অধিকাংশ মানুষ মোবাইল ফোন বা ঘড়ির অ্যালার্মের ওপর নির্ভর করেন। ব্যস্ত জীবনযাপন, অনিয়মিত ঘুম এবং রাত জাগার অভ্যাসের কারণে অনেকের স্বাভাবিকভাবে ঘুম ভাঙার অভ্যাস নষ্ট হয়ে যায়। তবে সঠিক ঘুমের রুটিন ও নিয়মিত জীবনযাপনের মাধ্যমে শরীরের নিজস্ব জৈবঘড়িকে আবার নির্দিষ্ট সময়ে জেগে ওঠার জন্য অভ্যস্ত করা সম্ভব।
শরীরের নিজস্ব ঘড়ি
মানুষের শরীরে একটি প্রাকৃতিক জৈবঘড়ি রয়েছে, যাকে সার্কাডিয়ান রিদম বলা হয়। এটি প্রায় ২৪ ঘণ্টার একটি চক্রের মাধ্যমে ঘুম ও জাগরণসহ শরীরের বিভিন্ন কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করে। প্রতিদিন একই সময়ে ঘুমানো ও জেগে ওঠার অভ্যাস করলে শরীর ধীরে ধীরে সেই সময়সূচির সঙ্গে মানিয়ে নিতে শুরু করে।
এ কারণে ছোটবেলায় স্কুলের নিয়মিত রুটিনের কারণে অনেকের নির্দিষ্ট সময়ে অ্যালার্ম ছাড়াই ঘুম ভেঙে যেত। পরবর্তী জীবনে অনিয়মিত কাজ, পড়াশোনা, রাত জাগা ও ছুটির দিনে দেরি করে ঘুমানোর কারণে এই স্বাভাবিক ছন্দে পরিবর্তন আসতে পারে।
পর্যাপ্ত ঘুমের গুরুত্ব
অ্যালার্ম ছাড়া ঘুম থেকে ওঠার জন্য প্রথমেই পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করতে হবে। একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের সাধারণত প্রতি রাতে ৭ থেকে ৯ ঘণ্টা ঘুমের প্রয়োজন হয়। তবে বয়স, শারীরিক অবস্থা ও ব্যক্তিগত চাহিদার ওপর ঘুমের প্রয়োজনীয়তা ভিন্ন হতে পারে।
কম ঘুমিয়ে অ্যালার্ম ছাড়া ওঠার চেষ্টা করলে শরীর ও মস্তিষ্ক পর্যাপ্ত বিশ্রাম পাবে না। এতে সকালে ক্লান্তি, মনোযোগের ঘাটতি ও কাজে অনীহা দেখা দিতে পারে। তাই লক্ষ্য হওয়া উচিত অ্যালার্ম বাদ দেওয়া নয়, বরং পর্যাপ্ত ও নিয়মিত ঘুমের অভ্যাস তৈরি করা।
নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমানোর অভ্যাস
প্রতিদিন একই সময়ের কাছাকাছি ঘুমাতে যাওয়া এবং একই সময়ে ঘুম থেকে ওঠা শরীরের জৈবঘড়িকে নিয়মিত করতে সাহায্য করে। এমনকি ছুটির দিনেও ঘুম ও জাগার সময় খুব বেশি পরিবর্তন না করাই ভালো।
যাদের ঘুমের সময়সূচি অনেকটাই এলোমেলো, তারা হঠাৎ করে কয়েক ঘণ্টা এগিয়ে না গিয়ে ধীরে ধীরে পরিবর্তন করতে পারেন। প্রতিদিন প্রায় ৩০ মিনিট করে ঘুমানো ও জাগার সময় পরিবর্তন করলে শরীরের জন্য মানিয়ে নেওয়া সহজ হতে পারে।
সকালের আলো
সকালের প্রাকৃতিক আলো শরীরের জৈবঘড়ি নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ঘুম থেকে ওঠার পর জানালা বা পর্দা খুলে দিনের আলো ঘরে প্রবেশ করতে দেওয়া এবং সম্ভব হলে কিছু সময় বাইরে থাকা শরীরকে জেগে ওঠার সংকেত দিতে পারে।
অন্যদিকে, ঘুমানোর আগে অতিরিক্ত উজ্জ্বল আলো এড়িয়ে চলা ভালো। রাতে আলো কমিয়ে দিলে শরীর ধীরে ধীরে ঘুমের জন্য প্রস্তুত হতে পারে।
ঘুমানোর আগে মোবাইল ব্যবহার কমানো
বর্তমান সময়ে ঘুমের অন্যতম বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে স্মার্টফোন। ঘুমানোর আগে দীর্ঘ সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্ক্রল করা বা ভিডিও দেখা মস্তিষ্ককে সক্রিয় রাখে এবং ঘুমানোর সময় পিছিয়ে দিতে পারে।
তাই ঘুমানোর আগে ফোন ব্যবহার সীমিত করা, প্রয়োজনে নোটিফিকেশন বন্ধ করা এবং ফোনটি বিছানা থেকে কিছুটা দূরে রাখা ভালো অভ্যাস হতে পারে।
আরামদায়ক পরিবেশ তৈরি
ভালো ঘুমের জন্য শান্ত, অন্ধকার ও আরামদায়ক পরিবেশ গুরুত্বপূর্ণ। অতিরিক্ত আলো, শব্দ কিংবা গরম পরিবেশ ঘুমে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। তাই ঘুমানোর সময় ঘরকে যতটা সম্ভব আরামদায়ক রাখা উচিত।
ঘুমানোর আগে বই পড়া, হালকা পরিচর্যা করা কিংবা অন্যান্য শান্ত কাজের মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট রাতের রুটিন তৈরি করা যেতে পারে। এতে শরীর বুঝতে পারে যে এখন বিশ্রামের সময়।
খাদ্য ও পানীয়ের প্রভাব
রাতে অতিরিক্ত ক্যাফেইন গ্রহণ ঘুমে সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। তাই বিকেল বা সন্ধ্যার পর চা, কফি ও ক্যাফেইনযুক্ত পানীয় গ্রহণের ক্ষেত্রে সতর্ক হওয়া ভালো। একইভাবে ঘুমানোর ঠিক আগে ভারী খাবার খাওয়াও এড়িয়ে চলা উচিত।
নিয়মিত সময়ে খাবার খাওয়ার অভ্যাসও শরীরের দৈনন্দিন ছন্দ বজায় রাখতে সহায়তা করতে পারে।
ধৈর্য ধরে অভ্যাস তৈরি করা
অ্যালার্ম ছাড়া নির্দিষ্ট সময়ে ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস এক বা দুই দিনে তৈরি হয় না। শরীরের জৈবঘড়ি ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হয়। তাই নিয়মিত রুটিন অনুসরণ করে কিছুদিন অপেক্ষা করা প্রয়োজন।
প্রথম দিকে অ্যালার্ম ব্যবহার করা যেতে পারে। পরে যদি দেখা যায় যে নির্দিষ্ট সময়ের কাছাকাছি স্বাভাবিকভাবেই ঘুম ভেঙে যাচ্ছে, তখন অ্যালার্মকে ব্যাকআপ হিসেবে রাখা যেতে পারে।
উপসংহার
অ্যালার্ম ছাড়াই সময়মতো ঘুম থেকে ওঠা কোনো অসম্ভব বিষয় নয়। তবে এর জন্য নিয়মিত ও স্বাস্থ্যকর ঘুমের অভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি। পর্যাপ্ত ঘুম, নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমানো ও জাগা, সকালে প্রাকৃতিক আলো গ্রহণ, রাতে মোবাইল ব্যবহার কমানো এবং আরামদায়ক ঘুমের পরিবেশ-এসব অভ্যাস শরীরের জৈবঘড়িকে নিয়মিত করতে সাহায্য করতে পারে।
সবশেষে বলা যায়, অ্যালার্মের ওপর নির্ভরতা কমানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো অ্যালার্মকে বাদ দেওয়ার চেষ্টা না করে নিজের শরীরের স্বাভাবিক ঘুম ও জাগরণের ছন্দকে ঠিক করে তোলা। এতে শুধু সময়মতো ঘুম থেকে ওঠাই সহজ হবে না, বরং দিনের শুরুটিও হতে পারে আরও সতেজ ও কর্মক্ষম।



‘মিলিটারি স্লিপ মেথড’, যে পদ্ধতিতে ঘুম আসবে দুই মিনিটেই!