শীতের “রুক্ষতাকে” বিদায় জানিয়ে ফুলে ফুলে সেজে ওঠার প্রস্তুতি শুরু হয়েছে প্রকৃতিতে। শুরু হয়েছে ফুল ফোটার আর কোকিল ডাকার বসন্ত দিন। একই দিনে বিশ্বজুড়ে উদযাপিত হচ্ছে ভালোবাসার দিন। ভালোবাসা দিবস আর বসন্তের রঙ তাই মিলেমিশে এক হয়েছে ১৪ ফেব্রুয়ারিতে এসে।
বসন্ত আর ভালোবাসা দুটোই পৃথিবীর মানুষের জন্য শুভময়, মঙ্গলময়। বসন্ত রঙিন করে তোলে স্বপ্নকে, জীবনকে। আর অশুভকে বিনাশ করা, যুদ্ধ-বিদ্বেষ, দ্বন্দ্বকে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কে রূপান্তর করার শক্তি রয়েছে ভালোবাসার। বাংলা ভাষার অন্যতম কবি আহসান হাবিব বলেছেন, “সেই অস্ত্র আমাকে ফিরিয়ে দাও/ যে অস্ত্র উত্তোলিত হলে/ পৃথিবীর যাবতীয় অস্ত্র হবে আনত/ যে অস্ত্র উত্তোলিত হলে/ অরণ্য হবে আরও সবুজ/ নদী আরও কল্লোলিত/ পাখিরা ঘুমাবে নীড়ে।” এই অস্ত্রের নাম ভালোবাসা। এই অস্ত্রের নাম বসন্ত।
বসন্ত তো বাঙালির জীবনে স্বাধিকার আন্দোলনের রক্তবর্ণ ইতিহাসও। ৮ই ফাল্গুন ভাষার অধিকার আদায়ে রক্ত দেওয়ার মাধ্যমে বাঙালি প্রথম তাদের দেশ গড়ার স্বপ্ন দেখেছিল। আর সেই স্বপ্নের বাস্তবায়ন আজকের বাংলাদেশ। ৮ই ফাল্গুনের মতো বসন্ত বাঙালির জীবনে যেমন দরকার। তেমনি যুদ্ধবিধ্বস্ত পৃথিবীর জন্য, বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া পৃথিবীর জন্য- এক হতে হলে দরকার ভালোবাসার।
আজ ১৪ ফেব্রুয়ারি বিশ্ব ভালোবাসা দিবস ও বসন্তের প্রথম দিন। যুদ্ধ, ঘৃণা, স্যাংসন, মহামারি, প্রাকৃতিক বিপর্যয় ভূমিকম্পে সমগ্র পৃথিবী আজ টালমাতাল। বাংলাদেশেও রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উত্তেজনা দিনদিন বাড়ছে। এ অবস্থায় বসন্ত আর ভালোবাসা দিবস যেন মলিন মুখে দাঁড়িয়েছে মানুষের সামনে। তাদের যে আবেদন তৈরি হওয়ার কথা সেটি সব মানুষের ভেতরে আন্দোলিত হবে না এটিই স্বাভাবিক।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, চীন-যুক্তরাষ্ট্রের “গোয়েন্দাগিরি” চালানো নিয়ে উত্তেজনা, আফগানিস্তান-ইরানে নারীদের অধিকার কুক্ষিগত করা, মিয়ানমারে জান্তা সরকারের শাসন ও দেশহারা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী, ফিলিস্তিনির সীমান্তে নিয়ত মানুষ হত্যার ঘটনা, তুরস্ক-সিরিয়ায় ভয়াবহ ভূমিকম্পে ৩৫ হাজারের বেশি প্রাণহানীর মধ্যেই এবারের ভালোবাসা দিবস- তার কতটুকু শুভ্রতা ছড়িয়ে দিতে পারবে তা এখনই বলা যাচ্ছে না। ভালোবাসার জন্য দিবস হয়েছে। কিন্তু প্রকৃত ভালোবাসা মানুষে মানুষে তৈরি হতে পারেনি। মানুষের সীমাহীন লোভ, লালসা আর আধিপত্যবাদী মন ভালোবাসার বদলে প্রতিস্থাপিত করেছে বিষবাষ্প। তবু, আমাদের প্রত্যাশা ভালোবাসা ছড়িয়ে পড়ুক সর্বত্র তার আপন সৌন্দর্য নিয়ে।
ভালোবাসা দিবস আর প্রকৃতির পালাবদলের বসন্ত একইসঙ্গে দোলা দিয়ে যায় আমাদের যাপনে। ফাগুনের দখিনা হাওয়ায় ভালোবাসার রঙে রঙিন হয় হৃদয়। শুধু তরুণ-তরুণীই নয়, সব বয়সের মানুষের ভালোবাসার বহুমাত্রিক রূপ প্রকাশের আনুষ্ঠানিক দিন আজ। বাঙালির জীবনে ১৯৫২ সালের মতো ফাল্গুন আসুক, বসন্ত আসুক। আজকের দিনে এমনটিই প্রত্যাশা আমাদের।
ভালোবাসা দিবস ও ফাল্গুনকে ঘিরে ঢাকাসহ সারাদেশেই বিভিন্ন সংগঠন ও প্রতিষ্ঠান নানা কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। রাজধানীর শাহবাগ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চত্বর, বইমেলা চত্বর থেকে শুরু করে এর আশপাশের এলাকায় থাকছে দিনভর নানা অনুষ্ঠান। এদিন সকালে অনুষ্ঠিত হবে বর্ণাঢ্য র্যালি, সূচনা সংগীত, ভালোবাসার স্মৃতিচারণ, কবিতা আবৃত্তি, গান, ভালোবাসার চিঠি পাঠ এবং ভালোবাসার দাবিনামা উপস্থাপনা। ভালোবাসা দিবস উপলক্ষে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে কনসার্টের আয়োজন করা হয়েছে।
এদিকে জাতীয় বসন্ত উদযাপন পরিষদের আয়োজনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার বকুল তলা, রবীন্দ্র সরোবর, রমনাসহ বিভিন্ন জায়গায় বসন্তবরণের আয়োজন রয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনের বটতলায় থাকছে সমগীতের বসন্ত উৎসব। সকাল ৯টা থেকে শুরু হবে এই উৎসব।
আজ ১ ফাল্গুন “বসন্ত উৎসব ২০২৩” আয়োজন করেছে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি। বিকেল ৪টায় একাডেমির নন্দনমঞ্চে বিভিন্ন কর্মসূচি নিয়ে বরেণ্য শিল্পীদের অংশগ্রহণে সংগীত, কবিকন্ঠে কবিতা পাঠ, আবৃত্তি, নৃত্য, বসন্তের পোশাক প্রদর্শনী ও কোরিওগ্রাফির নান্দনিক আয়োজন থাকছে।



