“আগে ময়লার গন্ধে বমি আইসা পড়ত, কিন্তু এহন অভ্যাস হইয়া গেছে।”
রাস্তায় আবর্জনা কুড়ানোর কাজ করে ১৪ বছর বয়সী ফরহাদ হোসেন। রাজধানীর রায়েরবাজারে বাবা-মায়ের সঙ্গে থাকে সে। তৃতীয় শ্রেণির পর আর্থিক অনটনে তার আর সুযোগ হয়নি স্কুলে যাওয়ার।
সারাদিন নির্দিষ্ট এলাকা থেকে ময়লা কুড়িয়ে স্তুপে ফেলে আসা, গাড়ি পরিষ্কার, ধরন অনুযায়ী ময়লাগুলোকে ভাগ করা এগুলোই তার কাজ। প্রতিদিন সকালে কাজে বের হয়ে ফিরতে সন্ধ্যা, কখনো আবার রাত হয়ে যায়। এভাবে তার দৈনিক আয় ৩০০-৩৫০ টাকা।
ফরহাদের বাবা ফরিদ মিয়া পেশায় ভ্যানচালক, মা গৃহকর্মীর কাজ করে। তাদের আয়ে পরিবারের ব্যয় মেটানো সম্ভব হয় না। তাই বাধ্য হয়ে কিশোর বয়সে ফরহাদকেও নামতে হয়েছে জীবিকার খোঁজে।
এর আগে কয়েক জায়গায় কাজের চেষ্টা করে নিরাশ ফরহাদ জানায়, অন্যকিছুর তুলনায় ময়লার কাজ সহজে পাওয়া যায়। গত দেড় বছর ধরে এ কাজ করছে সে।
সারাদিনের খাওয়া-দাওয়া নিয়ে প্রশ্ন করা হলে ফরহাদ বলে, “বেশিরভাগ দিনই সকালে না খেয়ে বের হই। সারাদিনে রাস্তার পাশে দোকান থেকে রুটি-কলা-চা এসব খাওয়া হয়। ভাত খাওয়া হয় রাতে বাসায় ফিরে।”
ফরহাদ পরিবারের সঙ্গে তিন বেলা ঠিকমতো খেতে চায়। তাই এত কষ্ট করা।
সারাদিন আবর্জনার মাঝে থাকতে অস্বস্তি হয় কি-না জানতে চাইলে সে বলে, “আগে খারাপ লাগত। প্রথম প্রথম ময়লা লেগে সারা গায়ে চুলকানি হয়ে যেত। খুব কষ্ট হতো। বাজে গন্ধের জন্য সারাদিন না খেয়ে থাকতাম। বাসায় ফিরেও কিছু খেতে পারতাম না। এজন্য এখনো গ্যাস্ট্রিকের সমস্যায় ভুগি। তবে এখন এই বাজে গন্ধ সহ্য হয়ে গেছে।”
“রোগ-জীবাণুর ভয় করলে আমাদের মতো অসহায় মানুষ চলবে কীভাবে? এখানে অনেক জীবাণু, ময়লা, খারাপ জিনিস আছে। সব তো বাসায় গিয়ে গোসল করলে চলে যায়,” বলেই হেসে ওঠে ফরহাদ।
ইউনিসেফের মতে, যেসব শিশু-কিশোর রাস্তায় কাজ করে, বিশেষ করে ময়লা-আবর্জনা কুড়ানোর মতো কাজে যুক্ত থাকে তারা সবসময় বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়।
ইউনিসেফের জরিপ বলছে, “এসব কাজে নিয়োজিত শিশুদের অর্ধেকেরও বেশি জ্বর, কাশি, মাথাব্যথা এবং পানিবাহিত রোগে ভোগে। এতে তাদের মৃত্যু ঝুঁকিও রয়েছে।”
বেসরকারি সংস্থা সেভ দ্য চিলড্রেনের শিশু স্বাস্থ্য ও পুষ্টি বিশেষজ্ঞ তাহমিনা ফেরদৌসীর মতে, “শিশু স্বাস্থ্যের জন্য স্বাস্থ্যবিধি গুরুত্বপূর্ণ। অল্প বয়সে বাচ্চারা এত ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করলে তাদের মানসিক ও শারীরিক উভয়দিকেই ক্ষতি হয়।”
এ বিষয়ে শিশু বিশেষজ্ঞ মেজর (অব.) ডা. মোহাম্মাদ মেহেদী হাসান বলেন, “পথশিশুদের স্বাস্থ্য সচেতনতার ব্যাপারটি খুব জটিল। কারণ তারা সবসময় রাস্তায় ধূলা-ময়লার মধ্যে থাকে। এতে অ্যাজমা, কাশি, চর্মরোগ, পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি বেড়ে যায়। আক্রান্ত হওয়ার পরে তারা চিকিৎসাও পায় না।”
এই চিকিৎসক মনে করেন, সমাজের সবার উচিত তাদের এই বিষয়গুলো সম্পর্কে জানানো এবং সাধ্যমতো সেবার ব্যবস্থা করা।
“ময়লার মধ্যে কাজের কারণে পথশিশুদের শারীরিক ঝুঁকি বেড়ে যাচ্ছে দিন দিন। অসময়ে খাওয়া, সারাদিন আবর্জনার মাঝে থাকার কারণে ছোট থেকেই তারা পুষ্টিহীনতায় ভোগে।”



