Friday, June 05, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

এনবিআর বিলুপ্তির যে ব্যাখ্যা দিল সরকার

এনবিআর বিলুপ্ত করে দুটি বিভাগ গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার

আপডেট : ১৩ মে ২০২৫, ০৬:০০ পিএম

মধ্যরাতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) বিলুপ্ত করে অধ্যাদেশ জারি করেছে সরকার। সেই সঙ্গে সংস্থাটি ভেঙে রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা নামে দুটি বিভাগ সৃষ্টি করা হয়েছে। যে দুটি বিভাগ গঠনের সিদ্ধান্ত হয়েছে, তার মূল লক্ষ্য হলো রাজস্ব নীতি প্রণয়ন ও কর ব্যবস্থাপনার কাজ আলাদা করা।

মঙ্গলবার (১৩ মে) অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইংয়ের ভেরিফায়েড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে পেজে এক পোস্টের মাধ্যমে এনবিআর বিলুপ্ত করার ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে।

ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, ৫০ বছরের বেশি সময় ধরে এনবিআর রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত মাত্র ৭.৪%; যা এশিয়ার মধ্যে অন্যতম সর্বনিম্ন। বিশ্বে কর-জিডিপির গড় অনুপাত ১৬.৬%। এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ অর্থনৈতিক শক্তি মালয়েশিয়ায় এই অনুপাত ১১.৬%। দেশের উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে অন্তত ১০% কর-জিডিপির অনুপাত অর্জন করতেই হবে।

ব্যাখ্যায় আরও বলা হয়েছে, কর-জিডিপির অনুপাতের এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে এনবিআর পুনর্গঠন জরুরি। একই সংস্থা রাজস্ব নীতি প্রণয়ন এবং সেই নীতির বাস্তবায়ন করবে- এ অবস্থান সাংঘর্ষিক। সেই সঙ্গে এটা ব্যবস্থা হিসেবে অদক্ষ। দীর্ঘদিন ধরে দেশের ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করে আসছেন, নীতি প্রণয়নে রাজস্ব আহরণকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে; ন্যায়বিচার, প্রবৃদ্ধি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার কথা উপেক্ষা করা হয়েছে।

দীর্ঘদিনের কিছু প্রধান সমস্যা

প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং বলেছে, একই প্রতিষ্ঠানের হাতে নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের দায়িত্ব থাকায় করনীতিতে পক্ষপাতিত্ব ও অনিয়ম হয়েছে। কর আদায়ে নিয়োজিত কর্মকর্তারা কার্যকর জবাবদিহি ছাড়াই কর ফাঁকিদাতাদের সঙ্গে গোপনে সমঝোতা করার সুযোগ পান। এটা জনস্বার্থের পরিপন্থী। অনেক সময় কর আদায়কারীরা ব্যক্তিস্বার্থে ফাঁকিদাতাদের সাহায্য করেন। এছাড়াও কর্মদক্ষতা মূল্যায়নের বস্তুসম্মত কাঠামো নেই। প্রণোদনা বা পদোন্নতির সুনির্দিষ্ট সূচক নেই। কর কর্মকর্তারা নিজ কাজে কতটুকু নৈপুণ্য দেখাচ্ছেন, তার মানদণ্ডও নেই।

নীতি ও প্রশাসনের দ্বৈত দায়িত্বের কারণে এনবিআরের মনোযোগ নির্দিষ্ট কোনো দিকে থাকে না। ফলে করজাল সম্প্রসারিত হচ্ছে না এবং রাজস্ব সম্ভাবনার তুলনায় অনেক কম আহরিত হচ্ছে।

এছাড়াও আইন প্রয়োগে অসামঞ্জস্য, বিনিয়োগ সহায়তার অভাব, সুশাসনের পদ্ধতিগত দুর্বলতা- এসব কারণে এনবিআরের ওপর মানুষের আস্থা কমে গেছে। এসব কারণে আইনের শাসন আরও দুর্বল হয়েছে।

বর্তমানে অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের প্রধানই এনবিআরের প্রধান। সে কারণে অস্পষ্টতা, অদক্ষতাও সৃষ্টি হচ্ছে। ফলে নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের কার্যকারিতা ব্যাহত হচ্ছে।

এই সংস্কার নিয়ে অভিজ্ঞ রাজস্ব ও কাস্টমস কর্মকর্তাদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তাঁরা ভাবছেন, তাঁরা উপেক্ষিত বা কোণঠাসা হয়ে পড়বেন।

সংস্কারের সম্ভাব্য সুফল

এনবিআর ভেঙে দুটি বিভাগ গঠন করা হলে দীর্ঘদিনের এসব জটিল সমস্যা সমাধানে আরও স্পষ্ট ও জবাবদিহিমূলক কাঠামো প্রণয়ন করা যাবে।

রাজস্ব নীতি বিভাগ কর আইন প্রণয়ন, করহার নির্ধারণ ও আন্তর্জাতিক কর চুক্তি পরিচালনার দায়িত্বে থাকবে। অন্যদিকে রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগের দায়িত্ব হবে, কর আদায়, নিরীক্ষা (অডিট) ও আইন মেনে চলার বিষয়গুলো তদারক করা। এই দায়িত্ব বিভাজনের মাধ্যমে নিশ্চিত করা হচ্ছে, যারা কর নির্ধারণ করবেন, তারা কর আদায়ে যুক্ত থাকবেন না। ফলে গোপন সমঝোতা বা অনিয়মের আশঙ্কা কমবে।

প্রতিটি বিভাগ নিজ নিজ দায়িত্বে মনোনিবেশ করলে বিশেষায়িত দক্ষতা, প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়বে; কমবে স্বার্থের সংঘাত।

প্রেস উইং বলেছে, প্রত্যক্ষ কর আদায় বাড়ানোর মাধ্যমে পরোক্ষ করের ওপর নির্ভরতা কমানো যাবে এবং দক্ষ জনবলের উপযুক্ত ব্যবহার নিশ্চিত হবে। স্বতন্ত্র নীতিনির্ধারণী ইউনিট থাকলে স্বল্পমেয়াদি রাজস্ব লক্ষ্যের বদলে তথ্যনির্ভর, দূরদর্শী করনীতি প্রণয়ন করা সম্ভব হবে। নীতির স্বচ্ছতা, ধারাবাহিকতা ও পেশাদার প্রশাসন দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণ করবে। এতে অভিযোগ কমবে বেসরকারি খাতের।

ব্যাখ্যায় আরও বলা হয়েছে, এনবিআর ভেঙে রাজস্ব নীতি বিভাগ ও ব্যবস্থাপনা বিভাগ গঠন শুধু প্রশাসনিক পরিবর্তন নয়; বরং ন্যায়ভিত্তিক ও দক্ষ করব্যবস্থা প্রণয়নের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ। শক্তিশালী নীতি নির্ধারণ ও স্বচ্ছ প্রশাসন বাংলাদেশের নাগরিকদের স্বপ্নপূরণে সহায়ক হবে।

   

About

Popular Links

x