ঢাকাই সিনেমার ইতিহাসে এমন কিছু তারকা রয়েছেন, যাদের জনপ্রিয়তা সময়ের সঙ্গে কমেনি। বরং প্রজন্ম পেরিয়ে আরও ছড়িয়ে পড়েছে। চিত্রনায়ক সালমান শাহ তাদেরই একজন। আজ তার ৩০তম মৃত্যুবার্ষিকী।
১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর না ফেরার দেশে পাড়ি জমান সালমান শাহ। তার মৃত্যুর তিন দশক পেরিয়ে গেলেও দর্শকের হৃদয়ে তার জায়গা এখনও অমলিন।
সালমান শাহ'র প্রকৃত নাম চৌধুরী মোহাম্মদ শাহরিয়ার ইমন। ১৯৭১ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর সিলেটে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তার বাবা কমর উদ্দিন চৌধুরী এবং মা নীলা চৌধুরী। পরিবারের বড় ছেলে সালমান শাহ ১৯৯২ সালের ১২ আগস্ট সামিরাকে বিয়ে করেন।
প্রথম সিনেমা দিয়েই বাজিমাত
টেলিভিশন নাটক ও মডেলিং দিয়ে ক্যারিয়ার শুরু করেছিলেন সালমান শাহ। ১৯৯৩ সালে সোহানুর রহমান সোহান পরিচালিত ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ সিনেমার মাধ্যমে বড় পর্দায় অভিষেক হয় তার। সিনেমাটি মুক্তির পর যেন রাতারাতি বদলে যায় তার জীবন।
মাত্র চার বছরের চলচ্চিত্রজীবনে ২৭টি সিনেমায় অভিনয় করেন সালমান শাহ। অভিনয়ের পাশাপাশি সংলাপ বলার সহজাত ধরন, পর্দায় স্বচ্ছন্দ উপস্থিতি ও সমকালীন ফ্যাশন তাকে অন্য নায়কদের থেকে আলাদা করে দেয়। নব্বইয়ের দশকের তরুণদের কাছে তিনি হয়ে ওঠেন ফ্যাশন ও স্টাইলের প্রতীক।
জনপ্রিয় সিনেমা
‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ সিনেমার সাফল্যের পর সালমান শাহকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। একের পর এক মুক্তি পায় ‘তুমি আমার’, ‘অন্তরে অন্তরে’, ‘সুজন সখী’, ‘বিক্ষোভ’, ‘দেনমোহর’, ‘স্বপ্নের ঠিকানা’, ‘বিচার হবে’, ‘এই ঘর এই সংসার’, ‘তোমাকে চাই’, ‘স্বপ্নের পৃথিবী’, ‘সত্যের মৃত্যু নেই’, ‘জীবন সংসার’, ‘চাওয়া থেকে পাওয়া’, ‘আনন্দ অশ্রু’ ও ‘বুকের ভেতর আগুন’।
সালমান শাহর ২৭টি চলচ্চিত্রের ১৩টিতেই নায়িকা ছিলেন শাবনূর। পর্দায় দুজনের রসায়ন দর্শকের কাছে এতটাই গ্রহণযোগ্য হয়েছিল যে নব্বইয়ের দশকের সবচেয়ে জনপ্রিয় জুটিগুলোর একটি হয়ে ওঠেন তারা। সালমানের মৃত্যুর পরও একাধিকবার তার সঙ্গে কাজের স্মৃতি ও আক্ষেপের কথা জানিয়েছেন শাবনূর। তবে মৌসুমী, শাবনাজ, লিমা, শিল্পী ও সোনিয়াসহ সে সময়ের আরও কয়েকজন অভিনেত্রীর সঙ্গেও অভিনয় করেছিলেন সালমান।
সময়ের সঙ্গে প্রযুক্তি বদলেছে, বদলেছে দর্শকের সিনেমা দেখার মাধ্যমও। কিন্তু সালমান শাহর জনপ্রিয়তায় তেমন পরিবর্তন আসেনি। ইউটিউব, ফেসবুকসহ বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে তার সিনেমা ও গান এখনো নতুন প্রজন্মের দর্শকের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। পুরোনো দর্শকেরা যেমন তার স্মৃতিতে ফিরে যাচ্ছেন, তেমনি নতুন প্রজন্মের কাছেও তিনি হয়ে উঠছেন চিরসবুজ এক নায়ক।
মৃত্যুবার্ষিকীতে বিশেষ আয়োজন
সালমান শাহর ৩০তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএফডিসি) বিশেষ আয়োজন করেছে। ‘সালমান শাহ স্মরণে’ শিরোনামে ৬ থেকে ৮ সেপ্টেম্বর তিন দিনব্যাপী তার অভিনীত তিনটি সিনেমা বিনামূল্যে প্রদর্শন করা হবে। বিএফডিসির ভিআইপি প্রজেকশন হলে প্রতিদিন বিকেল ৪টায় সিনেমাগুলো প্রদর্শন করা হবে।
এখনও আলোচনায় মৃত্যুর রহস্য
১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর রাজধানীর ইস্কাটনে নিজ ফ্ল্যাট থেকে সালমান শাহর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। প্রথমে তার বাবা কমর উদ্দিন আহমদ চৌধুরী অপমৃত্যু মামলা করেন। পরে ছেলেকে হত্যা করা হয়েছে অভিযোগ করে ১৯৯৭ সালের ২৪ জুলাই মামলাটি হত্যা মামলা হিসেবে নেওয়ার আবেদন করেন তিনি।
আদালতের নির্দেশে সিআইডি তদন্ত করে ১৯৯৭ সালের ৩ নভেম্বর চূড়ান্ত প্রতিবেদনে জানায়, সালমান শাহ আত্মহত্যা করেছেন। তবে ওই প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে সালমানের বাবা রিভিশন মামলা করেন। ২০০৩ সালে আদালত মামলাটি বিচার বিভাগীয় তদন্তে পাঠায়। দীর্ঘ ১১ বছর পর ২০১৪ সালে দেওয়া সেই প্রতিবেদনেও হত্যার অভিযোগ নাকচ করা হয়।
২০১৫ সালে ১১ জনের নাম উল্লেখ করে সালমানের মা নীলা চৌধুরী দাবি করেন, তারা তার ছেলেকে হত্যার সঙ্গে জড়িত থাকতে পারেন।
এরপর মামলাটি র্যাব তদন্ত করলেও ২০১৬ সালে আদালতের নির্দেশে তাদের তদন্ত থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। পরে পিবিআই তদন্তের দায়িত্ব পায়। প্রায় চার বছর তদন্ত শেষে ২০২০ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি পিবিআই চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয়। সেখানে ৫৪ জনের সাক্ষ্য ও জব্দ করা আলামত পর্যালোচনা করে হত্যার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে জানানো হয়। প্রতিবেদনে পারিবারিক কলহ ও মানসিক যন্ত্রণায় সালমান আত্মহত্যা করেছিলেন বলে উল্লেখ করা হয়।
২০২১ সালে আদালত পিবিআইয়ের প্রতিবেদন গ্রহণ করে আসামিদের অব্যাহতি দেন। তবে সালমানের পরিবার এতে সন্তুষ্ট হয়নি এবং আবারও আদালতে রিভিশন আবেদন করে।
২০২৫ সালের অক্টোবরে ঢাকার ষষ্ঠ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালত সেই আবেদন মঞ্জুর করে ঘটনাটি হত্যা মামলা হিসেবে তদন্তের নির্দেশ দেন। এরপর সালমানের বন্ধু ও অভিনেতা ডনসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করা হয়। পরে ডনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
মামলার অন্য আসামিদের মধ্যে রয়েছেন সালমানের স্ত্রী সামিরা হক, তার মা লতিফা হক লুসি, শিল্পপতি ও সাবেক চলচ্চিত্র প্রযোজক আজিজ মোহাম্মদ ভাইসহ আরও কয়েকজন। প্রায় তিন দশক ধরে একাধিক তদন্ত ও আদালতের আদেশের পরও সালমান শাহর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিয়ে বিতর্কের অবসান হয়নি।
সবশেষে বলতে চাই, সালমান শাহ নেই, কিন্তু রয়ে গেছে তার অভিনীত সিনেমা, গান, সংলাপ ও নিজস্ব স্টাইল। কোটি দর্শকের ভালোবাসায় তাই তিন দশক পরও তিনি ঢাকাই সিনেমার অন্যতম প্রিয় ও আলোচিত নায়ক।



