Wednesday, November 04, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

ভালোবেসে মানুষ ফুল দেয় কেন? 

ফুলের সঙ্গে জন্ম-মৃত্যু-ভালোবাসার সম্পর্ক ওতপ্রোতভাবে জড়িত  

আপডেট : ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ০৬:০৭ পিএম

পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর জিনিসগুলোর একটি হচ্ছে ফুল। ফুল পছন্দ করেন না এমন মানুষ ‘সহসাই খুঁজে পাওয়া কঠিন’। পৃথিবীর প্রায় সব সংস্কৃতিতে মানুষ আনন্দ, ভালোবাসা, প্রার্থনা কিংবা বিদায়ের মুহূর্তে ফুল হাতে তুলে নেয়। 

কিন্তু অবাক করা বিষয় হচ্ছে, ফুলের সঙ্গে জন্ম-মৃত্যু-ভালোবাসার সম্পর্ক অতপ্রোতভাবে জড়িত। ফুলের স্থায়ীত্ব অল্পসময়ের হলেও ফুলের গুরুত্ব-ভাষা দীর্ঘস্থায়ী। 

ফুলের একটি নিজস্ব ভাষা রয়েছে। যে ভাষায় কথা বলতে শব্দের প্রয়োজন হয় না, ব্যাকরণ জানার দরকার পড়ে না। ভালোবাসার মতো মহান এক অনুভূতির বিষয়টা শুরু হয় ফুল দিয়ে মনের ভাব প্রকাশ করার মধ্য দিয়ে। 

ভালোবাসার দিনগুলোর বাইরেও জন্মদিন-মৃত্যুদিনে মানুষ ফুলকেই সবসময় বেছে নেয়। যদিও এর পিছনে ঐতিহাসিক ও ইতিহাসবিদদের বিভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য রয়েছে।

ভিয়েতনাম যুদ্ধে বেয়নেটধারী সৈন্যদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে এক তরুণী, যার হাতে রয়েছে ফুল/ম্যাগনাম ফটোস

তবে, শুধু আনন্দ-বেদনার দিনে নয়-এই মহাবিশ্বে যুদ্ধের ময়দানে প্রতিপক্ষের অস্ত্রের সামনে ফুল নিয়ে দাঁড়িয়ে শান্তির বার্তা দেওয়ার ইতিহাসও রয়েছে।  

একটি নবজাতক যখন পৃথিবীতে পা রাখে তখন তাকে বরণ করা হয় ফুল দিয়ে। আবার মানুষ যখন মৃত্যুবরণ করেন তখন তার প্রতি শোক বা শ্রদ্ধা জানানোও হয় ফুল দিয়ে। নাগরিক জীবনেরও নানান ক্ষেত্রে ফুল আমাদের সাথী। 

ভালোবাসার মানুষ ফুল দেয় কেন? 

যুক্তরাষ্ট্রের কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়-এর উদ্ভিদ-উদ্যান-প্রকৃতি সংরক্ষণ বিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘কর্নেল বোটানিক গার্ডেনে’-এ বিষয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদন রয়েছে। সেখানে ‘ভালোবাসায় মানুষ কেন ফুল দেয়’ তার ইতিহাস পর্যালোচনা করেছেন গবেষক সারাহ ফিওরেলো। 

‘কর্নেল বোটানিক গার্ডেন’-এর প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ঊনবিংশ শতাব্দীতে ফ্রান্স, ইংল্যান্ড ও আমেরিকার লেখকরা ফুলের এক বিস্তৃত ‘ভাষা’ তৈরি করেছিলেন, যা ‘ফ্লোরিওগ্রাফি’ নামে পরিচিত। 

ইউরোপ ও আমেরিকায় ভিক্টোরিয়ান যুগে জনসমক্ষে আবেগ প্রকাশ করাকে ভালো চোখে দেখা হতো না; সামাজিক বিধিনিষেধের কারণে কেবল শারীরিক আকর্ষণের বশবর্তী হয়ে কারো কাছে যাওয়াটা ছিল কঠিন। এমন পরিস্থিতিতে মানুষ নিজেদের আবেগ প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে ফুলকে বেছে নেয়। 

গ্রিক ও রোমান পুরাণ, এমনকি মধ্যযুগীয় খ্রিস্টান সময়ে রঙিন ফুলের এবং রঙের ভূমিকা ছিল সবচেয়ে বেশি। এর কারণ হিসেবে তারা উল্লেখ করেছিল- লাল ফুল বা লাল রঙ মানে তীব্র আবেগ; সাদা ফুল বা সাদা রঙ মানে পবিত্রতা আর বেগুনি ফুল বা বেগুনি রঙ মানে হচ্ছে রাজকীয়তা  ক্ষমতার প্রতীক। 

১৮৭৭-এ ল্যাঙ্গুয়েজ অব ফ্লাওয়ার্সের একটি বইয়ের চিত্র/কর্নেল বোটানিক গার্ডেন

জন্মদিনে ফুল উপহার দেওয়ার ইতিহাস 

জন্মদিনে ফুল উপহার দেওয়ার রীতিটি বহু শতাব্দী পুরনো। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জন্মদিবসের তারিখে ফুল উপহার দেওয়া হয়। 

আন্তর্জাতিক ফুল কোম্পানি স্পেনের ‘ফ্লোরা কুইন’-এর প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, প্রাচীন মিশরীয়রা বিশ্বাস করতেন ফুলের জাদুকরী গুণ রয়েছে। তাই জন্মদিনের মতো বিশেষ উপলক্ষগুলোতে তারা দেবতাদের উদ্দেশ্যে ফুল নিবেদন করত। 

এছাড়াও প্রাচীন গ্রিসে মানুষ জন্মদিনের উদযাপনে সুগন্ধি ফুলের মালা দিয়ে নিজেদের সাজাত। এই মালাগুলোকে সৌন্দর্য ও সৌভাগ্যের প্রতীক হিসেবে গণ্য করা হতো। 

ভিক্টোরিয়ান যুগে আবেগ প্রকাশ করাকে সরাসরি অভদ্রতা বলে মনে করা হতো, সেখানে মানুষ জন্মদিনে নিজেদের অনুভূতি প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে ফুল ব্যবহার করা শুরু করে। 

প্রতিটি ফুলের আলাদা অর্থ আছে, যার ফলে ফুলের তোড়া বা সাজানোর মাধ্যমে মানুষ পরোক্ষভাবে নিজেদের মনের কথা পৌঁছে দিতে পারে। এভাবেই জন্মদিনে মানুষকে ফুল উপহার দেওয়ার ধারা-রীতিনীতি যুগ থেকে যুগ ধরে চলমান রয়েছে। 

মৃত্যুদিন বা অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় ফুল ব্যবহারের ইতিহাস

শোকাবহ দিনে পুষ্প দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হাজার বছরের পুরনো এক সমৃদ্ধ ইতিহাস। তবে সব ফুল দিয়ে শোক প্রকাশ করা হয় না! শোক প্রকাশ করার জন্য বিশেষ কিছু ফুল রয়েছে! যার মধ্যে শীর্ষে আছে- চন্দ্রমল্লিকা, সাদা লিলি, গাঁদা, ওইয়ে, গ্লাইওয়ল, কার্নেশন, গোলাপ, অর্কিড ইত্যাদি। এসবের বাইরেও বিভিন্ন দেশে শোক প্রকাশে নানানরকম ফুলের ব্যবহার রয়েছে। 

যুক্তরাজ্যের ‘বার্ড এন্ড ফ্লাওয়ার ওয়ার্কশপ’-এর তথ্যমতে, অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় ফুলের ব্যবহারের প্রাচীনতম প্রমাণ পাওয়া যায় প্রায় ৬২,০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে। ইরাকের একটি গুহায় প্রত্নতাত্ত্বিকরা কিছু নিদর্শন খুঁজে পান, যেখানে দেখা যায় মৃতদেহকে ঘিরে ফুল সাজিয়ে রাখা হয়েছিল-যা ছিল অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ারই একটি অংশ। 

এই প্রাচীন রীতিটি প্রমাণ করে, শেষকৃত্যে ফুল ব্যবহারের প্রথাটি কোনো আধুনিক ধারণা নয়, বরং এর পেছনে রয়েছে ‘গভীর ঐতিহাসিক ভিত্তি’। 

তবে, এর পেছনে এক ‘অলৌকিক’ কারণও খুঁজে পাওয়া যায়। একটা সময় প্রাচীন মিশরে মৃতদেহে ফুল দেওয়াকে ‘পুনর্জন্মের প্রতীক’ হিসেবে বিবেচিত করা হতো। সে সময় পদ্মফুল, প্যাপিরাস দিয়ে তৈরি মালা সরাসরি মমি করা মৃতদেহের ওপর রাখা হতো। 

একইভাবে, প্রাচীন গ্রিক ও রোমান সভ্যতায় শেষকৃত্যে ফুল ব্যবহার করার ইতিহাস জানা গেছে। 

এর বাইরেও বাংলাদেশ, ভারত, চীন, রাশিয়াসহ বিশ্বের বহু দেশে কবরের ওপর ফুল ও ফুলের মালা রাখার প্রচলন রয়েছে। 

   

About

Popular Links

x