মানব মহাকাশ অভিযান ‘গগনযান’ উৎক্ষেপণের চূড়ান্ত প্রস্তুতির মাঝেই ভারতের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ইসরো তে দেখা দিয়েছে নজিরবিহীন বিজ্ঞানী-সংকট। একের পর এক শীর্ষ স্তরের বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলীদের চাকরি ছাড়ার ঘটনা ঠেকাতে এবার কড়া আইনি পদক্ষেপ নিয়েছে দেশটির মহাকাশ বিভাগ (ডিপার্টমেন্ট অব স্পেস)।
সম্প্রতি জারি করা এক জরুরি নির্দেশনায় বেঙ্গালুরুর ইউ আর রাও স্যাটেলাইট সেন্টার (ইউআরএসসি) এবং তিরুবনন্তপুরমের বিক্রম সারাভাই স্পেস সেন্টারসহ (ভিএসএসসি) ইসরোর প্রধান প্রধান গবেষণা কেন্দ্রগুলোকে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, গগনযানসহ অন্যান্য জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ মিশনের সঙ্গে যুক্ত গ্রুপ-এ বৈজ্ঞানিক ও কারিগরি কর্মকর্তাদের স্বেচ্ছা অবসর (ভিআরএস) বা পদত্যাগের আবেদন এখন থেকে আর নিয়মিতভাবে গ্রহণ করা যাবে না।
ভারতের শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি জানিয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে ইসরোর গ্রুপ-এ কর্মকর্তাদের, বিশেষ করে গগনযান ও অন্যান্য মেগা প্রকল্পে যুক্ত কর্মীদের পদত্যাগের আবেদন উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। এতে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে কেন্দ্রীয় সরকার ২০২০ সালের একটি বড় প্রশাসনিক নিয়ম বাতিল করেছে। আগের নিয়ম অনুযায়ী, ইসরোর বিভিন্ন কেন্দ্রের পরিচালকরা (ডিরেক্টর) বিজ্ঞানী বা প্রকৌশলী-এসজি পদমর্যাদা পর্যন্ত কর্মকর্তাদের পদত্যাগপত্র অনুমোদনের ক্ষমতা রাখতেন। নতুন নির্দেশনায় সেই ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া হয়েছে। এখন থেকে কোনো বিজ্ঞানী পদত্যাগ করতে চাইলে, সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রের পরিচালকের সুস্পষ্ট সুপারিশসহ সেই আবেদন চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য সরাসরি দিল্লির মহাকাশ বিভাগে পাঠাতে হবে।
নতুন এই কড়া নির্দেশনাটি সতীশ ধাওয়ান স্পেস সেন্টার, লিকুইড প্রপালশন সিস্টেমস সেন্টার এবং স্পেস অ্যাপ্লিকেশনস সেন্টারসহ ইসরোর সবকটি গুরুত্বপূর্ণ উইংয়ে কার্যকর করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে ইসরোর ১০০ জনেরও বেশি প্রথম সারির বিজ্ঞানী সংস্থা ছেড়েছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি লেগেছে গত ফেব্রুয়ারিতে, যখন ভিএসএসসিতে গগনযান অভিযানে ব্যবহৃত হতে যাওয়া এলভিএম-৩ উৎক্ষেপণযানের প্রকল্পপ্রধান তথা জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী ভিক্টর জোসেফ টি পদত্যাগ করেন। তিনি মাত্র ১৩ মাস এই অতি সংবেদনশীল প্রকল্পের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ইসরো ছেড়ে যাওয়া এই অভিজ্ঞ বিজ্ঞানীরা মূলত যোগ দিচ্ছেন ভারতের উদীয়মান বেসরকারি মহাকাশ স্টার্টআপগুলোতে। ২০২০ সালে ভারতের মহাকাশ খাতকে বেসরকারি খাতের জন্য উন্মুক্ত করা এবং ২০২৩ সালে নতুন ‘মহাকাশ নীতি’ চালুর পর এই স্টার্টআপগুলোর ব্যাপক রমরমা শুরু হয়েছে। বর্তমানে ভারতে নিবন্ধিত মহাকাশ স্টার্টআপের সংখ্যা ৪০০ ছাড়িয়েছে, যা প্রায় ৫০ কোটি ডলারের বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করেছে। এর মধ্যে শুধু ২০২৫ সালেই এসেছে ১৫ কোটি ডলার। পিক্সেল, ধ্রুবা স্পেস, স্কাইরুট অ্যারোস্পেস এবং অগ্নিকুল কসমসের মতো শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো ইসরোর বিজ্ঞানীদের কয়েক গুণ বেশি বেতন ও আকর্ষণীয় সুযোগ-সুবিধার টোপ দিয়ে লুফে নিচ্ছে।
বিজ্ঞানীদের দলত্যাগের পাশাপাশি কারিগরি ফ্রন্টেও একাধিক বড় ধাক্কা খেয়েছে ইসরো। সংস্থাটির সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ‘ওয়ার্কহর্স’ হিসেবে পরিচিত পিএসএলভি রকেট এক বছরের মধ্যে টানা দুটি উৎক্ষেপণে ব্যর্থ হয়েছে।
তবে এই জোড়া মিশন বিপর্যয় এবং তীব্র কর্মী-সংকটের মধ্যেও দমে যেতে রাজি নয় ইসরো। সংস্থাটি তাদের আসন্ন মেগা প্রজেক্টগুলোর প্রস্তুতি পুরোদমে চালিয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে নিজস্ব প্রযুক্তিতে মহাকাশে মানুষ পাঠানোর ঐতিহাসিক প্রজেক্ট ‘গগনযান’ (যার সফলতার মাধ্যমে ভারত বিশ্বের চতুর্থ দেশ হিসেবে এই গৌরব অর্জন করবে), চাঁদ থেকে নমুনা সংগ্রহ করে পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনার জন্য ‘চন্দ্রযান-৪’, নিজস্ব মহাকাশ স্টেশন ‘ভারতীয় অন্তরীক্ষ স্টেশন’ (বিএএস) নির্মাণ এবং মঙ্গল গ্রহের উদ্দেশ্যে ‘মঙ্গলযান-২’ মিশনের কাজ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জোর করে ইস্তফা আটকে রাখা সাময়িক সমাধান হলেও, বেসরকারি খাতের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ইসরোর অভ্যন্তরীণ কাজের পরিবেশ উন্নত ও আধুনিকায়ন না করলে এই মেধা পাচার দীর্ঘমেয়াদে আটকানো কঠিন হবে।



