বিশ্বব্যাপী ক্যান্সারজনিত মৃত্যুর প্রধান কারণ ফুসফুসের ক্যান্সার। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্যমতে, প্রতিবছর বিশ্বে প্রায় ২৫ লাখ মানুষ নতুন করে এই রোগে আক্রান্ত হন এবং প্রাণ হারান প্রায় ১৮ লাখ রোগী। নারীদের তুলনায় পুরুষদের মধ্যে এ রোগে আক্রান্ত হওয়ার হার ও মৃত্যুঝুঁকি অনেক বেশি।
বাংলাদেশেও এই রোগের ভয়াবহতা কম নয়। বিভিন্ন জরিপ অনুযায়ী, দেশের মোট ক্যান্সার আক্রান্ত রোগীর প্রায় ১৭ থেকে ১৮% ফুসফুসের ক্যান্সারে ভুগছেন। চিকিৎসকদের মতে, এই ক্যান্সারের শতকরা ৯০ ভাগ ক্ষেত্রেই মূল দায়ী ধূমপান, যা সম্পূর্ণ প্রতিরোধযোগ্য।
কেন হয় ফুসফুসের ক্যান্সার?
ফুসফুসের টিস্যুতে অস্বাভাবিক কোষ বৃদ্ধির ফলে টিউমার তৈরি হয়, যা পরবর্তীতে ক্যানসারে রূপ নেয়। এই রোগের প্রধান কারণগুলো হলো:
ধূমপান ও তামাক সেবন: ফুসফুসের ক্যান্সারের সবচেয়ে বড় কারণ সরাসরি সিগারেট, বিড়ি বা তামাক সেবন।
পরোক্ষ ধূমপান: নিজে ধূমপান না করলেও নিয়মিত ধূমপায়ীদের ধোঁয়ার সংস্পর্শে থাকলে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
পরিবেশগত কারণ: তীব্র বায়ুদূষণ, রেডন গ্যাস এবং অ্যাসবেস্টসের মতো ক্ষতিকর রাসায়নিকের সংস্পর্শে আসা।
বংশগত কারণ: পরিবারে ফুসফুসের ক্যান্সারের ইতিহাস থাকলেও এই রোগের ঝুঁকি বাড়ে।
যেসব প্রাথমিক লক্ষণ অবহেলা করবেন না
ফুসফুসের ক্যান্সারের প্রাথমিক পর্যায়ে সাধারণত কোনো স্পষ্ট উপসর্গ দেখা যায় না। তবে রোগ ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথে নিচের লক্ষণগুলো প্রকাশ পায়:
- একটানা কাশি, যা সহজে ভালো হয় না এবং দিন দিন বাড়তে থাকে।
- কাশির সঙ্গে রক্ত বা কফ বের হওয়া।
- শ্বাসকষ্ট বা শ্বাস নেওয়ার সময় বুকে শোঁ শোঁ শব্দ হওয়া।
- বুক, পিঠ বা কাঁধে একটানা ব্যথা।
- ঘন ঘন বুকে ইনফেকশন (যেমন: নিউমোনিয়া বা ব্রঙ্কাইটিস) হওয়া।
- কোনো স্পষ্ট কারণ ছাড়াই দ্রুত ওজন কমে যাওয়া এবং প্রচণ্ড ক্লান্তি ও দুর্বলতা।
প্রধান দুই ধরন
ফুসফুসের ক্যান্সার সাধারণত দুই ধরনের হয়ে থাকে:
নন-স্মল সেল (Non-Small Cell): প্রায় ৮৫% রোগীর ক্ষেত্রে এই ধরনের ক্যান্সার দেখা যায়। এটি তুলনামূলকভাবে ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পায়।
স্মল সেল (Small Cell): এটি অত্যন্ত দ্রুত শরীরে ছড়িয়ে পড়ে এবং সাধারণত অতিরিক্ত ধূমপায়ীদের মধ্যেই এই ধরনটি বেশি দেখা যায়।
রোগ নির্ণয় ও আধুনিক চিকিৎসা
ক্যানসার সঠিকভাবে নির্ণয় করতে রোগীর ক্লিনিক্যাল হিস্ট্রি ও শারীরিক পরীক্ষার পাশাপাশি কিছু ল্যাবরেটরি পরীক্ষা অত্যন্ত জরুরি। প্রাথমিকভাবে কফ পরীক্ষা, বুকের এক্স-রে এবং সিটি স্ক্যান করা হয়। রোগ নিশ্চিত করতে এবং ক্যান্সার কোন পর্যায়ে আছে তা জানতে প্যাট স্ক্যান, ব্রঙ্কোস্কোপি, বায়োপসি এবং রক্তের টিউমার মার্কার পরীক্ষা করা হয়।
বর্তমানে ফুসফুসের ক্যান্সার চিকিৎসায় বেশ কিছু আধুনিক পদ্ধতি ব্যবহৃত হচ্ছে:
রেডিওথেরাপি (বিকিরণ থেরাপি): রৈখিক অ্যাক্সিলারেটরের মাধ্যমে উচ্চশক্তিসম্পন্ন রশ্মি দিয়ে ক্যান্সার কোষ ধ্বংস করা হয়।
কেমোথেরাপি: ক্যান্সার প্রতিরোধী ওষুধের মাধ্যমে ক্যান্সার কোষ মেরে ফেলা হয় বা এর বৃদ্ধি রোধ করা হয়।
টার্গেটেড থেরাপি: এটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও আধুনিক চিকিৎসা, যা শুধুমাত্র ক্যান্সার কোষগুলোকে চিহ্নিত করে বেছে বেছে ধ্বংস করে।
বায়োলজিক্যাল বা ইমিউনোথেরাপি: ক্যান্সার প্রতিরোধক টিকার মাধ্যমে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে কাজে লাগিয়ে ক্যান্সার কোষের বিরুদ্ধে লড়াই করা হয়।
মুক্তির উপায়
ফুসফুসের ক্যান্সার একটি অত্যন্ত জটিল, চিকিৎসায় কঠিন ও ব্যয়বহুল রোগ। তবে সচেতন হলে এ রোগ থেকে দূরে থাকা সম্ভব। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ধূমপান বর্জন, বায়ুদূষণ ও ক্ষতিকর রাসায়নিক থেকে দূরে থাকা, পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ এবং নিয়মিত ব্যায়াম করার মাধ্যমে এই রোগের ঝুঁকি অনেকটাই কমিয়ে আনা যায়। কোনো সন্দেহজনক উপসর্গ দেখা দিলে ফেলে না রেখে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়ার পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা।



