ঢাকার ধামরাইয়ে শতবর্ষের ঐতিহ্যবাহী রথযাত্রাকে সামনে রেখে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি চলছে। রথের সংস্কার, রং ও সাজসজ্জার কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন শিল্পী ও শ্রমিকেরা।
রথ উৎসব নির্বিঘ্নে আয়োজনের জন্য নিরাপত্তাসহ সার্বিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে উপজেলা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
আগামী ১৬ জুলাই ধামরাই বাজারের রথখোলা এলাকা থেকে যাত্রাবাড়ী পর্যন্ত রথ টানার মধ্য দিয়ে উৎসব শুরু হবে। ২৪ জুলাই উল্টোরথ অনুষ্ঠিত হওয়ার মাধ্যমে ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষ হবে। তবে রথযাত্রাকে ঘিরে ১৬ জুলাই থেকে এক মাসব্যাপী ঐতিহ্যবাহী মেলা বসবে।
মঙ্গলবার (১৫ জুলাই) দুপুরে ধামরাই উপজেলা পরিষদসংলগ্ন রথখোলা এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, রথের শেষ মুহূর্তের সংস্কার ও রংয়ের কাজ চলছে। কাঠের খোদাই, দেব-দেবীর প্রতিকৃতি ও বিভিন্ন অলংকরণে রং তুলিতে ব্যস্ত শিল্পীরা।
রংশিল্পী সঞ্জয় পাল জানান, গত ১১ বছর ধরে তিনি রথের সাজসজ্জা ও সংস্কারের কাজ করছেন। কয়েক দিন ধরে টানা রথের সংস্কারের কাজ করছেন। এটি শুধু পেশা নয়, ভালো লাগা থেকেও করে থাকেন।
আরেক রংশিল্পী প্রদীপ চৌধুরী জানান, ভগবানের কৃপা ও মানুষের আশীর্বাদ লাভের আশায় তিনি এ কাজে যুক্ত হয়েছেন। রথের প্রতিটি কাঠামোয় প্রয়োজনীয় রংয়ের কাজ চলছে। তবে বৃষ্টির কারণে কিছুটা বিঘ্ন ঘটলেও দ্রুত কাজ শেষ হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
ধামরাই যশোমাধব মন্দির পরিচালনা পর্ষদের সহসভাপতি নন্দ গোপাল সেন বলেন, ‘‘রথযাত্রা উপলক্ষে থানা, উপজেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। তারা আগের বছরের মতো এবারও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আশ্বাস দিয়েছেন। উৎসব সুষ্ঠুভাবে আয়োজনের জন্য কয়েকটি উপকমিটি গঠন করা হয়েছে এবং সেগুলো কাজ শুরু করেছে।’’
বৃষ্টির কারণে কিছুটা বিলম্ব হলেও নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই প্রস্তুতি শেষ হবে বলে তিনি আশা করেন।
ধামরাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. নাজমুল হুদা খান বলেন, ‘‘হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম বড় ধর্মীয় উৎসবকে কেন্দ্র করে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ স্থানে পুলিশ মোতায়েন থাকবে এবং উৎসব শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করতে সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’’
ধামরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আল মামুন বলেন, ‘‘রথযাত্রা উপলক্ষে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। বিষয়টি সম্পর্কে ঢাকা জেলা প্রশাসক অবগত রয়েছেন এবং প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। পুলিশসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রস্তুত রয়েছে। উপজেলা প্রশাসনও সার্বিকভাবে কাজ করছে।’’
চার শতকের ঐতিহ্য
প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী, প্রায় ৪০০ বছর আগে ধামরাইয়ের জমিদার শ্রী যশোপাল একদিন সৈন্য-সামন্ত নিয়ে যাওয়ার পথে একটি ঢিবির সামনে এসে তার হাতি থেমে যায়। পরে ঢিবি খনন করে একটি মন্দির ও কয়েকটি দেবমূর্তি পাওয়া যায়। সেগুলো বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার পর রাতে স্বপ্নে মাধব দেবতার নির্দেশ পান তিনি। এরপর নিজের নামের সঙ্গে ‘মাধব’ যুক্ত করে যশোমাধব নাম গ্রহণ করেন এবং ওই সময় থেকেই যশোমাধবের পূজা ও রথযাত্রার সূচনা হয়। সেই ঐতিহ্য আজও চলে আসছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, বাংলা ১২০৪ থেকে ১৩৪৪ সাল পর্যন্ত সাটুরিয়ার বালিয়াটির জমিদাররা বংশানুক্রমে এখানে চারটি রথ নির্মাণ করেন। ১৩৪৪ সালে নারায়ণগঞ্জের স্বর্গীয় সূর্যনারায়ণ সাহার তত্ত্বাবধানে এক বছর সময় নিয়ে একটি রথ নির্মিত হয়। ধামরাই, কালিয়াকৈর, সাটুরিয়া ও সিঙ্গাইরের কাঠশিল্পীরা যৌথভাবে ৬০ ফুট উচ্চতার ত্রিতলবিশিষ্ট রথটি নির্মাণ করেছিলেন। পরে বালিয়াটির জমিদাররা এলাকা ছেড়ে গেলে রথের দেখভালের দায়িত্ব নেয় টাঙ্গাইলের রণদাপ্রসাদ সাহার পরিবার।
২০১০ সালে পুরোনো রথের আদলে প্রায় দেড় কোটি টাকা ব্যয়ে নতুন রথ নির্মাণ করা হয়। প্রায় ৪০ জন শিল্পী ছয় মাসের বেশি সময় ধরে কাজ করে ৩৭ ফুট উচ্চতা ও ২০ ফুট প্রস্থের কারুকার্যমণ্ডিত রথটি তৈরি করেন। লোহার কাঠামোর ওপর সেগুন ও চাম্বল কাঠ বসিয়ে খোদাই করা এ রথে রয়েছে ১৫টি লোহার চাকা। সামনে রয়েছে কাঠের তৈরি দুটি ঘোড়া ও একজন সারথির অবয়ব। বিভিন্ন স্তরে স্থাপন করা হয়েছে কাঠের তৈরি দেব-দেবীর মূর্তি।
রথটির দেখভালের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা জানান, সারা বছর খোলা আকাশের নিচে থাকায় রথের রং কিছুটা মলিন হয়ে যায়। তাই প্রতি বছর রথযাত্রার আগে প্রয়োজনীয় সংস্কার, রং ও সাজসজ্জার কাজ করা হয়। এরপর এই রথেই অনুষ্ঠিত হয় ধামরাইয়ের ঐতিহ্যবাহী রথযাত্রা।



