Friday, June 05, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

শীতেও উষ্ণ কাশ্মির, তুষারপাতের জন্য প্রার্থনা

ভরা শীতের কাশ্মিরে তুষারপাত হচ্ছে না। স্বাভাবিকভাবে শীতে সেখানে ৪০ দিন ব্যাপক তুষারপাত হয়। পর্বত ও হিমবাহ এলাকা বরফে ঢেকে যায়। কিন্তু এবারের চিত্র ভিন্ন

আপডেট : ২১ জানুয়ারি ২০২৪, ০৫:০৯ পিএম

এমন শীত কাশ্মিরের বাসিন্দারা আগে কখনও দেখেননি। ভরা শীতেও তুষারপাত নেই। পাহাড়গুলো সাদা বরফে ঢেকে থাকার কথা, কিন্তু এবার সেগুলো বাদামি রঙের ঘাসে আবৃত। তুষারপাতের জন্য কাশ্মিরে প্রার্থনাও করেছেন বাসিন্দারা।

ভূ-স্বর্গ খ্যাত কাশ্মিরের চিরায়ত সৌন্দর্য পাহাড় ও তুষার। সৌন্দর্য উপভোগ করতে প্রতিবছর হাজারো পর্যটকের সমাগম হয়। কিন্তু এবারের ভরা শীতের সময়ে মরুময় চিত্রের কারণে ওই এলাকার পর্যটন খাত হুমকির মুখে পড়েছে।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি জানিয়েছে, গত বছরের জানুয়ারিতে কাশ্মিরে এক লাখ পর্যটকের সমাগম হয়েছিল। কিন্তু এবার সেই সংখ্যা অর্ধেকেরও বেশি কমেছে।

২১ ডিসেম্বর থেকে ২৯ জানুয়ারি পর্যন্ত এই ৪০ দিন এ অঞ্চলে ভরা শীতের সময়। ভরা শীতের সময় এ অঞ্চলে সাধারণত তীব্র তুষারপাত হয়। এসময় পাহাড়-পর্বত ও হিমবাহ ধবধবে সাদা তুষারে ঢেকে যায়। এই বরফ সারা বছরের পানি সরবরাহ নিশ্চিত করে।

বিশেষজ্ঞদের অনেকে বলছেন, গত কয়েক বছর ধরে এ অঞ্চলে তুষারপাত কমে আসছে। এর কারণ জলবায়ু পরিবর্তন।

ভূতাত্ত্বিক শাকিল আহমদ রমশু বলেন, “১৯৯০-এর দশকের আগে আমরা তীব্র তুষারপাত দেখতাম। ৩ ফুট পুরু হয়ে তুষার পড়ত। বসন্তের আগে সেই বরফ গলত। কিন্তু এখন আমরা উষ্ণ শীতকাল দেখছি।”

তিনি বলেন, “অন্যান্য রাজ্যের তুলনায় আমাদের মাথাপিছু গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের পরিমাণ অনেক কম। কাশ্মিরের মানুষ একেবারেই সাদামাটা, বাহুল্যবর্জিত জীবন যাপন করে। আমরা বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের ভুক্তভোগী।”

শাকিল ও তার দলের এক গবেষণা বলছে, চলতি শতাব্দীর শেষদিকে লাদাখসহ এ অঞ্চলের তাপমাত্রা আরও বাড়তে পারে।

এদিকে, স্থানীয় অধিবাসীরা চলতি শীতে তুষারপাতের জন্য একত্র হয়ে প্রার্থনাও করছেন।

আবহাওয়া বিভাগ অবশ্য ২৪ জানুয়ারির আগে ভারী তুষারপাতের পূর্বাভাস দেয়নি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তুষারপাত না হওয়ার কারণে পর্যটন খাত ছাড়াও জলবিদ্যুৎ ও মাছ উৎপাদনের পাশাপাশি চাষাবাদও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। জম্মু-কাশ্মিরের পাশের এলাকা আরেক জনপ্রিয় পর্যটন এলাকা লাদাখ। সেখানেও চলতি শীতে তুষার পড়েনি।

পরিবেশবিদ সোনম ওয়াংচুক বলেন, “এখানকার কৃষিকাজ হিমবাহের ওপর নির্ভরশীল। হিমবাহ দ্রুতগতিতে গলছে। ভরা মৌসুমেও কোনো তুষারপাত না হওয়ার অর্থ হচ্ছে বসন্তের সময় পানি বড় সমস্যা হবে।”

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জম্মু ও কাশ্মিরের জিডিপিতে ৭% অবদান পর্য‍টন শিল্পের। ফলে তুষারহীন শীত মৌসুম এ অঞ্চলের অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। তুষারপাত না হওয়ায় ভূগর্ভস্থ পানির মজুত পূরণ না হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, এমনটি হলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে কৃষিখাত; ব্যাহত হবে পানি সরবরাহ।

পরিবেশবিদরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তন এই অঞ্চলে প্রভাব ফেলছে। চরম আবহাওয়ার সঙ্গে শীত ও গ্রীষ্মের ব্যাপ্তি বাড়ছে। গত ডিসেম্বরে ৭৯% বৃষ্টিপাত ঘাটতি রেকর্ড করেছে জম্মু-কাশ্মিরের আবহাওয়া বিভাগ। জানুয়ারিতে এই ঘাটতি ১০০%।

১৭ বছর ধরে ভারত-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মিরের ছবির মতো শহর গুলমার্গে একটি হোটেল চালাচ্ছেন মনজুর আহমদ। এই সতেরো বছরে তুষারপাত ছাড়া কোনো শীত কাটতে দেখেননি তিনি। কিন্তু এ বছর অবস্থা একেবারেই অন্যরকম। এ অঞ্চলের তুষারাবৃত পর্বতগুলো এবার বেখাপ্পা রকমের বাদামি ও ন্যাড়া।

এই ঘটনাকে “নজিরবিহীন” বলছেন তিনি। ৫০ বছর বয়সী মনজুর জানান, “পর্যটকরা তার হোটেলে রিজার্ভেশন দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছেন।”

এ উপত্যকার আবহাওয়াও উষ্ণ হয়ে উঠেছে। চলতি শীতে কাশ্মিরের অধিকাংশ স্টেশনে তাপমাত্রা ৬ থেকে ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধির রেকর্ড করা হয়েছে।

গুলমার্গ হোটেলিয়ার্স ক্লাবের প্রেসিডেন্ট আকিব ছায়া বলেন, “৪০%-এর বেশি হোটেল রিজার্ভেশন বাতিল করে দেওয়া হয়েছে, নতুন বুকিংও বন্ধ আছে।”

মহারাষ্ট্র থেকে সপরিবারের প্রথমবারের মতো কাশ্মিরে বেড়াতে আসা রাজকুমার হতাশ হয়েছেন। তিনি বলেন, “আমরা এখানে এসেছিলাম তুষারপাত দেখতে আর ক্যাবল কারে চড়তে…কিন্তু বরফহীন গুলমার্গ দেখে আমরা হতাশ।”

পর্যটক কমে যাওয়ার ধাক্কা লেগেছে স্থানীয় ব্যবসায়। শীতের সময় টিকে থাকতে স্থানীয় ব্যবসার বড় একটা পর্যটনের ওপর নির্ভরশীল।

গুলমার্গের টাট্টু ঘোড়া সমিতির প্রধান তারিক আহমদ লোনি বলেন, “গত তিন মাসের তাদের তেমন আয়-রোজগার হয়নি। টাট্টু ঘোড়ায় চড়ে এ অঞ্চলের চড়াই-উৎরাইয়ে ঘুরে বেড়ানো পর্যটকদের মাঝে বেশ জনপ্রিয়।”

তারিক বলেন, “আমাদের জীবিকা নির্ভর করে তুষারের ওপর। তুষারবিহীন মৌসুম আমাদের সবার পরিবারে দুঃখ-কষ্ট ডেকে আনবে।”

গুলমার্গের স্কি অ্যাসোসিয়েশনের প্রধান শওকত আহমদ রাথার বলেন, “গত ২৭ বছর ধরে আমি স্কি ইনস্ট্রাক্টর হিসেবে কাজ করছে। আমি তো অন্য পেশায় যেতেও পারব না।”

   

About

Popular Links

x