Friday, October 16, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

ইরানে ‘মাদার অব অল বোম্বস’ নিক্ষেপ? কতোটা ভয়ংকর এই অস্ত্র?

এমওএবি নামে পরিচিত বোমাটি যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভান্ডারে থাকা সবচেয়ে বড় অপারমাণবিক বোমা

আপডেট : ১৬ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:৫৮ পিএম

ইরানে নতুন করে সামরিক অভিযান শুরু হলে দেশটির জ্বালানি অবকাঠামো ও পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় অপারমাণবিক বোমা ‘মাদার অব অল বোম্বস’ (এমওএবি) ব্যবহারের বিষয়টি বিবেচনায় রাখা হচ্ছে। 

বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে সিএনএন জানিয়েছে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নতুন করে সামরিক অভিযান শুরুর নির্দেশ দিলে প্রায় ১০ টন ওজনের এই বোমা ব্যবহারের সম্ভাবনা রয়েছে।

জিবিইউ-৪৩/বি ম্যাসিভ অর্ডন্যান্স এয়ার ব্লাস্ট (এমওএবি) নামে পরিচিত বোমাটি যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভান্ডারে থাকা সবচেয়ে বড় অপারমাণবিক বোমা। ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাতে প্রথমবারের মতো এটি ব্যবহার করা হলে যুদ্ধের তীব্রতা আরও বাড়তে পারে বলে মনে করছেন পরিকল্পনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তবে সামরিক পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত একাধিক সূত্র সিএনএন ও আল জাজিরাকে জানিয়েছে, এই বোমা ব্যবহার করলেই যুদ্ধের গতিপথ বদলে যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।

ব্রাসেলসভিত্তিক সামরিক বিশেষজ্ঞ এলিয়াহ ম্যাগনিয়ার আল জাজিরাকে বলেন, এমওএবি ব্যবহার করেও ইরানের গভীর ভূগর্ভে অবস্থিত পারমাণবিক স্থাপনাগুলো ধ্বংস করা সম্ভব হবে কি না, তা অনিশ্চিত। তার মতে, শেষ পর্যন্ত এ ধরনের হামলা সামরিক সাফল্যের চেয়ে ‘রাজনৈতিক নাটকীয়তা’ হিসেবেই বেশি গুরুত্ব পেতে পারে।
এমওএবি কী?

জিবিইউ-৪৩/বি ম্যাসিভ অর্ডন্যান্স এয়ার ব্লাস্ট বা এমওএবি যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি বিশাল আকৃতির একটি অপারমাণবিক বোমা। এতে প্রায় ৮ হাজার ৫০০ কেজি বা ১৮ হাজার পাউন্ড উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন বিস্ফোরক রয়েছে। বোমাটির মোট ওজন প্রায় ৯ হাজার ৮০০ কেজি, অর্থাৎ ২১ হাজার ৬০৫ পাউন্ড বা প্রায় ১০ টন। ওজনের দিক থেকে এটি চারটি সেলুন গাড়ির সমান। এর দৈর্ঘ্য ৯ মিটারের কিছু বেশি, যা একটি ছোট প্রমোদতরির দৈর্ঘ্যের কাছাকাছি।

সাধারণত লকহিড সি-১৩০ হারকিউলিস সামরিক পরিবহন বিমান থেকে বোমাটি নিক্ষেপ করা হয়। আকারে বড় হওয়ায় এটি স্টেলথ বোমারু বিমানে বহন করা সম্ভব নয়। ২০০২ থেকে ২০০৩ সালের মধ্যে প্রথম এই বোমা তৈরি করা হয়। এ পর্যন্ত এর ১২টি বিস্ফোরণ পরীক্ষা চালানো হয়েছে।

এমওএবি নামটির সঙ্গে ১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধের একটি ঐতিহাসিক মন্তব্যের যোগসূত্র রয়েছে। সে সময় ইরাকের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেন ‘সব যুদ্ধের জননী’ বা ‘মাদার অব অল ব্যাটলস’ কথাটি ব্যবহার করেছিলেন।

এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র মাত্র একবার এমওএবি ব্যবহার করেছে। ২০১৭ সালে আফগানিস্তানে ইসলামিক স্টেট খোরাসান প্রভিন্সের (আইএসকেপি) একটি গুহা ও সুড়ঙ্গ কমপ্লেক্স লক্ষ্য করে বোমাটি নিক্ষেপ করা হয়।

আফগান কর্তৃপক্ষের দাবি, ওই হামলায় আইএসকেপির ৯৪ যোদ্ধা নিহত হন এবং কোনো বেসামরিক মানুষ হতাহত হননি। তবে স্থানীয় পর্যায়ে বেসামরিক মানুষের হতাহতের বিষয়ে কিছু অসমর্থিত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল। হামলায় বহু বাড়িঘরও ধ্বংস হয়।

ভূমি থেকে কয়েক ফুট ওপরে বিস্ফোরণ ঘটানোর জন্য এমওএবি তৈরি করা হয়েছে। বিস্ফোরণের ফলে প্রচণ্ড চাপ ও তাপের তরঙ্গ সৃষ্টি হয়, যা ভবন, গুহার প্রবেশপথ এবং অন্যান্য শক্ত কাঠামো ধ্বংস করতে পারে।

সামরিক বিশেষজ্ঞ এলিয়াহ ম্যাগনিয়ার বলেন, নির্দিষ্ট একটি এলাকাজুড়ে অত্যন্ত শক্তিশালী বিস্ফোরণ ঘটানোই এই বোমার মূল উদ্দেশ্য। মার্কিন বিমানবাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, পরীক্ষার সময় এর বিস্ফোরণে তৈরি মাশরুম আকৃতির মেঘ ২০ মাইল দূর থেকেও দেখা গিয়েছিল।

আল জাজিরাকে দেওয়া বক্তব্যে সামরিক বিশেষজ্ঞ কর্নেল নিদাল আবু জায়েদ বলেন, বিস্ফোরণ ঘটাতে এমওএবির কোনো কিছুর সঙ্গে সরাসরি আঘাত করার প্রয়োজন হয় না। এর শক্তিশালী বিস্ফোরণে ভূমির ওপরে প্রায় ১ কিলোমিটার বা ০.৬ মাইল ব্যাসার্ধের মধ্যে থাকা সবকিছু ধ্বংস হয়ে যেতে পারে।

আবু জায়েদের মতে, ইরানে এই বোমা ব্যবহার করা হলে যুক্তরাষ্ট্র ভূমির ওপর থাকা ইরানি স্থলবাহিনীর অবস্থানগুলো ধ্বংস করার পাশাপাশি ভূগর্ভস্থ স্থাপনাগুলোতেও আঘাত হানার চেষ্টা করতে পারে। এসব সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে রয়েছে পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন, যেটিতে হামলার হুমকি ট্রাম্প আগেই দিয়েছেন।

মঙ্গলবার আইআরজিসির নিরাপত্তা উপদেষ্টা মোহাম্মদ রেজা নাঘদি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র স্থল অভিযান চালালে ইরান মার্কিন সেনাদের আটক করতে পারে। তবে ইরানের পাহাড়ি ভূপ্রকৃতির কারণে দেশটিতে স্থল অভিযান চালানোর বিষয়ে ট্রাম্পের আগের হুমকিগুলোকে সামরিক বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরেই অবাস্তব বলে বিবেচনা করছেন।
নাঘদির ভাষ্য, যুক্তরাষ্ট্র স্থল হামলা চালালে বিপুলসংখ্যক মার্কিন সেনা আটক হবেন এবং শেষ পর্যন্ত ওয়াশিংটনকে সাদা পতাকা ওড়াতে বাধ্য হতে হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন করে যুদ্ধ শুরু হওয়ার আশঙ্কায় ইরান অস্ত্রের মজুত বাড়াচ্ছে, গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক ও প্রতিরক্ষা স্থাপনার নিরাপত্তা জোরদার করছে এবং নিজেদের সমর্থকদের সংগঠিত করছে।

টেলিভিশনে দেওয়া বক্তব্যে ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের প্রধান মোহসেন রেজায়ি হুঁশিয়ারি দেন, যুক্তরাষ্ট্র আবার হামলা শুরু করলে সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ আঞ্চলিক দেশগুলোর ডিজিটাল অবকাঠামোতে আঘাত হানতে পারে তেহরান। সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে রয়েছে যোগাযোগের কেবল, ডেটা সেন্টার ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-সংশ্লিষ্ট স্থাপনা।

   

About

Popular Links

x