এ বিষয়টি নিয়ে সমঝোতা মেনে না নেওয়ায় ২২ মার্চ ক্লাস বর্জন করে। এমনকি তার শাস্তিও দাবিতে বিক্ষোভ করে।
খবর পেয়ে মুন্সিগঞ্জ থানা ও জেলা পুলিশের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে গিয়ে বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের সরিয়ে দেয়। এরপর হৃদয় চন্দ্রকে তার বাসা থেকে আটক করা হয়।
কিন্তু ২২ মার্চ বিদ্যালয়ের কার্যক্রম চলাকালীন শিক্ষার্থীদের একটি অংশ বিক্ষোভ শুরু করে। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ ও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ওই শিক্ষককে থানায় নেওয়া হয়। ওইদিনই বিনোদপুর রামকুমার উচ্চ বিদ্যালয়ের অফিস সহকারী মো. আসাদ বাদী হয়ে মুন্সিগঞ্জ সদর থানায় মামলা করেন। মামলায় হৃদয় মণ্ডলকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে তোলে পুলিশ।
২৩ ও ২৮ মার্চ দুই দফায় ওই শিক্ষকের জামিন আবেদন নামঞ্জুর করেন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত। মিথ্যা মামলার ভুক্তভোগীর আইনজীবী অ্যাডভোকেট অজয় কুমার চক্রবর্তী ম্যাজিস্ট্রেটর জামিন নামঞ্জুরের আদেশের বিরুদ্ধে দায়রা আদালতে সি. আর মিস মামলা করেন। পরে ১০ এপ্রিল প্রায় ১৯ দিন পর কারগার থেকে মুক্তি পান শিক্ষক হৃদয় চন্দ্র মন্ডল। মুন্সিগঞ্জের ভারপ্রাপ্ত অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ মোতাহারাত আক্তার ভূঁইয়ার আদালত পাঁচ হাজার টাকা বন্ডে শিক্ষক হৃদয় চন্দ্র মন্ডলের জামিন মঞ্জুর করেন।



