Monday, June 22, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

এবার নিজের তৈরি করা দল থেকেই সরিয়ে দেওয়া হলো মমতাকে

তৃণমূল প্রতিষ্ঠার পর এই প্রথম দলের সর্বোচ্চ নেতৃত্বে এত বড় এবং ঐতিহাসিক পরিবর্তন ঘটল

আপডেট : ২২ জুন ২০২৬, ০৭:৩৬ পিএম

পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পালাবদলের পর এক সময় যা ছিল কল্পনাতীত, শেষ পর্যন্ত তা-ই বাস্তবে রূপ নিল। যে দলটি প্রায় তিন দশক আগে নিজের হাতে গড়ে তুলেছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, সেই দলেরই শীর্ষ পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হলো তাকে। সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেসের নতুন চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন হাওড়ার বিধায়ক অরূপ রায়।

সোমবার (২২ জুন) কলকাতার নিউটাউনের একটি হোটেলে অনুষ্ঠিত দলের এক বিশেষ ও জরুরি বৈঠকে এই নজিরবিহীন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বৈঠকে তৃণমূলের প্রায় ৬০ জন বিধায়ক এবং কলকাতা পৌরসভার অন্তত ৭০ জন কাউন্সিলর উপস্থিত ছিলেন। এই বিশেষ বৈঠকের নেতৃত্বে ছিলেন বিধানসভার বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়।

তৃণমূল কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার পর এই প্রথম দলের সর্বোচ্চ নেতৃত্বে এত বড় এবং ঐতিহাসিক পরিবর্তন ঘটল। দীর্ঘদিন ধরে দলের প্রধান মুখ ও একমাত্র সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী হিসেবে পরিচিত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরিবর্তে অরূপ রায়কে চেয়ারম্যান নির্বাচিত করায় ভারতের রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে।

বৈঠকের শুরুতেই বিধানসভার বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় দলের তীব্র সাংগঠনিক সংকটের প্রসঙ্গ তোলেন। তিনি জানান, দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী প্রতি তিন বছর পর পর সর্বভারতীয় কার্যনির্বাহী কমিটি গঠন করা বাধ্যতামূলক। কিন্তু সর্বশেষ ২০২২ সালে সেই কমিটি গঠিত হওয়ার পর নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও নতুন কোনো কমিটি তৈরি করা হয়নি। মূলত এই গঠনতান্ত্রিক বাধ্যবাধকতা ও জরুরি পরিস্থিতির কারণেই আজকের এই বৈঠক ডাকা হয়েছে বলে তিনি ব্যাখ্যা দেন।

এরপর দ্রুত গতিতে শুরু হয় দল পুনর্গঠনের প্রক্রিয়া। প্রথমে কার্যনির্বাহী কমিটির নতুন সদস্যদের নাম ঘোষণা করা হয়। পরবর্তীতে উপস্থিত সদস্যদের ধ্বনি ভোটের মাধ্যমে অরূপ রায়কে সর্বভারতীয় চেয়ারম্যান হিসেবে সর্বসম্মত অনুমোদন দেওয়া হয়। একই সঙ্গে অতীতের আর্থিক কার্যক্রম পর্যালোচনার জন্য বিশেষ নিরীক্ষক (অডিটর) নিয়োগের ঘোষণাও দেওয়া হয়।

অরূপ রায় চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার পরপরই দলের নতুন রাজ্য নেতৃত্বের তালিকা ঘোষণা করা হয়। নতুন এই কমিটিতে সহসভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন ফিরহাদ হাকিম, অরূপ বিশ্বাস, রথীন ঘোষ এবং সাবিনা ইয়াসমিন। অন্যদিকে সাধারণ সম্পাদক করা হয়েছে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়, জাভেদ খান ও সন্দীপন সাহাকে। এছাড়া কোষাধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন আখরুজ্জামান আনসারি।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই সিদ্ধান্ত শুধু সাধারণ নেতৃত্ব পরিবর্তন নয়; বরং রাজ্যে ক্ষমতা হারানোর পর তৃণমূল কংগ্রেসের ভেতরে যে তীব্র কোন্দল ও অস্থিরতা চলছিল, এটি তারই প্রকাশ্য রূপ। এর মাধ্যমে তৃণমূলের বিদ্রোহী শিবির স্পষ্ট বার্তা দিল যে, তারা পুরনো নেতৃত্বের ছায়া থেকে বেরিয়ে সম্পূর্ণ নতুন সাংগঠনিক কাঠামো গড়ে তুলতে চায়।

অন্যদিকে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুগতদের কাছে এই ঘটনা নিঃসন্দেহে এক বিশাল ধাক্কা। এক সময় যাঁর একক ক্যারিশমা ও নামে তৃণমূল কংগ্রেসের পরিচয় তৈরি হয়েছিল, রাজ্যের রাজনৈতিক সমীকরণ বদলাতেই তাঁকে নিজের গড়া দলেই নেতৃত্ব হারাতে হলো। পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে এটি এক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও ঐতিহাসিক মোড় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এখন দেখার বিষয়, নতুন এই নেতৃত্বের অধীনে তৃণমূল কংগ্রেস নিজেদের কতটা পুনর্গঠন করতে পারে এবং আগামী দিনে রাজ্যের রাজনীতিতে কী প্রভাব ফেলে।

   

About

Popular Links

x