যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বিভাগের সদর দপ্তর পেন্টাগনের মূল্যায়ন বলছে, ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্রের চালানো বিমান হামলায় দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস হয়নি। এই হামলা দেশটির পারমাণবিক কার্যক্রম শুধুমাত্র কয়েক মাস পিছিয়ে দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম সিএনএন এক প্রতিবেদনে এ খবর জানিয়েছে।
ইরানের পরমাণু কর্মসূচি বন্ধ এবং পারমাণবিক স্থাপনাগুলো ধ্বংস করতে গত সপ্তাহে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। তবে হামলার প্রাথমিক মূল্যায়নে জানা গেছে, হামলা চালানো তিনটি স্থাপনার মধ্যে দুটিই ধ্বংস হয়নি। পেন্টাগনের গোয়েন্দা শাখা হিসেবে কাজ করা প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থা (ডিআইএ) এই প্রতিবেদন তৈরি করেছে।
স্থানীয় সময় মঙ্গলবার (২৪ জুন) গোয়েন্দা ইউনিটের ওই প্রাথমিক তদন্তের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দুই সদস্যরা সিবিএস নিউজকে এ তথ্য জানিয়েছে।
এর আগে, গত ২১ জুন অত্যাধুনিক বি-২ স্টিলথ বোমারু বিমান ব্যবহার করে ইরানের পারমাণবিক কেন্দ্রে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। তখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট এই হামলাকে অত্যন্ত সফল হামলা বলেও জানিয়েছিলেন। কিন্তু মাত্র তিনদিনের মাথায় পেন্টাগন নতুন তথ্য জানাচ্ছে।
তবে হোয়াইট হাউস গোয়েন্দাদের এই মূল্যায়নকে সম্পূর্ণ ভুল বলে আখ্যা দিয়ে বলেছে, এটি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে হেয় করার চেষ্টা।
পেন্টাগনের এই তথ্যের পর ডোনাল্ড ট্রাম্প তার ট্রুথ সোশ্যালে একটি পোস্ট দিয়ে দাবি করেছেন, সিএনএন ও নিউইয়র্ক টাইমসের ওই প্রতিবেদন সত্যি নয়। তারা সামরিক ইতিহাসের সবচেয়ে সফল একটি অভিযানকে হেয় করার চেষ্টা করছে।
এছাড়া, সোমবার (২৩ জুন) আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রোসিও বলেন একই কথা। তার মতে, ইরানের ৬০% মাত্রায় সমৃদ্ধ ৪০০ কেজি ইউরেনিয়ামের মজুদ কোথায় আছে, তা এখন আর তারা নির্ধারণ করতে পারছেন না।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় নির্দেশনায় (সেন্ট্রাল কমান্ডে) পরিচালিত যুদ্ধপরবর্তী ক্ষয়ক্ষতির ওপর ভিত্তি করে এই প্রাথমিক মূল্যায়ন প্রতিবেদন তৈরি করেছে ডিআইএ। মূলত মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কার্যক্রম তদারকি করে থাকে এই সংস্থাটি।
পেন্টাগন জানিয়েছে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে করা ওই হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত পারমাণু কর্মসূচির প্রধান উপাদান, যেমন সেন্ট্রিফিউজগুলো কয়েক মাসের মধ্যেই পুনরায় চালু করা সম্ভব।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরিতে ব্যবহৃত হতে পারে—এমন উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের বেশির ভাগ অংশ হামলার আগেই সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। সেগুলো ইরানের গোপন অন্যান্য পারমাণবিক স্থাপনায় স্থানান্তর করা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এতে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি পুরোপুরি ধ্বংস করা হয়েছে বলে ট্রাম্প যে দাবি করেছিলেন, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
হামলার পর ২১ জুন রাতে ট্রাম্প জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে বলেন, “নাতাঞ্জ, ফোরদো ও ইসফাহানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে।”
তিনি বলেন, “এই হামলা ছিল এক অসাধারণ সামরিক সাফল্য। ইরানের প্রধান পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ স্থাপনাগুলো সম্পূর্ণ ও চূড়ান্তভাবে ধ্বংস করা হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের দখলদার ইরান এখন শান্তির পথ বেছে নিতে বাধ্য।”
যদিও ডিআইএয়ের প্রতিবেদনটি ছিল একটি প্রাথমিক মূল্যায়ন, তবে সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বলেন, “যদি প্রাথমিক পর্যায়ে থাকা গোয়েন্দা তথ্য কয়েক দিনের মধ্যেই ফোরদো ধ্বংস হয়নি বলে নিশ্চিত করে, তাহলে পরবর্তী মূল্যায়নে আরও কম ক্ষয়ক্ষতির কথা উঠে আসতে পারে।”
এর আগে, গত বুধবার (১৮ জুন) দ্য গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের শুরুতে পেন্টাগনের শীর্ষ রাজনৈতিক কর্মকর্তা-কর্মকর্তাদের জানানো হয়েছিল, ফোরদোয় ব্যবহারের জন্য তৈরি ৩০ হাজার পাউন্ড ওজনের “বাংকার বাস্টার” জিবিইউ-৫৭ বোমাগুলো ওই স্থাপনাটি পুরোপুরি ধ্বংস করতে পারবে না। পেন্টাগনের ডিফেন্স থ্রেট রিডাকশন এজেন্সি জানায়, জিবিইউ-৫৭ বোমা ভূমির পর্যাপ্ত গভীরে প্রবেশ করতে পারে না। কেবল একটি কৌশলগত পারমাণবিক অস্ত্রই ফোরদোকে পুরোপুরি ধ্বংস করতে সক্ষম।
প্রসঙ্গত, ইরানের সবচেয়ে সুরক্ষিত পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর একটি হিসেবে পরিচিত ফোরদোর ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র। এটি জাগরোস পর্বতমালার নিচে অবস্থিত। এই কেন্দ্রটি প্রায় ৪৫ থেকে ৯০ মিটার (১৪৫ থেকে ৩০০ ফুট) পাথরের নিচে নির্মিত, যার বেশিরভাগই লাইমস্টোন ও ডোলোমাইট।



ইরানের তিন পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার মাধ্যমে যুদ্ধে যোগ দিল যুক্তরাষ্ট্র