কোনো প্রশ্নের উত্তর জানতে এখন আর দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয় না। কয়েকটি শব্দ লিখলেই কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) হাজির করছে নানা তথ্য, পরামর্শ ও সম্ভাব্য সমাধান। ফলে ব্যক্তিগত জীবন থেকে শুরু করে স্বাস্থ্য, অর্থ কিংবা ক্যারিয়ার - অনেক ক্ষেত্রেই মানুষ এআইয়ের পরামর্শের ওপর নির্ভর করছেন। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এআইকে অন্ধভাবে বিশ্বাস করা উচিত নয়।
প্রযুক্তিবিষয়ক প্ল্যাটফর্ম ‘ম্যাশেবল’-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, চ্যাটবটের কাছে ব্যক্তিগত তথ্য শেয়ার করার মানে বড় ধরনের ঝুঁকি। আমরা হয়তো ছোট একটি সমস্যা নিয়ে প্রশ্ন শুরু করি, কিন্তু তারপর ধীরে ধীরে ব্যক্তিগত, চিকিৎসা সংক্রান্ত বিষয়ও জিজ্ঞেস করতে শুরু করি। এতে সেই ব্যক্তির তথ্য ফাঁস বা অপব্যবহারের ঝুঁকি বাড়ে।
মূলত এআই চ্যাটবটগুলো আমাদের কথোপকথন থেকে শেখে। এমনকি আমরা যা লিখছি তা কোনো কোম্পানি, ডেভেলপার, এমনকি বিজ্ঞাপনদাতার কাছেও যেতে পারে। এছাড়া যাদের কাছে ডিভাইস বা অ্যাকাউন্টের অ্যাক্সেস আছে, তারাও এই চ্যাট দেখতে পারে।
এছাড়া এআই আমাদের ভুল তথ্য দিতে পারে। হয়তো অর্থসংক্রান্ত বিষয়ে প্রশ্ন করছি, তবে তার উত্তর পাচ্ছি ভুল। এই ভুল উত্তর আমাদের সিদ্ধান্তের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। অনেক সময় এআই তোষামোদি আচরণ করে। মানে আমাদের মন্তব্য বা ধারণার সঙ্গে একমত হতে চায়। এতে আমাদের ভুল ধারণাগুলো আরও শক্ত হয়।
সব ধরনের বিষয়ে এআইয়ের পরামর্শ নেওয়া নিরাপদ বা কার্যকর নয় বলে ধারণা বিশেষজ্ঞদের। মনস্তাত্ত্বিক ও প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, এআই কখনোই মানুষের প্রকৃত বিকল্প বা সত্যিকারের বন্ধু হতে পারে না। বিশেষ করে সৌন্দর্য, আবেগ, আত্মমর্যাদা ও অর্থসংক্রান্ত সংবেদনশীল বিষয়ে এআইয়ের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা বিভ্রান্তিকর হতে পারে।
এ কারণে এআইয়ের কাছে নিচের ৫ ধরনের পরামর্শ না চাওয়াই ভালো -
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এখন দৈনন্দিন জীবনের নানা কাজে মানুষের সহযোগী হয়ে উঠেছে। পড়াশোনা, কাজ, তথ্য খোঁজা, লেখালেখি থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত নানা প্রশ্নের উত্তরও অনেকে এআইয়ের কাছ থেকে নিচ্ছেন। দ্রুত উত্তর পাওয়ার সুবিধার কারণে এর ব্যবহারও দিন দিন বাড়ছে।
তবে এআইয়ের কাছ থেকে সব ধরনের পরামর্শ নেওয়া নিরাপদ নয়। বিশেষ করে যেসব সিদ্ধান্তে ব্যক্তিগত পরিস্থিতি, পেশাদার মূল্যায়ন বা মানুষের অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ, সেসব ক্ষেত্রে এআইয়ের উত্তরের ওপর পুরোপুরি নির্ভর করা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যসংক্রান্ত পরামর্শ
শরীরে কোনো উপসর্গ দেখা দিলে অনেকেই দ্রুত এআইকে প্রশ্ন করে সম্ভাব্য রোগ বা চিকিৎসা সম্পর্কে জানতে চান। এআই সাধারণ তথ্য দিতে পারলেও ব্যক্তির শারীরিক অবস্থা পরীক্ষা করা তার পক্ষে সম্ভব নয়। তাই রোগ নির্ণয়, ওষুধের মাত্রা পরিবর্তন, প্রেসক্রিপশন কিংবা জরুরি চিকিৎসার সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে এআইয়ের পরামর্শের ওপর নির্ভর করা উচিত নয়। এসব বিষয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ।
আর্থিক সিদ্ধান্ত
বিনিয়োগ, ঋণ, সঞ্চয় কিংবা বড় অঙ্কের অর্থ কোথায় ব্যবহার করা হবে - এ ধরনের সিদ্ধান্তে এআইয়ের দেওয়া তথ্য সহায়ক হতে পারে। কিন্তু ব্যক্তির আয়, ঝুঁকি নেওয়ার সক্ষমতা, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও আর্থিক অবস্থার মতো বিষয় বিবেচনা না করে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়। বিশেষ করে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ বা ঋণের মতো বিষয়ে এআইয়ের পরামর্শকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে নেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
আইনি পরামর্শ
আইনসংক্রান্ত বিষয়ে এআই বিভিন্ন তথ্য ও সাধারণ ব্যাখ্যা দিতে পারে। কিন্তু একটি মামলার নির্দিষ্ট পরিস্থিতি, স্থানীয় আইন, নথিপত্র এবং সাম্প্রতিক আইনি পরিবর্তন বিবেচনা করে সঠিক সিদ্ধান্ত দেওয়া সবসময় সম্ভব নাও হতে পারে। তাই আইনি নোটিশ, মামলা, চুক্তি কিংবা গুরুত্বপূর্ণ আইনি সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে এআইয়ের উত্তরকে চূড়ান্ত পরামর্শ হিসেবে নেওয়া উচিত নয়। প্রয়োজন হলে আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া ভালো।
সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত
ব্যক্তিগত সম্পর্কের সমস্যা নিয়ে এআইয়ের সঙ্গে কথা বলা অনেকের কাছে স্বস্তিদায়ক হতে পারে। তবে সম্পর্ক ভেঙে ফেলা, বিয়ে, বিচ্ছেদ বা পরিবারের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে শুধু এআইয়ের পরামর্শের ওপর নির্ভর করা ঠিক নয়।
কারণ সম্পর্কের সঙ্গে জড়িত মানুষের আবেগ, অতীত অভিজ্ঞতা ও পারস্পরিক বোঝাপড়ার মতো বিষয়গুলো এআই পুরোপুরি বুঝতে পারে না। এসব সিদ্ধান্তে নিজের বিচারবোধ এবং প্রয়োজনে বিশ্বস্ত মানুষের পরামর্শকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
ক্যারিয়ার বা চাকরি ছাড়ার সিদ্ধান্ত
চাকরি পরিবর্তন, চাকরি ছেড়ে দেওয়া বা পেশা বদলের মতো সিদ্ধান্ত জীবনে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। এআই বিভিন্ন পেশার সম্ভাবনা বা সুবিধা-অসুবিধা তুলে ধরতে পারে, কিন্তু ব্যক্তির বাস্তব আর্থিক পরিস্থিতি, দক্ষতা, পারিবারিক দায়িত্ব ও ভবিষ্যৎ লক্ষ্য পুরোপুরি বিবেচনা করতে পারে না। তাই এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে নিজের পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করা এবং প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রের অভিজ্ঞ ব্যক্তির পরামর্শ নেওয়া বেশি কার্যকর।
এআইকে পুরোপুরি এড়িয়ে চলার প্রয়োজন নেই। বরং এটিকে তথ্য খোঁজা, বিভিন্ন বিকল্প বোঝা কিংবা কোনো বিষয় নিয়ে প্রাথমিক ধারণা নেওয়ার কাজে ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে স্বাস্থ্য, অর্থ, আইন, সম্পর্ক কিংবা ক্যারিয়ারের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে এআইয়ের দেওয়া তথ্য যাচাই না করে সরাসরি সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়।
নিরাপদ থাকার জন্য করণীয়
পরিচয় গোপন রাখুন: চ্যাটবটকে কোনো প্রশ্ন করার সময় নিজের নাম, ঠিকানা, ফোন নম্বর, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বা জাতীয় পরিচয়পত্রের মতো সুনির্দিষ্ট তথ্য দেওয়া থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকুন।
কাল্পনিক পরিস্থিতি তৈরি করুন: কোনো ব্যক্তিগত বা চিকিৎসা সংক্রান্ত জটিল সমস্যা থাকলে সরাসরি নিজের কথা না বলে কাল্পনিক বা সাধারণ উদাহরণ দিয়ে প্রশ্ন করুন (যেমন: আমার এই রোগ হয়েছে না বলে বলুন কোনো ব্যক্তির এই উপসর্গ থাকলে কী করা উচিত?)।
চ্যাট হিস্ট্রি বন্ধ রাখুন: প্রায় সব চ্যাটবটের সেটিংসে গিয়ে ‘Chat History & Training’ অপশনটি বন্ধ করে রাখা যায়। এতে আপনার তথ্য এআই-এর ট্রেইনিংয়ের কাজে ব্যবহৃত হবে না।
সবশেষে মনে রাখা জরুরি, এআই একটি সহায়ক প্রযুক্তি - চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিকল্প নয়। বিশেষ করে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে এআইয়ের পরামর্শকে একটি তথ্যসূত্র হিসেবে বিবেচনা করাই বেশি নিরাপদ।



