Friday, June 05, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

ক্র্যাক প্লাটুনের অপারেশন ডিআইটি বিল্ডিং

একের পর এক চেকপোস্ট এড়িয়ে মাত্র দু'জন গেরিলা সেদিন ধসিয়ে দিয়েছিলেন ক্যান্টনমেন্টের মতো সুরক্ষিত ভবনটি। মহান মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ঢাকা ট্রিবিউনে গবেষক রা'আদ রহমানের লেখা সিরিজের ষষ্ঠ পর্ব এটি 

আপডেট : ১৯ জুলাই ২০২৩, ০৪:১৯ পিএম

২৮ অক্টোবর, ১৯৭১। বৃহস্পতিবার। প্রচণ্ড এক বিস্ফোরণে কেঁপে উঠল সারা ডিআইটি এভিনিউ। ঢাকা ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্ট  বা ডিআইটির (বর্তমানে রাজউক) প্রধান কার্যালয় হিসেবে ১৯৫৬ সালে প্রতিষ্ঠিত এই ভবনটি ছিল ঢাকার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভবনগুলোর একটি।

ফলে এটিকে রীতিমতো ক্যান্টনমেন্টের আদলে সুরক্ষিত এক দুর্গ বানিয়ে রেখেছিল পাকিস্তানি সেনারা। এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল এই ভবনেই ছিল তৎকালীন পাকিস্তান টেলিভিশনের কার্যালয় ও স্টুডিও, যার কোনো ক্ষতি বিশাল ধাক্কা হয়ে আসতে পারত পাকিস্তানি সামরিক সরকারের জন্য।   

ঠিক এই কারণেই বিচ্ছু অর্থাৎ গেরিলাদের দৃষ্টি ছিল এই ভবনটির দিকে। ভবনটিতে প্রবেশের জন্য খোলা থাকত কেবল ডিআইটি এভিনিউর পার্শ্ববর্তী প্রধান দুই ফটকের একটি। সেই ফটকে ছিল কড়া তল্লাশির ব্যবস্থা। একেবারে চিরুনি তল্লাশি করা হতো গেটে। প্রধান ফটক পেরিয়ে খানিক দূরে যেতেই গাড়ি বারান্দার নিচে ভবনের মূল সিঁড়ির মুখে ছিল আরেকটি চেকপোস্ট। সেখান থেকে কয়েক গজ দূরে দোতলায় ওঠার সিঁড়ি ও লিফটের নিচে ছিল আরেকটি চেকপোস্ট। 

এখানেই শেষ নয়। এরপর প্রায় প্রত্যেক তলায় সিঁড়ির মুখেই ছিল একটি করে চেকপোস্ট। এই কড়া পাহারা পেরিয়ে পিঁপড়ে পর্যন্ত যেখানে গলতে পারে না, সেখানেই গেরিলারা প্রচণ্ড বিস্ফোরণ ঘটানোর পরিকল্পনা করেছিলেন মারাত্মক বিস্ফোরক নিয়ে। 

শুনতে কেমন অবিশ্বাস্য শোনাচ্ছে না?

কীভাবে ঘটেছিল এই বিস্ফোরণ? কোন পথে নেওয়া হয়েছিল এক্সপ্লোসিভ? সে এক অসামান্য রোমাঞ্চকর ইতিহাস! বর্ণনায় যাওয়ার আগে ঘটনার কুশীলবদের চিনে নেওয়া যাক। সেক্টর-২ এর ২৮৮ জন মুক্তিযোদ্ধাকে নিয়ে প্রশিক্ষণের একপর্যায়ে ‘‘ঢাকা উত্তর'' নামে একটি দল গঠন করা হয়। এই দলের প্রধান ছিলেন রেজাউল করিম (মানিক)। তার হঠাৎ মৃত্যুর পর তারই সহকারী কমান্ডার নাসিরুদ্দিন ইউসুফ (বাচ্চু) নেতৃত্বভার গ্রহণ করেন। 

ঢাকা উত্তরের এই দল থেকে ১১ জনের একটি ‘‘সিটি টিম'' গঠন করে তাদের শুধু ঢাকা শহরে গেরিলা অপারেশনের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল। এই দলের দুঃসাহসী গেরিলা বিচ্ছুদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন রাইসুল ইসলাম আসাদ, ফেরদৌস নাজমী, ফিরোজ মাহমুদ, মনির, আরিফুল মাওলা, নজিবুল্লাহ (জন), আহসান নাওয়াজ, টুনি, মাহবুব আলী, শাহার, জামিল আহমেদ। 

আজ যে দুঃসাহসী অপারেশনের গল্প বলব সেটি পরিচালনা করেছিলেন নজিবুল্লাহ ও ফেরদৌস। 

দুজনেই ঢাকা উত্তর ও ঢাকা সদর বাহিনীর ঢাকায় বিশেষ গেরিলা অপারেশন পরিচালনার দায়িত্বপ্রাপ্ত গেরিলা। সদ্য কৈশোরে পা রাখা এই দুই বিচ্ছু ছিলেন এসএসসি (তৎকালীন ম্যাট্রিক) পরীক্ষার্থী। একদমই কমবয়সী এই দুই কিশোর বুকের ভেতর যে প্রচণ্ড বারুদকে দুর্মর আগ্নেয়গিরিতে রূপান্তরিত করে ডিআইটিতে হামলার মতো এই অকল্পনীয় ইতিহাস গড়েছিলেন, তা আজও অবিশ্বাস্য!  

এই দুই গেরিলাকে অপারেশনের সুযোগ করে দিতে এবং সর্বাত্মকভাবে সফল করতে মূল ভূমিকা পালন করেছিলেন পর্দার আড়ালে থাকা এক নায়ক। তার নাম মাহবুব আলী, ডিআইটির একজন সাধারণ কর্মচারী। দেখতে সাধারণ মানুষটির না ছিল কোনো প্রশিক্ষণ, না ছিলেন তিনি গেরিলাদের মতো জীবন তুচ্ছ করা যোদ্ধা। কিন্তু বুকের ভেতর অগ্নিস্ফুলিঙ্গ আর বহ্নিশিখা বয়ে চলা মাহবুব রেখেছিলেন অকুতোভয় সাহসের দুর্দান্ত উদাহরণ!

অক্টোবরের শুরু থেকে এই অপারেশনের পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি বাস্তবায়ন শুরু হয়েছিল। 

ডিআইটি ভবন অপারেশনের মূল লক্ষ্য ছিল ট্রান্সমিশন সেন্টার, টাওয়ারের ওপর টেলিভিশনের অ্যানটেনা টাওয়ার ফেলে দেওয়া এবং নিচে রেকর্ড স্টুডিও উড়িয়ে দেওয়া। বিস্ফোরণের জন্য ব্যবহৃত হয়েছিল ৪৮ প্যাকেট পি-কে অর্থাৎ ১২ পাউন্ড প্লাস্টিক এক্সপ্লোসিভ, ছয় ফুট ফিউজ ওয়্যার এবং একটা ডেটোনেটর। প্রাথমিকভাবে মূল পরিকল্পনা ছিল ডিআইটির ঘড়ি টাওয়ারের উপরে থাকা টেলিভিশন ‘‘এন্টেনা টাওয়ার''টি কাটিং চার্জ করে ফেলে দেওয়া। কিন্তু মাঝপথে এসে বাধ্য হয়ে পরিকল্পনা বদলাতে হলো। জনের সঙ্গে প্রথমে আলাপ হলো ডিআইটির মাহবুব আলীর। জিজ্ঞেস করা হলো, সব ধরনের ঝুঁকি বুঝেই তিনি সহায়তা করতে রাজি আছেন কি-না! মাহবুব জানালেন, অবশ্যই।

ডিআইটি ভবনে ঢোকার জন্য মাহবুব আলী, ফেরদৌস ও নজিবুল্লাহকে দুটি এন্ট্রি পাস যোগাড় করে দিলেন। সেই এন্ট্রি পাস দিয়ে তারা ডিআইটি ভবনে ঢুকে সোজা চলে গেলেন অ্যান্টেনা টাওয়ারের কাছে। পাঁচ থেকে সাত মিনিটে রেকি করা হলো। বিস্ফোরণস্থলের পরিমাপ নেওয়া ছাড়াও কাটিং চার্জ বসানোর জায়গা ঠিক করা হলো। 

ঠিক হলো, বিস্ফোরণের জন্য ১৬ পাউন্ড পি-কে, ২০ ফুট কর্ড-এক্স (সাধারণত একই সময়কালে বাড়তি বিস্ফোরণ ঘটানোর জন্য এই বিস্ফোরক কর্ডটি ব্যবহার করা হয়। এটি পোড়ার গতি হলো প্রতি সেকেন্ডে ২১ হাজার মিটার ), একটি ডেটোনেটর এবং ছয় ফুট ফিউজ ওয়্যার। 

মূল সমস্যা হলো, হামলা চালাতে হলে ভেতরে এক্সপ্লোসিভ নিতে হবে। সে কাজটিও মাহবুব আলীই করেছিলেন। সেদিন বিকেলেই রমনা পার্কে মাহবুবের সঙ্গে বিস্তারিত আলাপ হলো। ঠিক হলো, জুতোর মধ্যে পায়ের পাতার নিচে এবং পায়ের নকল ব্যান্ডেজের আড়ালে এগুলো নেওয়া হবে। 

পরদিন থেকেই বিস্ফোরক সরঞ্জাম ঢোকানোর কাজ শুরু হলো। মাহবুব অফিসে যাওয়ার আগে তার দুই পায়ে প্যান্টের নিচে ‘‘ফার্স্ট এইড'' ব্যান্ডেজ বেঁধে দিলেন জন। ব্যান্ডেজের নিচে রাখা হলো প্যাকেট ছাড়ানো চার আউন্স করে মোট আট আউন্স পি-কে। এই প্লাস্টিক এক্সপ্লোসিভ দেখতে ঘরের চালে লাগানোর পুডিংয়ের মতো। দুই পায়ে জুতার ভেতরে সাবধানে গুঁজে দেওয়া হলো আরো ৮ আউন্স পি-কে। মাহবুব এভাবে ১২ দিনে মোট ১২ পাউণ্ড পি-কে বহন করলেন। 

এই বিস্ফোরক দ্রব্যগুলো তিনি রাখতেন সাততলায় তার নিজের কক্ষে। সেখানে রাজ্যের পুরোনো ফাইলপত্রের স্তুপাকৃতির মধ্যে তিনি লুকিয়ে রাখতেন বিস্ফোরক দ্রব্য। 

তার ঠিক ১২ দিনের মাথায় ইপিআইডিসি'র পাশে হাবিব ব্যাংকের সামনে ট্যাক্সিতে রক্ষিত বোমার প্রচণ্ড বিস্ফোরণ ঢাকা নগরীকে প্রবলভাবে নাড়া দিয়ে যায়। এর ফলে ডিআইটি ভবনে চেকপোস্টগুলোতে তল্লাশি আরও বেড়ে গেল। আচমকাই মাহবুবের পক্ষে নতুন করে বিস্ফোরক বহন করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ল। তিনি একটু দমে গেলেন। কিন্তু নজিবুল্লাহ জন আর ফেরদৌস নাজমী কোনভাবেই দমতে দিলেন না তাকে, আবার চাঙ্গা করে তোলা হলো তাদের। 

হাবিব ব্যাংকে বিস্ফোরণের পরেরদিনেই মাহবুবের পায়ে নকল ব্যান্ডেজের নিচে বেঁধে দেওয়া হলো ছয় ফুট ফিউজ ওয়্যার। ফাউন্টেন পেনের মধ্যকার অংশগুলো ফেলে দিয়ে খোলের মধ্যে ভরে দেওয়া হলো একটা ডেটোনেটর।

আচমকাই হাজির এক জটিল সমস্যা। সাততলার সেই রূম গোছানোর নির্দেশ এসেছে, পুরোনো সব ফাইলের জঞ্জাল পরিষ্কার করা হবে। লুকানো জিনিসপত্র ধরা পড়ার সম্ভাবনা খুবই বেশি। এই খবর পেয়েই জন ও ফেরদৌস অতি দ্রুত বিস্ফোরণ ঘটানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন। তাছাড়া ততদিনে রীতিমতো জেদ চেপে গেছে এখন গেরিলাদের। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে যেন বাগে পেয়ে বসেছে তারা, একের পর এক কলজে কাঁপানো হামলায় তাদের কাঁপিয়ে দেওয়ার নেশা গেরিলাদের করে তুলেছে অকুতোভয়! 

অবশেষে এলো সেই দিন। আগে থেকেই মাহবুব জন ও ফেরদৌসের জন্য অডিশনের অজুহাতে দুটো পাস যোগাড় করে রেখেছিলেন। সেদিনই বেলা পৌনে ১টায় ডিআইটি ভবনে প্রবেশ করলেন তারা। ৬ তলা পর্যন্ত চেকপোস্টের বেষ্টনী বেশ ভালোভাবেই উতরে গেলেন। কিন্তু ৬ তলায় এক বেরসিক পাকিস্তানি মিলিটারি পুলিশ তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা শুরু করলো, ‘‘কিস লিয়ে যাতা হ্যায়?'' জন ও ফেরদৌস বললেন, ‘‘হাম দোসরা দফতর সে আয়া হ্যায়।'' বলা হলো বুড়িগঙ্গার পানি কতটুকু বেড়েছে তা পরীক্ষার জন্য এসেছেন তারা। তখনই আরেকজন এসে পড়ায় পুলিশটি তাকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ায় গেরিলাদের বললো, ‘‘ঠিক হ্যায়, তুমলোগ যা সাকতে''। 

ঘুণাক্ষরেও সে টের পেল না, একটু পরে এখানে নরক নেমে আসবে। 

এরপরের ঘটনা খুবই সংক্ষিপ্ত। সাততলার সেই কক্ষে গিয়ে পি-কে একত্র করা হলো দ্রুত। জন সেট চার্জ করলেন। ফিউজ ওয়্যারের ইগনিশন পয়েন্ট ও ডেটোনেটর ফিট করলেন ফেরদৌস। বেলা ১টা ১২ মিনিটে ‘‘ইগনাইট'' অর্থাৎ ফিউজ ওয়্যারে অগ্নিসংযোগ করে দ্রুতপায়ে বেরিয়ে এলেন তারা। 

শুরু হলো এক প্রচণ্ড উত্তেজনাকর টানটান টাইমলিমিট। ফিউজ ওয়্যার পুড়তে সময় লাগবে মাত্র তিন মিনিট। এ সময়ের মধ্যে জন ও ফেরদৌসকে ডিআইটি ভবন প্রাঙ্গন ত্যাগ করতে হবে। কিন্তু কোনোভাবেই দৌড়ানো যাবে না। এগোতে হবে আর দশজনের মতো খুবই সাধারণ ভঙ্গিতে। এখন দৌড়ালে যেমন সবাই সন্দেহ করবে, তেমনি সাধারণ গতিতে হাঁটলেও তারা ভবন থেকে বের হওয়া সম্ভব না, ধরা পড়তে হবে। তাই তারা যেখানে মানুষ দেখলেন সেখানে সাধারণ ভঙ্গিতে এবং যেখানে কেউ নেই সেখানে দ্রুততার সাথে দৌঁড়ের ভঙ্গিতে হাঁটলেন। 

এভাবে সোয়া একটা বাজার মাত্র কয়েক সেকেন্ড আগে তারা স্টেডিয়ামের বারান্দায় বেরিয়ে আসতে সক্ষম হলেন। 

তার কিছুক্ষণ পরেই বুমমমম্‌!


রা'আদ রহমান, গবেষক ও কলাম লেখক



   

About

Popular Links

x