Friday, June 05, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

পুরান ঢাকায় অগ্নি বিভীষিকা

এক যুগে শ্যামপুরে সরলো মাত্র একটি গুদাম

  • তিনটি কর অঞ্চলে রয়েছে ১,৯২৪টি রাসায়নিক গুদাম
  • স্থানান্তরিত কারখানাটিকে ট্রেড লাইসেন্স নবায়নের অনুমতি দিয়েছে ডিএসসিসি
আপডেট : ০৩ মার্চ ২০২৪, ০৮:৩৯ পিএম

২০১৩ সাল থেকে পুরান ঢাকায় রাসায়নিক গুদাম বা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে নতুন করে ট্রেড লাইসেন্স প্রদান ও নবায়ন বন্ধ রাখে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন (ডিএসসিসি)। ছয় বছর পর একই রকম সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বিস্ফোরক জাতীয় রাসায়নিক ব্যবহার করে এমন প্লাস্টিক কারখানা ও প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও। 

২০১০-এর নিমতলী এবং ২০১৯ সালের চুড়িহাট্টা অগ্নিকাণ্ডের পর এ কড়াকড়ির মধ্যে ২০১৯ সালের মার্চে শ্যামপুর এলাকায় গোডাউন নির্মাণ প্রকল্পের কাজ শুরু করে সরকার, প্রকল্পটির কাজ শেষ হয় ২০২৩ সালের জুনে। গাজীপুরের টঙ্গীতেও একই ধরনের গুদাম নির্মাণের প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। তবে পুরান ঢাকা থেকে এই সময়কালে শ্যামপুরে সরেছে মাত্র একটি গুদাম।

২০২০ সালের ৮ অক্টোবর মন্ত্রিপরিষদের বৈঠকে পুরান ঢাকার রাসায়নিক গুদামের তালিকা তৈরির নির্দেশনা দেওয়া হয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ওই বছরের ২০ ডিসেম্বর থেকে বিস্ফোরক জাতীয় প্লাস্টিক ও রাসায়নিক ব্যবসা পরিচালনা করা প্রতিষ্ঠানগুলোর তালিকা তৈরির জরিপ শুরু করে ডিএসসিসি।

প্রায় দুই মাস সময় নিয়ে সে সময় দক্ষিণ সিটির কর অঞ্চল ৩, ৪ ও ৫ এ জরিপ চালায়। জরিপের ভিত্তিতে ২০২১ সালের এপ্রিলে পুরান ঢাকায় বিস্ফোরক জাতীয় প্লাস্টিক ও রাসায়নিক ব্যবসা পরিচালনা করা প্রতিষ্ঠানগুলোর তালিকা মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠানো হয়। উল্লিখিত কর অঞ্চলে ১,৯২৪টি রাসায়নিক গোডাউন আছে বলে উল্লেখ করা হয় জরিপ প্রতিবেদনে।

এতদিনে একমাত্র রাসায়নিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে শ্যামপুরের ‘‘অস্থায়ী ভিত্তিতে রাসায়নিক দ্রব্য সংরক্ষণের জন্য নির্মিত গুদাম’’ প্রকল্পে স্থানান্তরিত হয়েছে ‘‘মেসার্স রয়েল টন লেকার কোটিং’’। এ কারণে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি তাদের বাণিজ্য অনুমতি বা ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন করে ডিএসসিসি।

ফাইল ছবি: ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে ঢাকার চুড়িহাট্টা এলাকায় রাসায়নিক গুদামে আগুন লাগে (২০ ফেব্রুয়ারি. ২০১৯)/ঢাকা ট্রিবিউন

ডিএসসিসি প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মিজানুর রহমান বলেন, “শ্যামপুরে স্থানান্তরিত হওয়ায় আমি প্রতিষ্ঠানটিকে ধন্যবাদ জানাই। আশা করি, তাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে অন্যান্য রাসায়নিক গুদাম ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানও সেখানে স্থানান্তরিত হবে। নিরাপদ হবে আমাদের পুরাতন ঢাকার সামগ্রিক পরিবেশ।”

যারা স্থানান্তরিত হবে না পর্যায়ক্রমে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।

মিজানুর বলেন, “শ্যামপুরে অস্থায়ী ভিত্তিতে যে রাসায়নিক গুদামগুলো নির্মাণ করা হয়েছে সেখানে অগ্নিনির্বাপণের আধুনিক ব্যবস্থা রয়েছে। এছাড়াও খোলামেলা পরিবেশ হওয়ার সেখানে ঝুঁকির মাত্রাও অনেক কম। পাশাপাশি এসব রাসায়নিক গুদাম ও প্রতিষ্ঠানকে স্থায়ীভাবে স্থানান্তরের জন্য শিল্প মন্ত্রণালয় কর্তৃক মুন্সিগঞ্জের সিরাজদিখানে ৩১০ একর জমিতে যে প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে তা প্রায় শেষপর্যায়ে রয়েছে বলে আমরা জেনেছি। জননিরাপত্তার জন্য মারাত্মক ঝুঁকি সৃষ্টিকারী এসব রাসায়নিক গুদাম ও প্রতিষ্ঠান যদি সেখানে স্থানান্তরিত না হয় তাহলে আমরা সেসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করব।”

গত বছরের ৪ জুন শ্যামপুরে “অস্থায়ী ভিত্তিতে রাসায়নিক দ্রব্য সংরক্ষণের জন্য নির্মিত গুদাম” প্রকল্প চালু করা হয়।

রাসায়নিক গুদাম উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস বলেন, “পুরান ঢাকা থেকে রাসায়নিক দ্রব্যাদি স্থানান্তর সংক্রান্ত নীতিমালা যেন ব্যবসাবান্ধব হয়। স্থানান্তর প্রক্রিয়ায় ব্যবসায়ীরা যেন উৎসাহিত ও স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে, সে বাস্তবতা আমলে নেওয়ার জন্য আমি সংশ্লিষ্টদের অনুরোধ করছি। আমরা বিশ্বাস করি, এসব বিপজ্জনক রাসায়নিক সামগ্রী পর্যায়ক্রমে স্থানান্তরের মাধ্যমে ঢাকাকে আমরা একটি বাসযোগ্য ও দুর্যোগ সহনশীল নগরীতে পরিণত করতে পারব।”

স্থানান্তরে ব্যবসায়ীদের গড়িমসি

ঢাকার চকবাজার, মিটফোর্ড, আরমানিটোলা এলাকায় রাসায়নিকের দোকানগুলো চলছে আগের মতোই। আর তাদের গুদামগুলো ছড়িয়ে আছে লালবাগ, চকবাজার, আরমানিটোলা, বাবুবাজার, মিটফোর্ড এলাকায় বসতবাড়িসহ অতিরিক্ত ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে। বাংলা ট্রিবিউনের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এসব তথ্য।

তবে অনেক ব্যবসায়ীই গোডাউনের কথা স্বীকার করতে নারাজ। নিজেদের ছোট তাদের দাবি, ছোট ব্যবসায়ী হওয়ায় তাদের কোনো গোডাউন নেই। অর্ডার পেলে মালামাল আনেন অথবা বড় দোকান থেকে ব্যবস্থা করে গ্রাহককে সরবরাহ করেন। বসতবাড়ি ও ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে থাকা গোডাউনগুলো বড় দোকানের বলে দাবি তাদের।

রূপসা কেমিকেল নামে একটি প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপক হামিদ বলেন, ‘‘দোকান বড় বা ছোট বিষয় না, গোডাউন সবারই আছে এদিকে। পুরান ঢাকায় সব বাড়ির নিচেই কমবেশি গোডাউন আছে। তবে এখন কিছু গোডাউন কেরানীগঞ্জে নেওয়া হয়েছে। এতে খরচ বেড়েছে।’’

গোডাউন থাকার বিষয়টির সত্যতা মেলে স্থানীয় শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলেও।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) এক গবেষণায় বলা হয়েছে, পুরান ঢাকায় আনুমানিক ২৫ হাজার রাসায়নিক পণ্যের গুদাম রয়েছে। এসবের মধ্যে ১৫ হাজারই রয়েছে বাসাবাড়িতে। মাত্র আড়াই হাজার গুদামকে ট্রেড লাইসেন্স দিয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন (ডিএসসিসি)। বাকি ২২ হাজারের বেশি গুদাম অবৈধ। ক্ষতিকর ও ঝুঁকিপূর্ণ ২০০ ধরনের রাসায়নিকের ব্যবসা চলে সেসব গুদামে।

এসব গোডাউনে রয়েছে- গ্লিসারিন, সোডিয়াম অ্যানহাইড্রোজ, সোডিয়াম থায়োসালফেট, হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড, মিথাইল ইথাইল কাইটন, থিনার, আইসোপ্রোপাইল, টলুইনের মতো দাহ্য পদার্থ। ফলে যেকোনো মুহূর্তে ঘটতে পারে বড় দুর্ঘটনা।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইম্পোটার্স অ্যান্ড মার্চেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘‘আমরা নিরাপদ স্থানে গোডাউন নিতে আগ্রহী। কিন্তু আমাদের তো ব্যবসা থাকতে হবে। সরকার যে জায়গা আমাদের দিচ্ছে সেখানে গোডাউনে প্রতি বর্গফুট ভাড়া ৫০ টাকা। আমরা পুরান ঢাকায় ১২ টাকায় ভাড়া পাই। আমরা সরকারকে বলেছিলাম যেভাবে ট্যানারি, গার্মেন্টস সরানো হয়েছে, আমাদেরও জায়গা দিক, আমরা গোডাউন তুলে ব্যবসা করবে। সামনে আবার মিটিং আছে, দেখি এখন কী বলে তারা। এভাবে তো সমাধান হয় না। আমরাও নিরাপদে ব্যবসা করতে চাই।’’

   

About

Popular Links

x