ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে গত বছরের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর দায়িত্ব নেয় অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। ছাত্র-জনতার দাবির মুখে রাষ্ট্র কাঠামো সংস্কারকে অগ্রাধিকার দেয় সরকার। এজন্য ছয়টি কমিশন গঠন করা হয়।
রাষ্ট্র সংস্কারের সুনির্দিষ্ট সুপারিশ নিয়ে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে ইতোমধ্যে প্রতিবেদন দিয়েছে ৪টি সংস্কার কমিশন।
এগুলোর মধ্যে সংবিধান সংস্কার কমিশনের প্রস্তবনায় সংবিধানে জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতাকে বাদ দিয়ে সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক ন্যায়বিচার, বহুত্ববাদ ও গণতন্ত্র অন্তর্ভুক্ত করার সুপারিশ করা হয়েছে। এছাড়া কমিশন দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদ চালু করার জন্য সুপারিশ করেছে। রয়েছে আরও বেশ কিছু সুপারিশ।
এর আগে বিএনপিসহ বেশ কিছু রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকেও দীর্ঘদিন ধরে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদের কথা বলে হচ্ছে। বিএনপি লিখিতভাবে সংবিধান সংস্কার কমিশনকে যে ৬২ দফা প্রস্তাব দিয়েছিল, সেখানেও দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ গঠনের কথা উল্লেখ ছিল। জাতীয় নাগরিক কমিটির প্রস্তাবনায়ও দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদের কথা বলা হয়েছে।
দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদ কী
দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ বা আইনসভা হলো এমন একটি আইনসভা যা দুটি পৃথক কক্ষ নিয়ে গঠিত। যেখানে একটি কক্ষকে “উচ্চকক্ষ”; অন্যটিকে “নিম্নকক্ষ” বলা হয়। এই ধরনের আইনসভায় আইন প্রণয়নে সমান ক্ষমতার ভারসাম্য বা “চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স” নিশ্চিত করা হয়।
এই ধরনের আইনসভায় নিম্নকক্ষের সদস্যরা জনগণের দ্বারা নির্বাচিত হন। তাদের হাতেই থাকে আইন প্রণয়নের ক্ষমতা। তবে আইন কার্যকর করতে উচ্চকক্ষের অনুমোদন প্রয়োজন হয়। অর্থাৎ, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট আইনসভায় জনগণের প্রতিনিধি তথা নিম্নকক্ষের সদস্যরা তাদের নিজেদের স্বার্থে ইচ্ছামতো আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে পারেন না।
আর উচ্চকক্ষের সদস্য নির্বাচনের ক্ষেত্রে বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন ধরনের নিয়ম রয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটের উচ্চকক্ষের সদস্যরা সরাসরি নির্বাচিত হন; যুক্তরাজ্যে “হাউস অব লর্ডস” নীতির মাধ্যমে উচ্চকক্ষের সদস্য নিযুক্ত করা হয়; প্রতিবেশি দেশ ভারতে সংসদের সদস্যদের দ্বারা উচ্চকক্ষের সদস্য নির্বাচিত হয়।
দ্বিকক্ষ সংসদের বিষয়ে যা রয়েছে সংস্কার কমিশনের প্রস্তাবনায়
বাংলাদেশের বর্তমান এক কক্ষের জাতীয় সংসদে মোট আসন ৩৫০টি। যার মধ্যে ৩০০টি আসনে সদস্যরা সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচিত হন। আর ৫০টি আসন থাকে নারীদের জন্য সংরক্ষিত। সাধারণ নির্বাচনে পাওয়া আসনের অনুপাতে এসব আসন বণ্টন করা হয়।
তবে সংবিধান সংস্কার কমিশনের খসড়া প্রস্তাবে দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদের বিষয়ে বলা হয়েছে, নিম্নকক্ষ থাকবে ৪০০টি আসন। আর উচ্চকক্ষে থাকবে ১০৫টি আসন।
নিম্নকক্ষের ৪০০টি আসনে প্রচলিত ব্যবস্থায় অর্থাৎ সরাসরি জনগেণর ভোটে প্রতিনিধি নির্বাচিত হবেন।
উচ্চকক্ষের ১০০টি আসনে নির্বাচন হবে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতিতে। অর্থাৎ, রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনে সারাদেশে মোট যত ভোট পাবে; সেই অনুপাতে তারা উচ্চকক্ষে আসন পাবে। তবে উচ্চকক্ষে প্রার্থী মনোনয়নের ক্ষেত্রে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিতের কথাও বলা হয়েছে সংবিধান সংস্কার কমিটির সুপারিশে।
উচ্চকক্ষের বাকি ৫টি আসন থাকবে রাষ্ট্রপতির হাতে। সমাজের পিছিয়ে পড়া বিভিন্ন অংশের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে এই পাঁচ আসনে সংসদ সদস্য মনোনয়ন দেবেন রাষ্ট্রপতি।



