হিমালয়ের অতল উচ্চতা, হাড় কাঁপানো ঠাণ্ডা আর জীবন-সংহারী পথ পার করে কেউ যদি বলে, ‘‘আমি সাইকেল চালিয়ে অন্নপূর্ণায় গিয়েছি’’, তাহলে তা যেন গল্পের মতোই শোনায়। অথচ সেই গল্পকেই যেন বাস্তবে রুপান্তর করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) শিক্ষার্থী তোজাম্মেল হোসেন মিলন।
গত ২ এপ্রিল, নেপাল সময় সকাল ৬টা ১৫ মিনিটে মিলন পৌঁছান হিমালয়ের আইকনিক অন্নপূর্ণা বেসক্যাম্পে। এটি ছিল তার ১৫ দিনের ব্যতিক্রমধর্মী অভিযানের পরম গন্তব্য। কিন্তু এখানেই থেমে নেই তার কীর্তি- এই এক অভিযানে তিনি সাইকেল চেপে জয় করেছেন তিলিকো লেক, থরংলা পাস, অন্নপূর্ণা সার্কিট এবং অন্নপূর্ণা বেসক্যাম্প। সব মিলিয়ে চারটি শীর্ষস্থান। বিশ্বে দ্বিতীয় এবং বাংলাদেশে প্রথম ব্যক্তি হিসেবে এই দুর্লভ অভিযানে ইতিহাস গড়েছেন মিলন।
“মানুষ তার সীমাবদ্ধতাকে জয় করতে চায়”
শুধু পথের দুর্গমতা নয়, তার সঙ্গে ছিল ভারী সাইকেল, রুক্ষ আবহাওয়া, খাদ্যসংকট ও শারীরিক প্রতিকূলতা। এক দুর্ঘটনায় গুরুতর আঘাত পান বাম হাঁটুতে, অসুস্থ ছিলেন তিনদিন। কিন্তু তিনি থামেননি। এমন বিরূপ পরিবেশকে বর্ণনা করতে গিয়ে মিলন বলেন “একটু অসাবধানতা হলেই জীবন চলে যেতে পারত। কিন্তু চ্যালেঞ্জের নামই তো জীবন। সেই সীমা জয় করার জন্যই বারবার এগিয়ে গিয়েছি।”
সাইক্লিংয়ে শুরু, ক্যান্সার-জয়ী এক জীবনযুদ্ধ
২০১৬ সালের কোনো এক সকালে হঠাৎ অন্ধকার নেমে আসে মিলনের জীবনে। লিস্ফোমা টিউমারের চিকিৎসা করতে গিয়ে ক্যানসার ধরা পরে। চিকিৎসা শেষে চিকিৎসকদের পরামর্শ ছিল নিয়মিত ঘাম ঝরানো ও শরীরচর্চা। আর মিলনের সেই ঘাম ঝরানো পথ ছিল সাইকেল চালানো। সেই থেকে শুরু হয় এক ভিন্নতর জীবনের অভিযান।
২০১৮ সালে প্রথম বড় মাইলফলক- খারদুংলা পাস জয় করেন মিলন। ৭০ দিন ধরে টেকনাফ থেকে লাদাখ পর্যন্ত সাইকেল চালিয়ে ওঠেছিলেন সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১৮,৩৮০ ফুট উচ্চতায়। সাত বছর পর, সেই অসামান্য অর্জনের পর আবারও প্যাডেলে প্যাডেলে নিজের নাম তুলেছেন রেকর্ডবুকে।
জীবনের অর্থ খোঁজার পথে হয়তো সাইকেল ছিল কেবলই একটি বাহন
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪২ ব্যাচের শিক্ষার্থী মিলন। সেখান থেকে গণিতে স্নাতক সম্পন্ন করে এখন শিক্ষকতা করছেন রাজউক উত্তরা মডেল কলেজে। অথচ তার হৃদয়ে গাঁথা অ্যাডভেঞ্চার, পথ আর পাহাড়ের গল্প।
এমন অভিযাত্রার অনুভূতি জানাতে গিয়ে মিলন বলেন “এই অভিযাত্রা শুধু আমার একার নয়, বাংলাদেশের জন্যও এক নতুন ইতিহাস। এই অর্জন আমি উৎসর্গ করেছি আমার মেয়ে মানহারকে। এখন হয়তো ও বোঝে না, কিন্তু বড় হয়ে জানবে, বাবার এই পথ চলা একদিন হয়তো ওরও অনুপ্রেরণা হবে।”
নতুন স্বপ্ন, নতুন গন্তব্য
মিলনের অন্নপূর্ণা জয় যেন তার আত্নবিশ্বাসের পালকে নতুন হাওয়া যোগ করেছে। তিনি এখন অন্নপূর্ণাতেই থেমে থাকতে চান না, যেতে চান স্বপ্নের সমান উচ্চতায়, আছে বই লেখারও ইচ্ছে।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা জানতে চাইলে মিলনের চোখে জ্বলে ওঠল সাহসের দীপ্তি, বললেন, “বিশ্বের আলোচিত হাইওয়ে, গিরিপথ, মালভূমি জয় করতে চাই। সব অভিজ্ঞতা একত্র করে বই লেখার ইচ্ছাও আছে।”
তোজাম্মেল হোসেন মিলনের গল্পটি শুধু একজন অ্যাডভেঞ্চারারের নয়, এটি যেন স্বপ্ন দেখে তা বাস্তব করার সাহসিকতার প্রতীক। ক্যানসারের মতো প্রাণঘাতী রোগকে জয় করে, সাইকেল নামক এক সাধারণ বাহনে চেপে তিনি জয় করেছেন হিমালয়ের অজেয় পথ। তার প্রতিটি প্যাডেল যেন জানান দেয়- “অসম্ভব” বলে কিছু নেই।
আর এভাবেই, এক শিক্ষকের জীবন, এক জাবিয়ান হৃদয়, এক বাবার স্বপ্ন- সব মিলিয়ে লেখা হলো এক অনন্য কাব্য। অন্নপূর্ণার চূড়ায় সেই কাব্য আজ সগর্বে উড়ছে বাংলাদেশের পতাকা।



