Sunday, June 07, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

মন খারাপ হলেই কেন অদৃশ্য হয় ফেসবুক অ্যাকাউন্ট?

মনোবিজ্ঞানীরা একে দেখছেন 'ডিজিটাল এস্কেপিজম' বা অনলাইন জগত থেকে পলায়নবৃত্তি হিসেবে  

আপডেট : ২৮ এপ্রিল ২০২৬, ১০:০৬ পিএম

ফেসবুক স্ক্রল করতে করতে হঠাৎ দেখলেন কাছের কোনো বন্ধুর প্রোফাইলটি আর দেখা যাচ্ছে না। সার্চ দিয়েও মিলছে না হদিস। কিছুক্ষণ আগেই হয়তো তিনি বিষণ্ণ কোনো গান বা রহস্যময় স্ট্যাটাস দিয়েছিলেন, আর এখন তিনি 'অদৃশ্য'। বর্তমান সময়ে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে মন খারাপ হলে ফেসবুক অ্যাকাউন্ট ডিঅ্যাক্টিভেট করে দেওয়ার এই প্রবণতাটি এখন আর কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি হয়ে দাঁড়িয়েছে এক নতুন ট্রেন্ড।

মনোবিজ্ঞানীরা একে দেখছেন এক ধরণের 'ডিজিটাল এস্কেপিজম' বা অনলাইন জগত থেকে পলায়নবৃত্তি হিসেবে। কেন এই অন্তর্ধান? এর নেপথ্যে কাজ করে বেশ কিছু মনস্তাত্ত্বিক তত্ত্ব।  

কৃত্রিম সুখের ভিড়ে 'সোশ্যাল কম্পারিজন'

মনোবিজ্ঞানী লিওন ফেস্টিঞ্জারের 'সোশ্যাল কম্পারিজন থিওরি' অনুযায়ী, মানুষ সবসময় অন্যের সাথে নিজের তুলনা করে। মন খারাপ থাকলে যখন নিউজফিডে অন্যদের সাফল্যের ছবি ভেসে ওঠে, তখন ব্যক্তি নিজের জীবনের সাথে তার তুলনা করে আরও হীনমন্যতায় ভোগেন।
ইউনিভার্সিটি অফ পেনসিলভানিয়ার এক গবেষণায় দেখা গেছে, যারা সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার কমিয়ে দেন বা সাময়িকভাবে বিচ্ছিন্ন থাকেন, তাদের মধ্যে এই 'তুলনা করার মানসিকতা' কমে যাওয়ায় মানসিক প্রশান্তি দ্রুত ফিরে আসে। এই হীনমন্যতা থেকে বাঁচতেই মূলত মানুষ নিজেকে সরিয়ে নেয়।

নিয়ন্ত্রণের মনস্তত্ত্ব ও 'কন্ট্রোল থিওরি'

বাস্তব জীবনের অনেক সংকটই মানুষের নিয়ন্ত্রণে থাকে না। কিন্তু নিজের সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্টটি সম্পূর্ণ নিজের অধিকারে। যখন কেউ অনুভব করেন যে চারপাশের পরিস্থিতির ওপর তার নিয়ন্ত্রণ নেই, তখন তিনি ফেসবুক অ্যাকাউন্ট ডিঅ্যাক্টিভেট করার মাধ্যমে এক ধরণের 'Psychological Control' ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করেন। এটি তাকে সাময়িক এক মানসিক শক্তি বা মুক্তির স্বাদ দেয়।

 যখন মস্তিষ্ক আর নিতে পারে না 

'কগনিটিভ লোড থিওরি' বলছে, বিষণ্ণতা বা মানসিক চাপের সময় আমাদের মস্তিষ্কের তথ্য প্রসেস করার ক্ষমতা কমে যায়। ফেসবুকের অগণিত তথ্য, অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক আর ভিডিওর ভিড় মস্তিষ্কের ওপর বাড়তি চাপ (Overload) তৈরি করে। ল্যাঙ্কাস্টার ইউনিভার্সিটি-র এক গবেষণায় দেখা গেছে, এই মানসিক ক্লান্তি বা 'টেকনোস্ট্রেস' থেকে বাঁচতে মানুষ লড়াই করার চেয়ে 'পালিয়ে যাওয়া' বা 'অদৃশ্য হওয়া' কে সহজ সমাধান মনে করে।

গবেষণা যা বলছে 

স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটি এবং নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটি (NYU)-র এক যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, মাত্র চার সপ্তাহ ফেসবুক থেকে দূরে থাকলে মানুষের ব্যক্তিগত 'ওয়েল-বিয়িং' বা সুখের মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায় এবং সামাজিক উদ্বেগ কমে আসে।

'অ্যাভয়ডেন্স কোপিং' বা এড়িয়ে চলার কৌশল

মনোবিজ্ঞানের ভাষায় এটি এক ধরণের 'Avoidance Coping Mechanism'। অর্থাৎ, সমস্যার মুখোমুখি না হয়ে সাময়িকভাবে নিজেকে আড়াল করে রাখা। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, ডিজিটাল দুনিয়া থেকে অদৃশ্য হওয়া মানে হলো নিজেকে একটি নিরাপদ জায়গায় বন্দি করা, যেখানে বাইরের কোনো নেতিবাচক বার্তা বা অন্যের কৌতূহলী প্রশ্ন তাকে স্পর্শ করতে পারবে না।  

বিশেষজ্ঞদের মতে, এখানে এক অদ্ভুত দ্বন্দ্ব কাজ করে। কেউ চান সম্পূর্ণ একা থাকতে, যেখানে তাকে কেউ মিথ্যা সান্ত্বনা দিতে আসবে না। আবার অনেকের ক্ষেত্রে এটি কাজ করে একটি 'সাইলেন্ট কল ফর হেল্প' হিসেবে। তারা অবচেতনভাবে আশা করেন, তাদের হঠাৎ অনুপস্থিতি প্রিয়জনদের ভাবিয়ে তুলুক এবং কেউ অন্তত খোঁজ নিক।

ডিজিটাল এই যুগে 'অদৃশ্য' হওয়া সহজ হলেও নিজের অস্থিরতা থেকে ছুটি পাওয়াটা চ্যালেঞ্জের। তাই আড়ালে চলে না গিয়ে নিজের মনের প্রকৃত সমস্যার সমাধান খোঁজাটাই জরুরি। 

   

About

Popular Links

x