বিশ্বজুড়ে যখন ২০২৬ সাল চলছে, ঠিক তখনই আফ্রিকান দেশ ইথিওপিয়ায় পথচলা শুরু করেছে ২০১৯ সাল। গত ১১ সেপ্টেম্বর ঐতিহ্যবাহী উৎসব ‘এনকুতাতাশ’-এর মাধ্যমে নিজেদের নববর্ষ উদ্যাপন করেছে দেশটি। বিশ্বের প্রচলিত সময়গণনা পদ্ধতি থেকে দেশটির ক্যালেন্ডার প্রায় সাত থেকে আট বছর পিছিয়ে রয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, সময়গণনার ক্ষেত্রে বিশ্বজুড়ে সুপরিচিত গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের পরিবর্তে নিজস্ব ইথিওপীয় ক্যালেন্ডার ব্যবহার করার কারণেই এই পার্থক্য তৈরি হয়েছে। ইথিওপিয়ার এই নিজস্ব সময় গণনার নেপথ্যে রয়েছে দেশটির দীর্ঘ ইতিহাস, প্রাচীন ধর্মীয় ঐতিহ্য ও প্রকৃতির নিয়মনির্ভর জীবনযাপন।
ইথিওপিয়ার প্রাচীন ক্যালেন্ডারে বছর হিসাব করা হয় মোট ১৩টি মাসে। এর মধ্যে প্রথম ১২টি মাসের প্রতিটিই ৩০ দিন করে নির্ধারিত, আর 'পাগুমে' নামের ১৩তম মাসটি গঠিত হয় মাত্র ৫ দিনে (অধিবর্ষে ৬ দিন)।
গ্রেগরিয়ান ও ইথিওপীয় ক্যালেন্ডারের মধ্যে গণনার এই পার্থক্যের মূল উৎস হলো যিশু খ্রিষ্টের জন্মতারিখ নির্ধারণের ভিন্ন ভিন্ন হিসাবপদ্ধতি। ইথিওপীয় ক্যালেন্ডারটি মূলত আলেকজান্দ্রীয় কালপঞ্জির ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত, যা দেশটির প্রাচীন 'অর্থোডক্স তেওয়াহেদো চার্চ' দীর্ঘদিন ধরে সংরক্ষণ করে আসছে। অপরদিকে পশ্চিমা বিশ্বে প্রচলিত আধুনিক ক্যালেন্ডার তৈরি হয়েছে ষষ্ঠ শতকের খ্রিস্টান পণ্ডিত ডায়োনিসিয়াস এক্সিগুয়াসের গণনার ওপর ভিত্তি করে। এই হিসাবের ফারাকের কারণেই বিশ্ববাসী ২০২৬ সালে থাকলেও ইথিওপিয়ায় সদ্য শুরু হলো ২০১৯ সাল।
ইথিওপীয় ভাষায় নববর্ষের নাম ‘এনকুতাতাশ’। বর্ষাকাল শেষ হওয়ার পর দেশটি যখন রৌদ্রোজ্জ্বল আবহাওয়ায় প্রবেশ করে, ঠিক তখনই এই উৎসব উদযাপিত হয়। এ সময় ইথিওপিয়ার পাহাড়ি অঞ্চলে 'আদেই আবেবা' নামের এক প্রকার হলুদ ফুল ফোটে। নববর্ষের আগের রাতে 'চিবো' নামে পরিচিত কাঠের তৈরি মশাল জ্বালিয়ে বর্ষাকে বিদায় জানানো ও নতুন ঋতুকে বরণ করে নেওয়ার প্রতীকী আয়োজন করা হয়।
ইথিওপিয়ার এই ব্যতিক্রমী সময়গণনা দেশটির অবিচল স্বাধীনতারও এক ঐতিহাসিক স্মারক। ঔপনিবেশিক যুগে আফ্রিকার বেশিরভাগ দেশ ইউরোপীয়দের নিয়ন্ত্রণে চলে গেলেও ইথিওপিয়া তার সার্বভৌমত্ব ধরে রেখেছিল। ১৮৯৬ সালের ঐতিহাসিক 'আদওয়া যুদ্ধে' শক্তিশালী ইতালীয় বাহিনীকে পরাজিত করে দেশটি নিজেদের প্রাচীন সংস্কৃতি, ভাষা ও ক্যালেন্ডার অক্ষুণ্ণ রাখতে সক্ষম হয়। পরবর্তীতে ১৯৩৬ থেকে ১৯৪১ সালের মধ্যবর্তী সময়ে ইতালির সাময়িক দখলদারিত্ব থাকলেও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সার্বভৌমত্ব পুনরুদ্ধার করে নিজেদের প্রাচীন পরিচয় বজায় রাখে দেশটি।
সব মিলিয়ে, ইথিওপিয়ার এই ১৩ মাসের ক্যালেন্ডার শুধু সময় হিসাবের একটি কৌশল নয়; এটি তাদের ধর্মীয় ঐতিহ্য, প্রকৃতির প্রতি শ্রদ্ধা এবং সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যের এক অনন্য প্রতীক।



