Sunday, September 20, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বেড়েছে, বেড়েছে আয়-বৈষম্যের প্রশ্ন

কাগজে-কলমে আয় বাড়লেও বাস্তবে সেই বাড়তি আয়ের সুফল অনেকটাই মুছে যাচ্ছে মূল্যস্ফীতির চাপে

আপডেট : ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:০১ পিএম

নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বমুখী দামে যখন সাধারণ মানুষের সংসার চালানোই কঠিন হয়ে উঠছে, তখন সরকারি চাকরিজীবীদের মূল বেতন সর্বোচ্চ ১০০ থেকে ১৪২% পর্যন্ত বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সরকারি কর্মচারীদের বেতন পুনর্বিন্যাসের প্রয়োজনীয়তা থাকলেও প্রশ্ন উঠছে, মূল্যস্ফীতির চাপে থাকা বেসরকারি চাকরিজীবী ও নিম্ন আয়ের কোটি কোটি মানুষের আয় বাড়বে কীভাবে? সরকারি বেতন বৃদ্ধির সুফল যেমন এক শ্রেণির মানুষের জীবনে স্বস্তি আনতে পারে, তেমনি বাজারে এর প্রভাব এবং আয়-বৈষম্যের প্রশ্নটিও সামনে আনছে এই সিদ্ধান্ত।

মূল্যস্ফীতি অর্থনীতির একটি স্বাভাবিক চিত্র। তবে বড় ধরনের মুদ্রাস্ফীতি অর্থনীতির জন্য অভিঘাত হয়ে দাঁড়াতে পারে। পণ্য ও সেবার দাম যখন ধারাবাহিকভাবে বাড়তে থাকে এবং একই পরিমাণ পণ্য কিনতে আগের চেয়ে বেশি অর্থ ব্যয় করতে হয়, তখন মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়। একটি দেশের বাজারে পণ্যের মজুদ এবং মুদ্রার পরিমাণের মধ্যে ভারসাম্য থাকা প্রয়োজন। পণ্যের তুলনায় মুদ্রার সরবরাহ অনেক বেড়ে গেলে মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি হতে পারে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে মানুষের দৈনন্দিন জীবনে। আয় একই হারে না বাড়লে বাড়তি দামের সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে সংসারের বাজেট সংকুচিত করতে হয়।

দেশের সাধারণ মানুষের জন্য এই বাস্তবতা নতুন নয়। প্রায় চার বছর ধরেই মূল্যস্ফীতি মজুরিকে ছাড়িয়ে রয়েছে বলে অর্থনীতিবিদেরা বলছেন। মানুষের আয় বাড়ছে, কিন্তু পণ্য ও সেবার দাম বাড়ছে তার চেয়ে দ্রুত। ফলে কাগজে-কলমে আয় কিছুটা বাড়লেও বাস্তবে সেই বাড়তি আয়ের সুফল অনেকটাই মুছে যাচ্ছে মূল্যস্ফীতির চাপে।

নিত্যপণ্যের লাগামহীন দামের পাশাপাশি কয়েক দফা বিদ্যুৎ ও জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধিও বাড়িয়েছে জীবনযাত্রার ব্যয়। অনেক পরিবারের ক্ষেত্রে মাসের শুরুতে করা বাজেট মাস শেষ হওয়ার আগেই ফুরিয়ে যাচ্ছে। প্রয়োজনীয় অনেক খরচ কমিয়ে, কখনো কোনো একটি খাতের ব্যয় কমিয়ে অন্য খাত সামলাতে হচ্ছে।

পণ্যভেদে দামের এই ঊর্ধ্বগতি মানুষের মাসিক ব্যয়ের হিসাবও বদলে দিচ্ছে। খাবার, বাসাভাড়া, শিক্ষা, চিকিৎসা ও যাতায়াত, প্রতিটি খাতেই বাড়তি ব্যয়ের চাপ তৈরি হচ্ছে। ফলে নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের জন্য জীবনযাত্রার মান ধরে রাখাই ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।

অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শাহাদাত হোসাইন সিদ্দিকী ঢাকা ট্রিবিউনকে জানান, পুরো পে স্কেল একসাথে বাস্তবায়ন করলে মূল্যস্ফীতির উপর যতটা প্রভাব পড়তো তার থেকে এখন খুবই কম চাপ পড়বে। বাস্তবায়নের দিক থেকে সরকার বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়েছে। বর্তমান অর্থবছরে যতটুকু বাড়বে তাতেও মূল্যস্ফীতির চাপ পড়বে কিনা সেটা প্রকৃতপক্ষে নির্ভর করবে অতিরিক্ত টাকা সরকার কোন জায়গা থেকে ব্যবস্থা করবে। অতিরিক্ত অর্থ যদি প্রিন্ট করে ব্যবস্থা করা হয় তাহলে সবচেয়ে বেশি মূল্যস্ফীতি হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে। 

দীর্ঘদিনের মূল্যস্ফীতি শুধু সাধারণ মানুষকেই চাপে ফেলেনি, সরকারি কর্মচারীদের জীবনযাত্রার ব্যয়ও বাড়িয়েছে। পরিবার পরিচালনা, সন্তানের শিক্ষা, চিকিৎসা ও বাসাভাড়ার মতো মৌলিক ব্যয় সামলাতে তাদেরও বাড়তি চাপ মোকাবিলা করতে হচ্ছে।

এই বাস্তবতায় জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সংগতি রেখে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন কাঠামো পুনর্বিন্যাস করাকে যৌক্তিক মনে করছেন অনেকে। দীর্ঘ সময় ধরে মূল্যস্ফীতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে আয় না বাড়ায় বেতন পুনর্নির্ধারণ তাদের আর্থিক স্বস্তি দিতে পারে।

সার্বিক বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. দ্বীন ইসলাম ঢাকা ট্রিবিউনকে জানান, দীর্ঘ ১১ বছর পর সরকারি কর্মচারীদের জন্য ঘোষিত নতুন পে স্কেল বা বেতন কাঠামো অর্থনৈতিক যৌক্তিকতার নিরিখে ইতিবাচক হলেও, দেশের বর্তমান সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে এটি বড় ধরনের মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তবে বেতন বৃদ্ধির মোট হারের চেয়ে এই অতিরিক্ত অর্থ কীভাবে সংস্থান করা হচ্ছে এবং এর সঙ্গে কী ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার বাস্তবায়িত হচ্ছে, তার ওপরই মূল্যস্ফীতির প্রকৃত প্রভাব নির্ভর করবে।

তিনি আরো জানান, সরকারি কর্মচারী ও পেনশনভোগীদের অতিরিক্ত আয়ের একটি বড় অংশ খাদ্য, আবাসন, পরিবহন, শিক্ষা ও বিভিন্ন সেবায় ব্যয় করার প্রবণতা রয়েছে। ২০ লাখের বেশি কর্মচারী এবং বিপুলসংখ্যক পেনশনভোগী এই বেতন কাঠামোর আওতায় আসায় অর্থনীতিতে চাহিদার এই বাড়তি চাপ একেবারে তুচ্ছ নয়। ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেটে একই সময়ে ব্যয় বাড়ানোর পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি প্রায় ৯% থেকে কমিয়ে আনার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছিল। নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের ফলে সেই লক্ষ্য অর্জন কঠিন হয়ে পড়বে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, শুধু মূল বেতন ১০০–১৪২% বাড়ছে বলেই মূল্যস্ফীতিও একই অনুপাতে বাড়বে, এমন পূর্বাভাস দেওয়া ঠিক হবে না। কারণ বেতন বৃদ্ধি ধাপে ধাপে কার্যকর হবে; সরকারি কর্মচারীরা মোট জনসংখ্যার একটি অংশ; মূল বেতন মোট পারিশ্রমিকের একটি অংশমাত্র। পাশাপাশি বাড়তি চাহিদার একটি অংশ আমদানি এবং দেশীয় উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে পূরণ হতে পারে। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বেতন বৃদ্ধির অর্থায়ন কীভাবে করা হচ্ছে। যদি বাড়তি বেতন ব্যয় উচ্চতর কর রাজস্ব, অপচয়মূলক ভর্তুকি কমানো অথবা কম অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত ব্যয় হ্রাসের মাধ্যমে অর্থায়ন করা হয়, তাহলে মূল্যস্ফীতির প্রভাব নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. সৈয়দ নঈমুল ওয়াদুদ ঢাকা ট্রিবিউনকে জানান, বেতন স্কেল একটি নীতিগত সিদ্ধান্ত হিসেবে সতর্কতার সঙ্গে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। তাই আমি মনে করি না, এর ফলে হঠাৎ করে উচ্চ মূল্যস্ফীতি দেখা দেবে। তবে কিছুটা মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি হবে বলে আশংকা করা হচ্ছে।

বেসরকারি চাকুরীজীবিদের উপরে কী প্রভাব পড়বে, এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি জানা, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বাড়াতে কিছুটা চাপের মধ্যে পড়বে। তবে বিষয়টি সহজে সমাধান করা নাও যেতে পারে। কারণ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে এর ফলাফল কী হয়, তা পর্যবেক্ষণ করতে হবে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদি অতিরিক্ত ব্যাংকঋণের মাধ্যমে এই ব্যয় মেটানো হয়, তাহলে ঝুঁকি অনেক বেশি। ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেটেই সরকার ব্যাংক থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক যদি শেষ পর্যন্ত আর্থিক সম্প্রসারণের মাধ্যমে সেই ঋণকে সহায়তা করে, তাহলে বেতন বৃদ্ধির একটি অংশ প্রচলিত অর্থে রাজস্ব ও মুদ্রানীতিনির্ভর মূল্যস্ফীতিতে রূপ নিতে পারে।

ড. মোহাম্মদ শাহাদাত হোসাইন সিদ্দিকী জানান, অর্থনীতিতে ডেমনস্ট্রেশন ইফেক্ট বলতে একটি অর্থনৈতিক ব্যাখ্যা রয়েছে। অর্থাৎ সরকারি কর্মচারীদের যখন বেতন বৃদ্ধি পায় তখন বেসরকারি-কর্মচারীদের মধ্যে বেতন বাড়ানোর একটা তাগিদ তৈরি হয়। সেক্ষেত্রে ব্যক্তিখাতে বেতন বৃদ্ধি পেলে দেশের সামগ্রিক চাহিদা অনেক বেড়ে যাবে আবার বিপরীত দিকে, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পাবে মূল্য বৃদ্ধির প্রভাবে। তখন সামগ্রিক চাহিদা যতোটুকু বৃদ্ধি পাবে ততটুকু জিডিপির প্রবৃদ্ধি বাড়বে না। তখন মূল্যস্ফীতির আশঙ্কাটা বাড়বে। যাকে আমরা ওয়েজ -স্পাইরাল দিয়ে ব্যাখ্যা করতে পারি। নিম্নবিত্ত মানুষদের জীবিকা নির্বাহ অনেকটাই চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। দারিদ্র নিরসনে বাংলাদেশের যে সফলতা ছিল তা কিছুটা মুখ থুবড়ে পড়তে পারে। নতুন দরিদ্র মানুষ তৈরি হওয়ার একটা সম্ভাবনাও রয়েছে।

সরকার ধাপে ধাপে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন করবে। ফলে একসঙ্গে বড় অঙ্কের অতিরিক্ত অর্থ বাজারে প্রবেশ না করায় মূল্যস্ফীতির ওপর এর প্রভাব খুব বেশি হবে না বলে মনে করা হচ্ছে। একই কারণে বেসরকারি খাতও তাৎক্ষণিকভাবে বেতন বাড়ানোর বড় ধরনের চাপে পড়বে না।

তবে শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের স্বস্তি নির্ভর করবে বাজারে পণ্যের দাম কতটা নিয়ন্ত্রণে রাখা যায় এবং মানুষের আয় কতটা দ্রুত জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাড়ে তার ওপর। বেতন বাড়ার সুখবর তখনই সবার জন্য স্বস্তির হবে, যখন বাজারের বাড়তি দাম সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে থাকবে।

 

   

About

Popular Links

x