নওগাঁয় বসতবাড়ির সম্পত্তি হাতিয়ে বৃদ্ধা মাকে বাড়িতে ঢুকতে বাধা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে ছেলের বিরুদ্ধে। নিজের একমাত্র ছেলের বিরুদ্ধে এমনই অভিযোগ তুলে বাড়ির সামনে ধরনায় বসেছেন ওই বৃদ্ধা। বিলকিস আক্তার (৭০) নামের ওই বৃদ্ধার অভিযোগ, সম্পত্তি হাতিয়ে নিতে তার একমাত্র ছেলে মোস্তাফিজুল ইসলাম সৌরভ তাকে বাড়িতে ঢুকতে দিচ্ছেন না।
সোমবার (১৪ জুলাই) নওগাঁ শহরের কাজীর মোড় এলাকায় এ ঘটনাটি ঘটেছে।
এদিন বেলা ১১টার দিকে নিজের বাড়িতে এসে দোতলার ফ্ল্যাটে ঢুকতে গিয়ে তালা মারা দেখতে পান বিলকিস আক্তার। তালা মারার বিষয়টি ছেলে মোস্তাফিজুলকে জানালে তিনি সাফ জানিয়ে দেন, তাকে বাড়িতে ঢুকতে না দেওয়ার জন্য গেটে তালা ঝুলিয়েছেন।
এদিকে, বাড়িতে ঢুকতে না পেরে বাড়ির নিচতলায় সিঁড়ির সামনের গ্যারেজে বসে রয়েছেন বিলকিস আক্তার। এমন দিনও দেখতে হবে তিনি কখনও ভাবেননি ।
বিকেল ৫টার দিকে কাজির মোড়ে ওই বাড়িতে গিয়ে কথা হয় বিলকিস আক্তারের সঙ্গে। তিনি বলেন, “স্বামীর মৃত্যুর পরে আমার একমাত্র ছেলে আমার দেখাশোনা করে না। বোনদের সঙ্গেও খারাপ ব্যবহার করে। ছেলের কথা আমার ও মেয়েদের বসতবাড়ির অংশ তাকে লিখে দিতে হবে। কিন্তু আমরা তাকে জমি লিখে দিতে রাজি হইনি। এটা নিয়ে বিরোধ শুরু। ছেলের সঙ্গে বনিবনা না হওয়ায় স্বামীর মৃত্যুর পর বড় মেয়ের বাড়িতেই থাকি। মাঝে মাঝে নিজের বাড়িতেও থাকি। আজকে বেলা ১১টার দিকে ফ্ল্যাটে ঢুকতে গিয়ে দেখি সিঁড়িতে কাঁচি গেইটে তালা ঝুলানো।”
তিনি আরও বলেন, “আমি ছেলেকে তালা খুলতে বললে সে আমাকে বলে, ‘তুই তো দুই আনার মালিক তুই গিয়ে পাথারে গিয়ে থাক। এই বাড়িতে তোর জায়গা হবে না।’ আমি আজকে রোজা আছি। বেলা ১১টা থেকে বসে আছি। আমি আমার নিজের বাড়িতে ঢুকতে চাই। আমার বড় মেয়ে এসেছিল তাকে বাড়িতে ঢুকতে দেয়নি।”
বিলকিস আক্তার বলেন, “আমার স্বামী এই বাড়ি করেছেন। এটা আমার স্বামীর স্মৃতি। জীবনের বাকিটা সময় এই বাড়িতেই কাটাতে চাই। এই বাড়িতে আমার মালিকানা কম বলে ছেলে এর আগেও কটাক্ষ করেছে। মেয়েরা আমার অপমান সইতে না পেরে তাদের অংশ আমাকে লিখে দিয়েছে। এই বাড়িতে কাগজে-কলমে আমার অংশই বেশি। কিন্তু আমার ছেলে পুরো সম্পত্তি দখল করার জন্য আমাকে বাড়িতে ঢুকতে দিতে চায় না।”
বিলকিস আক্তারের বড় মেয়ের স্বামী ডা. আবুজার গাফফার বলেন, “আমার শ্যালক এর আগেও শ্বাশুড়িকে নির্যাতন করেছেন। এমনকি গায়ে হাতও তুলেছেন। এটা নিয়ে মামলাও রয়েছে। আমার শ্যালকের মধ্যে মানবতা বলে কিছু নেই। নিজের মাকে বলে, তুই দুই আনার মালিক, তুই গিয়ে পথে থাক। ২০২৩ সালে আমার স্ত্রী ও শ্যালিকা বসতবাড়ির তাদের অংশের জমি মায়ের নামে লিখে দিয়েছে। কাগজে-কলমে আমার শ্বাশুড়ি এখন বসতবাড়ির প্রায় ৭০%-এর মালিক। অথচ তাকেই এখন বাড়িতে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না।”
মা’কে বাড়িতে ঢুকতে না দেওয়ার অভিযোগ স্বীকার করে ছেলে মোস্তাফিজুল ইসলাম বলেন, “বসতবাড়ি নিয়ে পারিবারিক কলহের জেরে মারামারি ও চাঁদাবাজির মামলা রয়েছে। আমার প্রাণনাশের চেষ্টা করা হয়েছিল। ওই ঘটনার পর তার মা স্বেচ্ছায় মেয়ের বাসায় বসবাস করে আসছেন। আদালতের নির্দেশে বড় বোনের জিম্মায় আছেন। এখন তিনি আমার জীবনের জন্য হুমকিস্বরূপ তাই তাকে বাড়িতে ঢুকতে দিচ্ছি না। তিনি বাড়িতে থাকলে আবারও পারিবারিক কলহ ও মারামারি হতে পারে। তাই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি।”
জানা গেছে, বিলকিস আক্তারের এক ছেলে ও দুই মেয়ে। ছোট মেয়ে কানাডায় থাকেন। শহরের কাজীর মোড়ে বিলকিস আক্তারের স্বামী নিজের ১০ শতক জমির ওপর প্রায় ৩০ বছর আগে দোতলা বাড়িটি নির্মাণ করেন। ওই বাড়ির দোতলার একটি ফ্লাটে তিনি বসবাস করে আসছিলেন।
বৃদ্ধা বিলকিস আক্তারের পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, ২০২১ সালে স্বামীর মৃত্যুর পর বসতবাড়ির জমি নিয়ে ছেলে মোস্তাফিজুল ইসলামের সঙ্গে মা বিলকিস আক্তারের বিরোধ সৃষ্টি হয়। স্বামীর মৃত্যুর পর আইন অনুযায়ী বিলকিস আক্তার ও তার তিন সন্তান বসতবাড়ির অংশীদার হন। কিন্তু মোস্তাফিজুল ইসলাম বসতবাড়ির পুরো সম্পত্তি হাতিয়ে নিতে তার মা ও বোনদের তাদের অংশের জমি লিখে দেওয়ার জন্য চাপ দিতে থাকেন। কিন্তু মা ও বোনেরা তাকে বসতবাড়ির জমি লিখে দিতে রাজি না হওয়ায় পারিবারিক বিরোধ দেখা দেয়। ছেলের সঙ্গে বনিবনা না হওয়ায় বিলকিস আক্তার ২০২১ সাল থেকে অধিকাংশ সময় নওগাঁ শহরেই বড় মেয়ের বাড়িতে থাকছেন।



