ঢাকায় পড়াশোনা করেছেন অথচ 'ভিকারুন নিসা নুন স্কুল অ্যান্ড কলেজ' নামটির সাথে পরিচয় নেই, এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া ভার। কিন্তু সেই বিশাল প্রতিষ্ঠানের পেছনের মানুষটি কে ছিলেন? কেন একজন অস্ট্রিয়ান নারী সুদূর ইউরোপ ছেড়ে এদেশের মেয়েদের শিক্ষার জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন? আজ জানবো সেই অজানা, অবিশ্বাস্য গল্প।
১৯২০ সালে অস্ট্রিয়ায় জন্ম নেওয়া মেয়েটির নাম ছিল ভিক্টোরিয়া। শৈশব-কৈশোর কাটিয়েছেন ইংল্যান্ডে। তিনি ছিলেন শিক্ষিত, স্বাধীনচেতা, আধুনিক। তখনও কেউ কল্পনা করতে পারেনি যে, এই মেয়েটিই দুই পাকিস্তানের (পূর্ব ও পশ্চিম) মেয়েদের শিক্ষার জন্য অমর কীর্তি রেখে যাবেন।
১৯৪৫ সালে লন্ডনে তার পরিচয় হয় ব্রিটিশ ভারতের প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ স্যার ফিরোজ খান নুন-এর সাথে। বয়সের ব্যবধান ২৭ বছর হলেও দুজনের মধ্যে গড়ে ওঠে ভালোবাসা। বিয়ের পর ভিক্টোরিয়া ইসলাম গ্রহণ করেন এবং তার নতুন নাম হয় ভিকার-উন-নিসা, যার অর্থ 'নারীদের শ্রেষ্ঠত্ব'। এরপর থেকে তিনি 'লেডি নুন' বা 'বেগম নুন' নামে পরিচিত।
স্বামীর হাত ধরে তিনি চলে আসেন এই উপমহাদেশে। তিনি কেবল গৃহবধূ হয়ে থাকেননি; মুসলিম লীগের নারী শাখার নেতৃত্ব দিয়ে পাকিস্তান আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে রাজপথে নেমেছেন, ১৪৪ ধারা ভেঙেছেন, এমনকি তিনবার কারাবরণও করেছেন। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের স্বাধীনতার পরে এবং সীমান্ত দিয়ে অনেক মানুষ স্থানান্তর হওয়ার ফলে তিনি উদ্বাস্তুদের জন্য উন্নয়নমূলক কাজে নিজেকে যুক্ত করেন। বিভিন্ন উদ্বাস্তু ক্যাম্প ও কমিটিকে সহযোগিতা করেছেন।
১৯৫০ সালে ফিরোজ খান নুন পূর্ববাংলার (পূর্ব পাকিস্তানের) প্রথম পাকিস্তানি গভর্নর নিযুক্ত হন। লেডি নুনও চলে আসেন ঢাকায়। এখানেই তার জীবনের অন্যতম বড় অবদান শুরু হয়। তিনি দেখলেন—পূর্ববাংলার মেয়েদের আধুনিক শিক্ষার সুযোগ খুবই কম।
এরপর রমনা জিমখানায় একটি ছোট প্রিপারেটরি স্কুল দেখতে গিয়ে মুগ্ধ হন। তাই তিনি নিজে পৃষ্ঠপোষকতা নেন। ১৯৫২ সালের ১৪ জানুয়ারি স্কুলটি বেইলি রোডে স্থানান্তরিত হয় এবং তার নামে নামকরণ হয়—ভিকারুন নিসা নুন স্কুল। প্রথমে মাত্র কয়েকজন শিক্ষার্থী নিয়ে শুরু হলেও আজ সেই স্কুলটি ঢাকাসহ বিভিন্ন জায়গায় শাখা নিয়ে হাজার হাজার মেয়েকে আলোকিত করছে।
১৯৭৮ সালে স্কুলটি মাধ্যমিক থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে উন্নীত হয়। ৭১ বছর পার করা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম মূলত এর প্রধান শাখা নিউ বেইলি রোডকে কেন্দ্র করে চলছে। তবে মোট চারটি শাখা মিলিয়ে ২৪ হাজারের বেশি ছাত্রী আছে এই স্কুল অ্যান্ড কলেজে। আজ এটি বাংলাদেশের সেরা মেয়েদের বিদ্যাপীঠগুলোর একটি।
কেবল ঢাকা নয়, পাকিস্তানের রাওয়ালপিন্ডিতেও তিনি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছেন এবং "ভিকি নুন এডুকেশনাল ফাউন্ডেশন"-এর মাধ্যমে মেধাবী শিক্ষার্থীদের অক্সফোর্ড-ক্যামব্রিজে পড়ার সুযোগ করে দিয়েছেন।
রাজনীতিতে শুধু স্বামীর ছায়া নন, তিনি নিজেই ছিলেন কূটনীতিক। ১৯৫৬ সালে গোয়াদর বন্দরকে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত করার পেছনে তার অবদান অবিস্মরণীয়। লন্ডনে গিয়ে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট, হাউস অব লর্ডস এবং এমনকি উইনস্টন চার্চিলের সঙ্গে লবিং করেন। ওমানের সুলতানের কাছ থেকে গোয়াদর কেনার চুক্তি সম্পন্ন হয় তারই অক্লান্ত প্রচেষ্টায়। ১৯৫৭-৫৮ সালে স্বামী পাকিস্তানের সপ্তম প্রধানমন্ত্রী হন।
স্বামীর মৃত্যুর (১৯৭০) পরও তিনি থেমে যাননি। ১৯৭৮ সালে পাকিস্তান ট্যুরিজম ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশনের চেয়ারপার্সন ও মন্ত্রী পদে দায়িত্ব পালন করেন। 'ফ্রম মেমরি' নামে আত্মজীবনী লিখেছেন। ১৯৫৯ সালে পাকিস্তান সরকার তাকে দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার নিশান-ই-ইমতিয়াজ প্রদান করে।
২০০০ সালের ১৬ জানুয়ারি ইসলামাবাদে তিনি পরলোকগমন করেন। কিন্তু তার স্বপ্ন আজও বেঁচে আছে—আজ ভিকারুণ নিসা স্কুলের হাজার হাজার ছাত্রী যখন ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার বা দেশের কর্ণধার হয়ে গড়ে ওঠে, তখন আড়ালে হাসেন সেই অস্ট্রিয়ান নারী।
আজকের দিনে আমরা নারী ক্ষমতায়ন নিয়ে অনেক কথা বলি, কিন্তু ভিকারুন নিসা নুন সেই সত্তর বছর আগেই তা করে দেখিয়েছিলেন।



