বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস ২০২৬ উপলক্ষে ‘মনখুলে কথা বলি, আত্মহত্যা প্রতিরোধ করি’ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে র্যালি ও সচেতনতামূলক কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে ক্লিনিক্যাল সোশ্যাল ওয়ার্ক অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের উদ্যোগে আয়োজিত এ কর্মসূচিতে ছাত্র, শিক্ষক, চিকিৎসক, মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, ক্লিনিক্যাল সোশ্যাল ওয়ার্কারসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশগ্রহণ করেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার অ্যান্ড রিসার্চ-এর ক্লিনিক্যাল সোশ্যাল ওয়ার্কের প্রতিষ্ঠাতা, ক্লিনিক্যাল সোশ্যাল ওয়ার্ক অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ-এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি এবং রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক তাহ্মিনা আখতার কর্মসূচিতে সভাপতিত্ব করেন। অনুষ্ঠানে সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক শাহিন খানসহ অন্য সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
সভাপতির বক্তব্যে রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক তাহ্মিনা আখতার বলেন, ‘‘আত্মহত্যা কোনো ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়; এটি একটি প্রতিরোধযোগ্য স্বাস্থ্য ও সামাজিক সংকট। জীবনের নানা প্রতিকূলতা, মানসিক চাপ ও সংকটের মুহূর্তে একজন মানুষ যখন নিজেকে অসহায় ও বিচ্ছিন্ন মনে করেন, তখন আত্মহত্যার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাই আত্মহত্যা প্রতিরোধে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো-ঝুঁকিতে থাকা মানুষের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা, তাকে বিচার না করা এবং প্রয়োজনের সময়ে যথাযথ সহায়তার ব্যবস্থা করা।’’
তিনি আরও বলেন, ‘‘বর্তমান বিশ্বে আত্মহত্যা একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য সমস্যা। বিশ্বব্যাপী প্রতিবছর প্রায় ৭ লাখের বেশি মানুষ আত্মহত্যার কারণে মৃত্যুবরণ করেন। বিশেষ করে কিশোর ও তরুণ জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে আত্মহত্যা একটি গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি হিসেবে বিবেচিত।’’
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘‘আত্মহত্যার পেছনে একক কোনো কারণ কাজ করে না। মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা, পারিবারিক ও দাম্পত্য কলহ, সম্পর্কের টানাপোড়েন, শিক্ষাজীবনের অতিরিক্ত চাপ, আর্থিক অনিশ্চয়তা, সহিংসতা, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, প্রতিকূল জীবনপরিস্থিতি এবং প্রাণঘাতী উপকরণের সহজলভ্যতা-বিভিন্ন বিষয় সম্মিলিতভাবে আত্মহত্যার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।’’
তিনি জানান, বিভিন্ন গবেষণায় কিশোর-তরুণ, শিক্ষার্থী, নারী এবং গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে তুলনামূলকভাবে বেশি ঝুঁকির প্রবণতা দেখা গেছে। তবে হাসপাতাল, পুলিশ ও সংবাদমাধ্যমনির্ভর তথ্যের ওপর অধিক নির্ভরতার কারণে বাংলাদেশে আত্মহত্যার প্রকৃত চিত্র নিরূপণে এখনো গুরুত্বপূর্ণ তথ্যগত সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
অধ্যাপক তাহ্মিনা আখতার বলেন, “আত্মহত্যা প্রতিরোধে বিচ্ছিন্ন, স্বল্পমেয়াদি বা প্রতিক্রিয়াশীল উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন সমন্বিত, প্রমাণভিত্তিক এবং দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় কর্মপরিকল্পনা।”
তিনি আরও বলেন, ‘‘যারা আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন, তাদের শুধু তাৎক্ষণিক চিকিৎসা দেওয়াই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন ধারাবাহিক চিকিৎসা, মানসিক সহায়তা ও নিয়মিত অনুসরণ। একই সঙ্গে পরিবারে পারস্পরিক যোগাযোগ ও সহমর্মিতা বৃদ্ধি, সহিংসতা প্রতিরোধ, দায়িত্বশীল ও সংবেদনশীল গণমাধ্যম প্রতিবেদন নিশ্চিত করা এবং প্রাণঘাতী উপকরণের সহজ প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণেও কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।’’
তিনি আত্মহত্যাকে ব্যক্তিগত ব্যর্থতা, দুর্বলতা কিংবা অপরাধ হিসেবে না দেখে প্রতিরোধযোগ্য স্বাস্থ্য ও সামাজিক সংকট হিসেবে দেখার আহ্বান জানান।
তিনি আত্মহত্যা প্রতিরোধে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যসেবাকে সহজলভ্য, গ্রহণযোগ্য ও বৈষম্যহীন করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। একই সঙ্গে ঝুঁকিতে থাকা মানুষের প্রতি সহমর্মী আচরণ এবং সময়মতো পেশাগত সহায়তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।



