মাঠজুড়ে ফুটে আছে অসংখ্য কাশফুল। ঝলমলে রোদ ছড়িয়ে পড়েছে দিগন্তে। তারই মাঝখানে বসে আছে দুই ভাই-বোন, অপু আর দুর্গা। হঠাৎ মাথা তুলে দেখে - দূরে ট্রেনের কালো ধোঁয়া রোদের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে। এই দৃশ্যটি যখন প্রথম ক্যামেরাবন্দি হয় তখন সেই মানুষটি নিজেও জানতেন না যে তিনি কেবল একটি চলচ্চিত্র নয়, বরং বাঙালির সংস্কৃতির এক নতুন অধ্যায় তৈরি করছেন।'পথের পাঁচালী' কি নিছকই একটি চলচ্চিত্র? না, তা ছিল এক নবাগত পরিচালকের দুই চোখের স্বপ্ন, যা কয়েক বছর পরই বাংলার ঘরে ঘরে আবেগের সৃষ্টি করেছে।
আজ ২৩শে এপ্রিল, সত্যজিৎ রায়ের মৃত্যুবার্ষিকী। উনাকে নিয়ে আজ পর্যন্ত হাজার হাজার পাতা লেখা হয়ে গেছে। তার জীবন আর কাজ নিয়ে এমন কোনো ক্ষেত্র বোধহয় বাকি নেই যা নিয়ে কাটাছেঁড়া হয়নি। সেই পরিপ্রেক্ষিতে কী নিয়ে লিখব, সেটা নিয়ে একটা দ্বন্দ্ব মনের মধ্যে সব সময়ই কাজ করে। তিনি আমাদের সত্তার গভীরে এমনভাবে শিকড় গেড়েছেন যে, জাগরণে কিংবা স্বপ্নে - তিনি বারবার আবির্ভূত হন।
রূপালি পর্দায় তার যাত্রা
সত্যজিতের যাত্রাটা কিন্তু সরাসরি ক্যামেরা দিয়ে শুরু হয়নি। ১৯৪৩ সালে বিজ্ঞাপন সংস্থা ডি জে কেইমারে যোগ দেওয়ার পর থেকেই তার অক্ষর আর ছবি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু। পরে 'সিগনেট প্রেস' এ প্রচ্ছদশিল্পী হিসেবে কাজ করার সময় যখন বিভূতিভূষণের 'আম আঁটির ভেঁপু' তার হাতে এল, তখনই তার ভেতরে সিনেমার বীজ বপন হয়েছিল। তিনি শুধু সিনেমা বানায়নি, সিনেমার পোস্টার থেকে শুরু করে ক্যালিগ্রাফি - সবই ছিল তার নিখুঁত শিল্পের অংশ। তার তৈরি ইংরেজি ফন্ট 'রে রোমান' বা 'বিজার' আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি পেয়েছে।
বহুমুখী প্রতিভার শিল্পী
সত্যজিতের কাজের পরিধি কেবল পরিচালক হিসেবে সীমাবদ্ধ নয়। তার প্রতিটি সৃষ্টিই ছিল এক একটি আলাদা জগত:
অপু ট্রিলজি ও মানবিকতা: 'পথের পাঁচালী' থেকে শুরু করে 'অপরাজিত' আর 'অপুর সংসার' -এই তিন ছবিতে তিনি মানুষের দারিদ্র্য, বড় হওয়া আর একাকীত্বকে যেভাবে দেখিয়েছেন, তা বিশ্ব চলচ্চিত্রের পাঠ্যবই।
নারীর বলিষ্ঠ রূপ: 'চারুলতা' বা 'মহানগর'- এর মতো ছবিতে তিনি তৎকালীন সমাজব্যবস্থায় নারীর মনস্তত্ত্ব আর স্বাধীনতার যে সূক্ষ্ম লড়াই দেখিয়েছেন, তা আজও সমসাময়িক। আরতির ঘরের বাইরে কাজে বের হওয়া কিংবা চারুলতার সেই নিঃসঙ্গ অপেরা গ্লাস - সবই তার জাদুকরী ডিটেইলসের প্রমাণ।
মিউজিক্যাল ফ্যান্টাসি: 'গুপী গাইন বাঘা বাইন' ছবির মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে রূপকথা আর সুরের মিশেলে কীভাবে সাধারণ মানুষকে রাজনীতি আর স্বৈরশাসন বিরোধী বার্তা দেওয়া যায়।
রহস্য ও মগজাস্ত্র: বাঙালির কিশোরবেলা অপূর্ণ থেকে যেত যদি না সত্যজিৎ 'ফেলুদা' কে সৃষ্টি করতেন। 'সোনার কেল্লা' বা 'জয় বাবা ফেলুনাথ'- এর মতো ছবিতে তিনি কোনো অশ্লীলতা বা অতিরিক্ত ভায়োলেন্স ছাড়াই কেবল বুদ্ধির জোরে রহস্য সমাধানের পথ দেখিয়েছিলেন।
সঙ্গীত ও শিল্পের উত্তরাধিকার
সত্যজিৎ নিজেই নিজের ছবির আবহ সঙ্গীত পরিচালনা করতেন। দৃশ্য অনুযায়ী কখন সেতার বাজবে আর কখন বেহালা - তা তিনি নিখুঁতভাবে জানতেন। 'সন্দেশ' পত্রিকার হাল ধরা থেকে শুরু করে টাইপোগ্রাফির আধুনিকায়ন - সব জায়গায় তিনি ছড়িয়ে দিয়েছেন তার শৈল্পিক ছোঁয়া। তার এই কাজের বিশালতা কোনো একদিনের আলোচনায় শেষ হওয়ার নয়।
আজকের দ্রুতগতির ডিজিটাল যুগেও সত্যজিতের সেই শৈল্পিক ধৈর্য আমাদের শেখায় নিখুঁত হতে। হয়তো উনাকে নিয়ে অনেক লেখা হয়েছে এবং ভবিষ্যতেও হবে। তবে আমাদের ভেতরে যে সত্যজিৎ রায় এর শিকড় আছেন, তার প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের কোনো শেষ নেই। তার মৃত্যুবার্ষিকীতে এই প্রতিবেদনটি কেবল একটি শ্রদ্ধাঞ্জলি নয়, বরং আমাদের প্রত্যেকের মনের ভেতরে থাকা সেই 'ব্যক্তিগত' সত্যজিৎকে একবার ছুঁয়ে দেখার চেষ্টা।



