Friday, August 07, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

পঞ্চাশ, আমি আসছি! 

এই বয়সে এসে আমার আনন্দের সংজ্ঞাটাও বদলে গেছে

আপডেট : ০৭ আগস্ট ২০২৬, ০৪:৫৭ পিএম

আগামী বছর পঞ্চাশে পা দেবো।

এই কথাটা আজকাল নিজেকেই মাঝেমধ্যে বলি। অবাক হই না, ভয়ও পাই না। বরং মনে হয়, এই বয়স পর্যন্ত পৌঁছাতে পৌঁছাতে জীবন আমাকে যতটা বদলেছে, তার অর্ধেকও কোনো বই বা বিশ্ববিদ্যালয় শেখাতে পারতো না।

ছোটবেলায় মনে হতো, পঞ্চাশ মানেই মানুষ বুড়িয়ে যায়। এখন বুঝি, পঞ্চাশ আসলে বয়সের সংখ্যা নয়। বরং অনেক ভাঙা বিশ্বাস, কিছু অপূর্ণতা, অনেক শিক্ষা আর নিজের সঙ্গে একটু একটু করে পরিচিত হয়ে ওঠার সময়।

সবচেয়ে বড় যে শিক্ষাটা পেয়েছি, সেটা হলো-জীবন কাউকে কোনো প্রতিশ্রুতি দেয় না। ভালো মানুষ হলেই যে ভালো ব্যবহার পাব, সৎ থাকলেই যে সবাই পাশে থাকবে, মন খুলে ভালোবাসলেই যে সেই ভালোবাসা ফিরে আসবে-এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। এই সত্যটা মেনে নিতে আমার অনেক বছর লেগেছে।

একসময় মানুষের কাছে অনেক প্রত্যাশা ছিল। ভাবতাম, আমি যেমন, সবাইও বুঝি তেমন। পরে বুঝেছি, মানুষকে নিজের মাপকাঠিতে বিচার করলে সবচেয়ে বেশি কষ্ট নিজেরই হয়।

পঞ্চাশে এসে একটা জিনিস পরিষ্কার বুঝেছি-আমি কাঁদি বলে আমি দুর্বল নই। কান্না আমার কাছে হার মানা নয়; কান্না মানে আমি এখনও অনুভব করি। মানুষের স্বার্থপরতা, অমানবিকতা, প্রতারণা কিংবা অপ্রত্যাশিত আঘাত আমাকে স্পর্শ করে বলেই চোখে জল আসে। আর সেই অনুভব করার ক্ষমতাটুকুই আমাকে মানুষ করে রাখে।

এই বয়সে এসে আমার আনন্দের সংজ্ঞাটাও বদলে গেছে।

অফিসের লাঞ্চ ব্রেকটা এখন শুধু খাওয়ার সময় নয়, একটু হালকা হওয়ার সময়ও। প্রায়ই হাঁটতে হাঁটতে চলে যাই রবিনের টং দোকানে। এক কাপ আদা চা খাই। কখনো দু-একজন সহকর্মী বা টিমমেটও সঙ্গী হয়। খুনসুটি হয়, গল্প হয়, আবার কাজের কথাও হয়। সব আলোচনা যে অফিসের টেবিলে বসেই করতে হবে, এমন তো কোনো কথা নেই। অনেক সময় পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে কিংবা এক কাপ চায়ের ফাঁকেই কাজের সবচেয়ে ভালো আইডিয়াগুলো বেরিয়ে আসে।

আজকাল বুঝি, নিজের জন্য সময় বের করা মানেই সব সময় দূরে কোথাও চলে যাওয়া নয়। ব্যস্ত একটা দিনের মাঝখানে এমন দশ-পনেরো মিনিটের বিরতিও অনেক কিছু বদলে দিতে পারে। কয়েক পা হাঁটা, পরিচিত মুখগুলোর সঙ্গে দু-একটা হাসি, হাতে ধোঁয়া ওঠা এক কাপ আদা চা-এসব মিলিয়েই দিনের ক্লান্তিটা অনেকটাই হালকা হয়ে যায়।

আর প্রায় প্রতিদিনই রবিনের পোষা বিড়াল ম্যাক্স এসে আমার পাশে বসে পড়ে। ও কোনো কথা বলে না, কোনো দাবি জানায় না। শুধু নির্ভার হয়ে পাশে বসে থাকে। আজকাল মনে হয়, এমন নির্ভেজাল সঙ্গের মূল্য বুঝতেও হয়তো একটু বয়স লাগে।

হয়তো বারবার আঘাত পেয়েছি বলেই সম্পর্ক নিয়ে আমার ভাবনাটা বদলে গেছে। অনেক সময় মানুষ আমাকে খুব সহজলভ্য ভেবে নিয়েছে, কখনো হয়তো একটু বেশিই টেকেন ফর গ্রান্টেড। তাই নিজের পরিসরটা গুটিয়ে এনেছি। মজার ব্যাপার হলো, এতে ক্ষতি হয়নি; বরং লাভই হয়েছে। অল্প কয়েকজন মানুষকে পেয়েছি, যাদের আমি সত্যিই আমার “কাছের মানুষ” বলতে পারি। এখন জানি, অনেক পরিচিত মুখ থাকার চেয়ে, দু-চারজন নির্ভর করার মানুষ থাকাই অনেক বড় প্রাপ্তি।

আগে সবাইকে বোঝানোর চেষ্টা করতাম-কেন কষ্ট পেলাম, কেন চুপ করে গেলাম, কেন দূরে সরে এলাম। এখন আর করি না। যে বুঝতে চায়, সে না বললেও বুঝে যায়। আর যে বুঝতে চায় না, তাকে হাজার ব্যাখ্যাতেও বোঝানো যায় না।

আজ বুঝি, জীবন সব সময় বড় বড় অর্জনের মধ্যে আটকে থাকে না। কখনো এক কাপ আদা চায়ে, কখনো সহকর্মীদের সঙ্গে একটু হাঁটায়, কখনো ম্যাক্সের নির্ভার সঙ্গেই দিনের সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্তগুলো লুকিয়ে থাকে। আর মানুষও সংখ্যায় নয়, সম্পর্কে ধরা দেয়।

একসময় এই বয়সটাকে অনেক দূরের মনে হতো। এখন আর তেমন মনে হয় না। বরং মনে হয়, প্রতিটি বয়সেরই নিজস্ব সৌন্দর্য আছে। পঞ্চাশও তার ব্যতিক্রম হবে না।

হ্যাঁ, জীবনে কষ্ট পেয়েছি। ধাক্কাও কম খাইনি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমি কী হারিয়েছি, তার চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ আমি কী পেয়েছি। পেয়েছি মানুষ চিনতে শেখার চোখ, ছোট ছোট মুহূর্তে আনন্দ খুঁজে নেওয়ার অভ্যাস, আর অল্প কয়েকজন সত্যিকারের কাছের মানুষ।

পঞ্চাশ, আমি আসছি। 

 

 শাহরিন হক
প্রকাশক, সুবর্ণ প্রকাশনী
   

About

Popular Links

x