Monday, May 20, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

পরিবেশ বাঁচিয়ে চামড়া শিল্পের প্রসার বড় চ্যালেঞ্জ

প্রতিনিয়তই ট্যানারির বর্জ্যে পার্শ্ববর্তী ধলেশ্বরী নদীসহ নানাভাবে পরিবেশ দূষিত হচ্ছে

আপডেট : ০৭ মার্চ ২০২৪, ১২:৩১ পিএম

চামড়া শিল্পের বিষাক্ত বর্জ্য নদী-নালাসহ পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ছে। প্রতিনিয়ত বাড়ছে দূষণ। প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের অভাবে এ শিল্প হারাচ্ছে বড় বাজার। হাজারীবাগ থেকে স্থানান্তরের পর সাভারে পরিস্থিতি উন্নতি হবে বলে আশা করা হলেও বাস্তবে তা ঘটেনি। যার খেসারত দিচ্ছে পুরো খাত।

বাংলাদেশ রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবির) তথ্য বলছে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে চামড়া খাতের রপ্তানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ১,৩৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০২৩ সালের জুলাই থেকে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আয় এসেছে ৮৯৫.২৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের আয়ের তুলনায় ১৪.৩৮% কম। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২০২৩ সালের জুলাই পর্যন্ত আয় এসেছিল ৮৩২.৩৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।

রপ্তানি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিশ্বের বড় ব্র্যান্ডগুলোর কাছে ভালো দামে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য বিক্রি করতে হলে বৈশ্বিক সংস্থা লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপের (এলডব্লিউজি) সনদ থাকতে হয়। বৈশ্বিক বাজারের কথা মাথায় রেখে ঢাকার হাজারীবাগ থেকে চামড়া শিল্পনগরী স্থানান্তরের জন্য ২০০৩ সালে একটি প্রকল্প নেয় সরকার। সে অনুযায়ী ২০০ একর জমি নিয়ে সাভারের হেমায়েতপুরের হরিণধরায় গড়ে ওঠে চামড়া শিল্পনগরী। বর্তমানে এখানে ১৪১টি ট্যানারি রয়েছে। যেখানে ৫৪৭ কোটি টাকা ব্যয়ে কেন্দ্রীয় বর্জ্য পরিশোধনাগার (সিইটিপি) তৈরি করা হয়। 

তবে সেটি পুরোপুরি কার্যকর না হওয়ায় ট্যানারি প্রতিষ্ঠানগুলো এখনও এলডব্লিউজি সনদ পাচ্ছে না। গত ২১ বছরের মধ্যে শুধুমাত্র ২০২৩ সালের নভেম্বরে এলডব্লিউজি স্বীকৃতি পেয়েছে “সিমোনা ট্যানিং’’ নামে একটি কারখানা। তাদের নিজস্ব ইটিপি রয়েছে। আর বাকিরা কেউই পায়নি এই সনদ। ফলে সার্বিক রপ্তানিতে পিছিয়ে পড়ছে এই খাত।

বিভিন্ন সময় সংশ্লিষ্টরা কার্যকরী উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানালেও সমাধান হয়নি। প্রতিনিয়তই ট্যানারির বর্জ্যে পার্শ্ববর্তী ধলেশ্বরী নদীসহ নানাভাবে পরিবেশ দূষিত হচ্ছে। যা ঈদ-উল-আযহার সময় বেড়ে যায় কয়েকগুণ। তবে এবার পরিবেশ দূষণ রোধসহ সিইটিপির বিষয়টি সমাধানে জোরালো পদক্ষেপের আশ্বাস দিলেন সংশ্লিষ্টরা।

বুধবার (৬ মার্চ) ট্যানারিতে সশরীরে উপস্থিত হন শিল্পমন্ত্রী নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ুন, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক মন্ত্রী সাবের হোসেন চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারী শিল্প ও বিনিয়োগ উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান, বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প কর্পোরেশনের (বিসিক) চেয়ারম্যান সঞ্জয় কুমার ভৌমিক। চামড়া শিল্পনগরীর নানা বিষয় নিয়ে কারখানা মালিকসহ এ খাত সংশ্লিষ্ট নানা পক্ষের সঙ্গে আলাপ করেন তারা। সেখানে উঠে আসে নানা বিষয়। বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও মন্ত্রীরা সাংবাদিকদের সঙ্গেও আলাপ করেন।

শিল্পমন্ত্রী নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ুন বলেন, “চামড়া শিল্পনগরীর এই সমস্যা নিয়ে, বিসিকের যারা দায়িত্বে ছিলেন, তারা এখানে উপস্থিত ছিলেন, এছাড়াও চামড়া শিল্প সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও ট্যানারি মালিকরা উপস্থিত ছিলেন। আজকে আমরা কথাগুলো শুনেছি। মূলত সমস্যাগুলো শোনার পর সেগুলো সমাধানের জন্য আমরা সরেজমিনে বিষয়গুলো দেখেছি। বিদ্যমান সমস্যার সমাধানে কি করা যায়, সেটি নিয়ে আমরা আলোচনা করবো। সমাধান হিসেবে স্বল্পমেয়াদী, মধ্যমেয়াদী ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করেছি। একদিনে আসলে সমস্যা সমাধান করা সম্ভব নয়। এছাড়া সব কিছু বন্ধ করে দিয়েও, এ সমস্যার সমাধান এখন আমরা করতে পারছি না।”

ঢাকার সাভার উপজেলার হেমায়েতপুরে ট্যানারি শিল্প নগরীতে কাজ করছেন এক শ্রমিক (৬ মার্চ, ২০২৪)/মাহমুদ হোসেন অপু/ঢাকা ট্রিবিউন

তিনি আরও বলেন, “যেসব ত্রুটি রয়েছে, সেগুলো কিভাবে সমাধান করা যায়। সমাধান করে পরিবেশগত দিক রক্ষা করে তার মধ্য দিয়ে কিভাবে কাজ চালানো যায়। সেই পরিকল্পনা আমরা গ্রহণ করতে যাচ্ছি।”

ইটিপি সহজ করছে সরকার

এতদিন কেন্দ্রীয়ভাবে সিইটিপি দিয়েই চলছিল চামড়া শিল্পনগরী। তবে এরপরও ছিল নানা অভিযোগ। কারখানা মালিকরা চাইছিলেন, “ইটিপি করার অনুমতি।” তবে সরকারের নানা দপ্তরের ঘোরটোপে তা ছিল কঠিন। এবার সালমান এফ রহমান বললেন, “ইটিপি সহজ করা হয়েছে।”

তিনি বলেন, “শিল্প মন্ত্রণালয় ও বিসিক থেকেও বলে দেওয়া হয়েছে, যে কোনো মালিক নিজের টাকায়, নিজের কারখানায় যদি ইটিপি করতে চান। এ ক্ষেত্রে কোনো বাধা নেই। আগে বাধা ছিল। তবে এখন আর সেই বাধা নেই। আগে এই শিল্পনগরে চাইলেই নিজ উদ্যোগে ইটিপি করতে পারতো না। তবে এখন সেটি করতে পারবেন।”

চামড়া শিল্পনগরীর সিইটিপি পুরোপুরি কাজ না করায় নির্মাণ প্রতিষ্ঠানের ওপর দায় চাপিয়ে তিনি বলেন, “সাভার চামড়া শিল্পনগরীর সমস্যাগুলো বোঝার জন্যই আমরা মূলত এখানে আজকে এসেছিলাম। সবচেয়ে বড় সমস্যাটি হলো, সিইটিপিটি মূলত চীনা প্রতিষ্ঠান করেছিল। আমরা তাদেরকে যেভাবে কাজ করতে বলেছিলাম তারা কিন্তু সেভাবে কাজটি করে নাই। তাই আমরা তাদের যে পেমেন্ট ছিল, সেটি আমরা দেইনি, সেটা আটকানো আছে।”

সালমান এফ রহমান বলেন, “সিইটিপি যেভাবে করার কথা ছিল সেভাবে কাজ না করার কারণে, ওটা থেকে আমাদের যে ফল পাওয়ার আশা আমরা করেছিলাম সে অনুযায়ী আমরা আসলে ফল পাচ্ছি না। এখন আমরা চিন্তা করছি যেহেতু একটি বিনিয়োগ হয়ে গেছে সেটি তো আর ফেলে দেওয়া যায় না। তাই সমস্যার সমাধানে সবাইকে নিয়ে আলোচনা করেছি। সামনে যেহেতু কোরবানির ঈদ চলে আসছে তাই কোরবানির আগে কি কি পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে, সে বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হয়েছে। সাময়িকভাবে কোরবানির সময় যে সমস্যাটা হবে, কিছুটা হলেও কিভাবে সমাধান করা যায় আমরা আজকে আলোচনা করেছি।”

পরিবেশের সমস্যা সমাধানের বিষয় তুলে ধরে তিনি বলেন, “পরিবেশের সমস্যা, আমরা মালিকদের কথা শুনেছি মালিকদের সমস্যাটি হচ্ছে তারা বলছেন পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে যদি তারা সনদ না পান তাহলে তারা ব্যবসা করতে পারছেন না। অপরদিকে পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য হচ্ছে যদি আপনারা মান বজায় রাখতে না পারেন সেক্ষেত্রে কীভাবে সনদ দেব? পরিবেশমন্ত্রী একটা আশ্বাস দিয়েছেন যে কিছুটা ক্ষেত্রে তারা ছাড় দেবেন। তবে এটা সবসময়ের জন্য নয়, অল্প কিছুদিনের জন্য। আজকে এখানে আলোচনা হলো। চিন্তা করছি প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ে সংক্রান্ত একটি সভা ডাকব। সেখানে এ বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব। আজকে এখানে সমস্যাগুলো শুনলাম।”

৬ মার্চ, বুধবার সাভারের ট্যানারি শিল্প এলাকা পরিদর্শনে গিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন পরিবেশ মন্ত্রী সাবের হোসেন চৌধুরী ও প্রধানমন্ত্রীর শিল্প উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান/ঢাকা ট্রিবিউন

তিন ধাপে সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দিয়ে তিনি বলেন, “সংশ্লিষ্টদের নিয়ে সমস্যার সমাধানে কিভাবে আরো জোরালো পদক্ষেপ নেওয়া যায়। সেটি নিয়ে আলোচনা করবো। সমাধানটা আসলে একটা শর্ট টাম মিড টার্ম একটা লং টার্ম এগুলো নিয়ে আমরা আগামীতে কথা বলব।”

প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টা বলেন, “চীনে যে ৮০% লেদার যাচ্ছে তা মূলত ক্রাস্ট লেদার। সেগুলোকে বিভিন্নভাবে প্রক্রিয়াজাতকরণ করে ফিনিশ লেদারে পরিণত করে বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করছে চীন। আমরা নিজেরাই ফিনিশ লেদার রপ্তানি করতে পারলে আরও বেশি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব হতো।”

পরিবেশে আপাতত কিছুটা ছাড়

চামড়া খাতের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে সমস্যা চিহ্নিত করে নতুন পরিকল্পনা নেওয়া হবে বলে জানান পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক মন্ত্রী সাবের হোসেন চৌধুরী।

তিনি বলেন, “সমস্যার সমাধানের আগে আসলে আমাদের যে বিষয়টি জানার দরকার ছিল, সেটি হলো- সমস্যাটা কি সমস্যাটা কীভাবে হচ্ছে? আজকে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে। আমরা সমস্যা নির্ধারণ করতে পেরেছি।”

তিনি আরও বলেন, “মৌলিক কোনো জায়গায় ছাড় হবে না। পরিবেশের ক্ষতি করে জনস্বাস্থ্যকে আরও ঝুঁকিতে ফেলে দেওয়া, এ ধরনের নীতির ক্ষেত্রে কোনো আপস হবে না।”

About

Popular Links