Sunday, June 21, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

বুক চিতিয়ে আবু সাঈদের মৃত্যুকে আলিঙ্গন, যে মৃত্যুতে আন্দোলন অগ্নিগর্ভে রূপ নেয়

আজ ১৬ জুলাই, ‘জুলাই শহিদ দিবস’

আপডেট : ১৬ জুলাই ২০২৫, ১০:৩৪ এএম

আজ ১৬ জুলাই। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের প্রথম শহিদ হন রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ। ২০২৪ সালের আজকের এইদিনে আবু সাঈদ পুলিশের গুলির সামনে দুই হাত প্রসারিত করে বুক পেতে দিয়েছিলেন। তাকে পুলিশ গুলি করে হত্যার ঘটনায় সারাদেশে ছাত্র-জনতার আন্দোলন অগ্নিগর্ভে রূপ নেয়। যার সফল পরিণতি ঘটেছিল সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশ থেকে পালানোর মধ্য দিয়ে।

শহিদ আবু সাইদের বুক চিতিয়ে গুলির সামনে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করার ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে সহযোদ্ধারা বলেছেন, আবু সাঈদের পুলিশের গুলির সামনে বুক পেতে দেবার কারণেই দ্বিতীয় স্বাধীনতা পেয়েছি আমরা।

যেভাবে আবু সাঈদকে হত্যা করা হয়: কোটাবিরোধী আন্দোলন যখন বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে রুপ নেয়, সেই জুলাই মাসের প্রথম থেকেই রংপুরে গণ-আন্দোলনে রূপ নেয়। এই আন্দোলনের সূতিকাগার ছিল রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়। এর নেতৃত্ব দেন ইংরেজি বিভাগের মেধাবী শিক্ষার্থী আবু সাঈদ। আন্দোলন বিক্ষোভ মিছিলে উত্তাল ছিল রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে করে নগরীর সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। প্রথমদিকে মিছিলে ১৫ জন দিয়ে শুরু হয়ে। এরপর মিছিলে যোগ দিতে শুরু করে শত শত থেকে হাজার হাজার শিক্ষার্থী।  প্রতিদিন রংপুর নগরী থেকে মিছিল আসতো বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে। সেই মিছিলে আস্তে আস্তে পুরো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ ছাত্র-ছাত্রীরা যোগ দেয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের ক্যাডাররা এই আন্দোলন দমন করার জন্য আওয়ামী লীগ যুবলীগ সহ বিভিন্ন অঙ্গ সংগঠনের নেতা কর্মীরা অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ঝাপিয়ে পড়ে। দফায় দফায় হামলা চালায় নিরস্ত্র শিক্ষার্থীদের ওপর। পুলিশ তাদের পক্ষ নিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর মহুমুহ রাবার বুলেট, সাউন্ড গ্রেনেড আর গুলি বর্ষণ করে।

১৬ জুলাই সকালে রংপুর জিলা স্কুল থেকে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের হয়। সেখানে বিভিন্ন কলেজ ও স্কুলের শিক্ষার্থীরা অংশ নেয়। এরপর আড়াই কিলোমিটার  দূরে রাকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে যখন মিছিলটি যাত্রা করে প্রেসক্লাব অতিক্রম করার আগে সেই মিছিলের সামনে পেছনে সাধারণ শিক্ষার্থী ছাড়াও সকল স্তরের জনতাও যোগ দেয়। মিছিলটি রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের কাছে পৌঁছালে ছাত্রলীগের ক্যাডারদের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ  যুবলীগ বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক কর্মকর্তা কর্মচারীরা দফায় দফায় শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালাতে থাকে। 

আন্দোলনে অংশ নেওয়া বিশ্ববিদ্যালয়সহ সাধারণ শিক্ষার্থীরা প্রতিরোধ গড়ে তুললে পুলিশও সন্ত্রাসীদের পক্ষ নিয়ে  সাধারন শিক্ষার্থীদের উপর গুলি, রাবার বুলেট, কাঁদানে গ্যাস  নিক্ষেপ করলে শতাধিক শিক্ষার্থী গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হয়। এ সময় আবু সাঈদ একাই পুলিশের গুলির সামনে দাঁড়িয়ে বুক চিতিয়ে বলতে থাকেনি, গুলি করলে কর, আমি বুক পেতে দিয়েছি। এ সময় পুলিশের টার্গেট করা গুলিতে গুরুতর আহত হয়ে লুটিয়ে পড়েন তিনি। হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করে। এ সময় আবু সাঈদের মুখ দিয়ে রক্ত  বের হচ্ছিল, সারা শরীরে ছিল গুলি আর রাবার বুলেটের ক্ষত।

প্রত্যক্ষদর্শী ও সহযোদ্ধারা যা বলেন: জুলাই আন্দোলনের প্রথম  থেকেই শহিদ আবু সাইদের সঙ্গে আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন সাবেক সমন্ময়ক বেরোবি শিক্ষার্থী শাহারিয়ার সোহাগ। তিনি জানান, জুলাই আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন তিনি। যেদিন আবু সাঈদ গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হন সে সময় তিনিও গুলিবিদ্ধ হন। অল্পের জন্য তিনি প্রাণে বেঁচে গেছেন। দীর্ঘদিন হাসপাতালে থাকতে হয়েছে তাকে।

তিনি বলেন, “বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন শুরুর প্রথম থেকেই রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের হাতেগোনা ৮ থেকে ১০ জন শিক্ষার্থী আমরা শুরু করি। ছোট ছোট মিছিল করি। বেরোবি ছাত্রলীগের সভাপতি পোমেল বড়ুয়া, সাধারণ সম্পাদক শামীম ও তার ক্যাডাররা আমাদের নানাভাবে হুমকি-ধামকি দিতো মিছিল না করার জন্য। পোমেল বড়ুয়া তো শহিদ আবু সাঈদকে ডেকে লাথি ঘুষি মেরে তাকে ক্যাম্পাসে কোনো ধরনের অরাজকতা সহ্য করা হবে না বলে শাসিয়েছিল। কিন্তু আবু সাঈদসহ আমরা দমে যাইনি। আন্দোলন বেগবান হতে শুরু করলো। আস্তে আস্তে রংপুর মহানগীর সকল শিক্ষাপ্রতিষ ্ঠানে ছড়িয়ে পড়লো। মিছিল দীর্ঘ হতে লাগলো। জুলাইয়ের ৫ তারিখের পর হাজার হাজার শিক্ষার্থী নগরী থেকে মিছিল নিয়ে বেরোবির সামনে আসতো। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও সকল কিছু উপেক্ষা করে যোগ দিতে শুরু করলো বিক্ষোভে। নারী শিক্ষার্থীরাও দলে দলে যোগ দিয়েছিল।

আন্দোলনে অংশ নেওয়া কয়েকজন শিক্ষার্থী যা বলেন: বেরোবি শিক্ষার্থী জেবিন বলেন, “আমি আবু সাঈদের সাথে সাথে ছিলাম। তার অসীম সাহস আমাকে আন্দোলনে নামতে সাহস জুগিয়েছে। আবু সাঈদকে লক্ষ করে পুলিশ গুলি করার সময় আমি কয়েক গজ দূরে ছিলাম । সে বার বার পুলিশের সামনে দাঁড়িয়ে দুই হাত প্রসারিত করে বলছিল, বুক পেতে দিয়েছি, কর গুলি। মৃত্যুকে আলিঙ্গন করার যে দুঃসাহস আবু সাঈদ দেখিয়েছে এটা ইতিহাসে বিরল ঘটনা। আবু সাঈদের মৃত্যুকে আলিঙ্গন করার এ দৃশ্য সারাদেশ ও বিশ্ববাসী দেখেছে। তার মৃত্যুর শোককে শক্তিতে রপান্তরিত করে মানুষ ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনাকে দেশ থেকে পালাতে বাধ্য করেছে। আবু সাঈদের আত্মত্যাগ আন্দোলনের প্রধান টার্নিং পয়েন্ট।” 

অন্যান্য সহযোদ্ধারা যা বলেন: বেরোবি শিক্ষার্থী আশফাক, নজরুল, রোমেলসহ অনেকেই জানালেন, আবু সাঈদের বুক প্রসারিত করে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করার ঘটনায় জুলাই আন্দোলন সফলতার মুখ দেখেছে। তার মৃত্যুকে অনুসরণ করে অনেকেই গুলির সামনে দাঁড়িয়ে আত্মাহুতি দিয়েছে। আমরা দেখেছি নিশ্চিত মৃত্যুকে কিভাবে বরণ করেছে আবু সাঈদ।

সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট নেতা রাজু বাশফোর বলেন, “আমি ১৬ জুলাই আন্দোলনে একেবারে আবু সাইদের কাছাকাছি ছিলাম। তাকে যখন টার্গেট করে গুলি করা হলো, সে মাটিতে লুটিয়ে পড়লে আমি ও আরও ৩-৪ জন সেখানে যাই। এ সময় পুলিশ বৃষ্টির মতো গুলি করছিল। এর মধ্যেই আমরা আবু সাঈদকে আহত অবস্থায় প্রথমে রিকশায় পরে একটি অটোতে করে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাই। জরুরি বিভাগের চিকিৎসক তাৎক্ষণিক তাকে ওয়ার্ডে পাঠায়। রোগীর অবস্থা কি জানতে চাইলে কর্তব্যরত ডাক্তার বললেন সিনিয়র ডাক্তাররা এলে তারা বলবেন। কিছুক্ষণের মধ্যে সিনিয়র একজন ডাক্তার এসে তাকে মৃত ঘোষণা করেন। আবু সাঈদের সারা শরীর গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে গিয়েছিল। মুখ দিয়ে রক্ত বের হচ্ছিল।”

আবু সাঈদ আহত হবার খবর পেয়ে হাসপাতালে ছুটে যান বাসদ (মার্কসবাদী) রংপুর মহানগর সাধারণ সম্পাদক আরেফিন তিতু। তিনি বলেন, “পুলিশের বেপরোয়া গুলিতে সাঈদ নিহত হয়েছে। পুলিশ টার্গেট করে গুলি করে হত্যা করেছে। তার মরদেহ নিয়ে আমরা মিছিল বের করলেও পুলিশ পরে তা ছিনিয়ে নিয়ে যায়।”

বেরোবির বাংলা বিভাগের অধ্যাপক তুহিন ওয়াদুদ বলেন, “আমরা কয়েকজন সহকর্মী হাসপাতালে ছুটে যাই। কিন্তু গিয়ে দেখি সে মারা গেছে। পুলিশ তাকে গুলি করেছে হত্যা করার জন্য। এটা কোল্ড ব্লাডেড মার্ডার। এরপর আমরা আবু সাঈদের মরদেহ নিয়ে তার গ্রামের বাড়ি পীরগঞ্জ উপজেলার বাবনপুর গ্রামে যাই। সেখানে তার স্বজনরা আসবে এরই অপেক্ষায় দাফন করতে বিলম্ব হচ্ছে বলে আমরা চলে আসি।“

আবু সাঈদের স্বজনরা যা বলেন: শহিদ আবু সাঈদের বাড়ি পীরগঞ্জ উপজেলার বাবনপুর গ্রামে ঢাকা ট্রিবিউনের সঙ্গে কথা বলেন তার মা মনোয়ারা বেগম। তিনি বলেন, “তার ছেলেকে গুলি করে হত্যা করেছে পুলিশ। এক বছর হতে চললো এখনও অনেক খুনি চাকরি করছে। অনেকে ঘুরে বেড়াচ্ছে। পুলিশ তাদের গ্রেপ্তার করছে না। আমার ছেলেকে হত্যার পর লাশ দাফন করতে বাধা দেওয়া হয়েছে। তড়িঘড়ি করে দাফন করার চেষ্টা করেছে স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতারা, পুলিশ ও উপজেলা প্রশাসন। এদের কোন শাস্তি হলো না। তাদের গ্রেপ্তার আজও করা হলো না।“

আবু সাঈদের বাবা মকবুল হোসেন বলেন, “শুনলাম, আর্ন্তজাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালে মামলা আমলে নিয়েছে। ২৬ জনের নামে গ্রেপ্তারি পরোয়ারা জারি করা হয়েছে। কিন্তু এক বছরেও তো মামলার কোনো অগ্রগতি নাই। সুষ্ঠু বিচার নিয়ে আমার এখনও আশংকা রয়েছে। তবে আমি ন্যায়বিচার চাই।”

আবু সাঈদের বড় ভাই রমজান আলী বলেন, “আমরা আমার ভাইয়ের হত্যার ন্যায্য ও সুষ্টু বিচার চাই। সেইসঙ্গে কোনো নিরাপরাধ মানুষ যাতে সাজা না পায় সেটাও দেখতে হবে।”

বেরোবি শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা: বেরোবির শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা বলছেন, সুষ্ঠু বিচারের মাধ্যমে শহিদ আবু সাঈদ হত্যাকারীদের ইন্ধনদাতা, অর্থের যোগানদাতাসহ সকলের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি তাদের।

এদিকে, শহিদ আবু সাঈদ দিবস উপলক্ষে রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে দিনব্যাপি নানান কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে। এর মধ্যে কবর জিয়ারত, শো র‌্যালি, আলোচনা সভাসহ নানান কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়।

অন্যদিকে শহিদ আবু সাঈদের পরিবারের পক্ষ থেকে দিনব্যাপি মিলাদ, দোয়া মাহফিল, দুঃস্থদের মাঝে খাবার বিতরণ, আলোচনাসহ নানান কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে।

   

About

Popular Links

x