আমাদের প্রতিদিনের খাবারের খুব সামান্য পরিবর্তন কখনো কখনো একটি দেশের জনস্বাস্থ্যে বড় পরিবর্তন আনতে পারে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এমন কিছু প্রধান খাদ্য রয়েছে, যা প্রায় প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ গ্রহণ করে। এসব খাবারে নিয়ন্ত্রিতভাবে অল্প পরিমাণে প্রয়োজনীয় ভিটামিন ও খনিজ যোগ করে জনগণের পুষ্টির ঘাটতি কমানোর চেষ্টা করা হয়। খাদ্যবিজ্ঞানে এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় খাদ্য সমৃদ্ধকরণ বা ফুড ফর্টিফিকেশন। যুক্তরাজ্যে গমের আটা-ময়দা এর একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।
যুক্তরাজ্যে সাধারণ হোলমিল নয় এমন গমের আটায় নির্দিষ্ট মাত্রায় আয়রন, ক্যালসিয়াম, থায়ামিন বা ভিটামিন বি১ এবং নিয়াসিন বা ভিটামিন বি৩ থাকা আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক। এর সঙ্গে ২০২৬ সালের ১৩ ডিসেম্বর থেকে ফলিক অ্যাসিড যোগ করার নতুন বাধ্যতামূলক ব্যবস্থা কার্যকর হওয়ার কথা। অর্থাৎ একজন মানুষ যখন সাধারণ রুটি বা গমের তৈরি অন্য খাবার খাচ্ছেন, তখন তিনি নিজের অজান্তেই কিছু গুরুত্বপূর্ণ ভিটামিন ও খনিজও গ্রহণ করছেন।
বাংলাদেশেও কি একইধরনের ব্যবস্থা আরও বিস্তৃতভাবে চালু করা উচিত? আমাদের পুষ্টি পরিস্থিতি বিবেচনা করলে বিষয়টি এখন গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনার দাবি রাখে।
বাংলাদেশের প্রধান খাদ্য অবশ্যই চাল। তাই প্রথমে মনে হতে পারে, চালকেই ফর্টিফিকেশনের প্রধান মাধ্যম করা সবচেয়ে সহজ হবে। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষের চাল প্রস্তুত ও রান্নার পদ্ধতির বিষয়টিও বিবেচনা করতে হবে। অনেক পরিবারে চাল রান্নার আগে কয়েকবার পানি দিয়ে ধোয়া হয়। কোথাও চাল ভিজিয়ে রাখা হয়, আবার কোথাও অতিরিক্ত পানি দিয়ে রান্না করে মাড় ফেলে দেওয়া হয়। পানিতে দ্রবণীয় কিছু ভিটামিন ও খনিজ এ ধরনের প্রক্রিয়ায় কমে যেতে পারে।
আধুনিক প্রযুক্তিতে অবশ্য এমন ফর্টিফাইড রাইস কার্নেল তৈরি করা সম্ভব, যেখানে পুষ্টি উপাদান চালের দানার ভেতরের কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত থাকে এবং সাধারণ ধোয়ায় সব পুষ্টি চলে যায় না। তাই চাল ফর্টিফিকেশন প্রযুক্তিগতভাবে অসম্ভব নয়। কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তব রান্নার অভ্যাস, উৎপাদন ব্যবস্থা, অসংখ্য ছোট চালকল, খরচ এবং মান নিয়ন্ত্রণের বিষয় বিবেচনা করলে জাতীয় পর্যায়ে এটি তুলনামূলক জটিল হতে পারে।
এই জায়গায় আটা ও ময়দা একটি বাস্তবসম্মত বিকল্প হতে পারে।
গমের আটা বা ময়দা সাধারণত ভোক্তা রান্নার আগে ধুয়ে নেন না। মিলে উৎপাদনের সময়ই নির্দিষ্ট মাত্রায় ভিটামিন ও খনিজের প্রিমিক্স যোগ করা সম্ভব। এরপর সেই আটা দিয়ে রুটি, পরোটা, বিস্কুট, নুডলস বা অন্যান্য খাবার তৈরি হলেও পুষ্টি উপাদানের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ খাদ্যের মধ্যেই থেকে যেতে পারে। ফলে শিল্প পর্যায়ে এর পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ এবং মান পরীক্ষা করাও তুলনামূলক সহজ।
বর্তমানে বাংলাদেশের খাদ্যাভ্যাসও দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। শহরাঞ্চলের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে রুটি, পরোটা, বিস্কুট, নুডলস, পাউরুটি এবং অন্যান্য বেকারি পণ্যের ব্যবহার বেড়েছে। ফলে আটা ও ময়দা এখন শুধু একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির মানুষের খাবার নয়। বিপুলসংখ্যক মানুষের দৈনন্দিন খাদ্যের অংশ হয়ে উঠছে। এ কারণে বাংলাদেশের জন্য বাধ্যতামূলক আটা-ময়দা ফর্টিফিকেশনের সম্ভাবনা গুরুত্ব দিয়ে মূল্যায়ন করার সময় এসেছে।
গম থেকে সাদা ময়দা তৈরির সময় শস্যের বাইরের স্তর এবং জার্মের একটি অংশ আলাদা হয়ে যায়। এর সঙ্গে প্রাকৃতিকভাবে থাকা কিছু ভিটামিন ও খনিজও কমে যেতে পারে। যুক্তরাজ্যে দীর্ঘদিন ধরে এই বিষয়টি বিবেচনা করে ময়দায় আয়রন, থায়ামিন ও নিয়াসিনের নির্দিষ্ট মাত্রা বজায় রাখার ব্যবস্থা রয়েছে। ক্যালসিয়ামও জনস্বাস্থ্যগত উদ্দেশ্যে যোগ করা হয়। নতুন করে ফলিক অ্যাসিড যোগ করার সিদ্ধান্তটি আরও গুরুত্বপূর্ণ।
ফোলেট বা ভিটামিন বি৯ আমাদের শরীরে নতুন কোষ তৈরি, কোষ বিভাজন এবং ডিএনএ তৈরির জন্য প্রয়োজন। গর্ভধারণের আগে এবং গর্ভাবস্থার একেবারে প্রথম দিকে এর গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি। এ সময় পর্যাপ্ত ফোলেট না থাকলে গর্ভের শিশুর মস্তিষ্ক ও মেরুদণ্ডের প্রাথমিক বিকাশে গুরুতর ত্রুটির ঝুঁকি বাড়তে পারে, যাকে নিউরাল টিউব ডিফেক্ট বলা হয়।
এখানে একটি বাস্তব সমস্যা রয়েছে। অনেক নারী গর্ভধারণের কয়েক সপ্তাহ পর জানতে পারেন যে তিনি গর্ভবতী। কিন্তু তত দিনে ভ্রূণের স্নায়ুতন্ত্রের বিকাশের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায় শুরু হয়ে গেছে। তাই শুধু গর্ভাবস্থা নিশ্চিত হওয়ার পর ফলিক অ্যাসিড সাপ্লিমেন্ট দেওয়ার পাশাপাশি প্রজননক্ষম বয়সের নারীদের নিয়মিত খাদ্যের মাধ্যমে কিছু ফলিক অ্যাসিড পৌঁছে দেওয়া জনস্বাস্থ্যের দিক থেকে কার্যকর হতে পারে। যুক্তরাজ্যে আটা-ময়দায় ফলিক অ্যাসিড বাধ্যতামূলক করার পেছনে এটিই অন্যতম প্রধান কারণ।
বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিতেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৫ সালের বাংলাদেশ মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভের তথ্য অনুযায়ী, ১২ থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের প্রায় ৪৩.৯% এবং গর্ভবতী নারীদের প্রায় ৫৩.১% রক্তস্বল্পতায় আক্রান্ত। এই পরিসংখ্যান দেখায় যে রক্ত ও পুষ্টিসংশ্লিষ্ট সমস্যা এখনও আমাদের জনস্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।
তবে একটি বিষয় পরিষ্কার থাকা প্রয়োজন-রক্তস্বল্পতা মানেই আয়রনের ঘাটতি নয়। আয়রনের পাশাপাশি ফলিক অ্যাসিড ও ভিটামিন বি১২-এর ঘাটতি, সংক্রমণ, প্রদাহ, বংশগত হিমোগ্লোবিন সমস্যা এবং অন্যান্য কারণেও রক্তস্বল্পতা হতে পারে। তাই বাংলাদেশের জন্য আটা ফর্টিফিকেশনের নীতি তৈরি করার আগে কোন পুষ্টি উপাদানের ঘাটতি কতটা রয়েছে তার হালনাগাদ তথ্য প্রয়োজন।
আয়রন অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। এটি হিমোগ্লোবিন তৈরিতে প্রয়োজন হয়। হিমোগ্লোবিন রক্তের মাধ্যমে শরীরের বিভিন্ন অংশে অক্সিজেন বহন করে। আয়রনের প্রকৃত ঘাটতি হলে ক্লান্তি ও দুর্বলতার পাশাপাশি শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ এবং প্রাপ্তবয়স্কদের কর্মক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। গর্ভাবস্থায়ও পর্যাপ্ত আয়রনের গুরুত্ব রয়েছে।
কিন্তু আটা-ময়দায় আয়রন যোগ করার ক্ষেত্রে শুধু পরিমাণ নির্ধারণ করলেই হবে না। কোন ধরনের আয়রন যৌগ ব্যবহার করা হবে, শরীর সেটি কতটা শোষণ করতে পারবে, আটার স্বাদ ও রঙে কোনো পরিবর্তন হবে কি না এবং সংরক্ষণের সময় পুষ্টির স্থায়িত্ব কেমন থাকবে-এসব বিষয়ও বিবেচনায় নিতে হবে।
বাংলাদেশের জন্য জিঙ্কও বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। জিঙ্ক শিশুদের স্বাভাবিক বৃদ্ধি, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা, ক্ষত নিরাময় এবং শরীরের অসংখ্য এনজাইমের স্বাভাবিক কার্যক্রমে প্রয়োজন। বাংলাদেশের আগের জাতীয় মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট জরিপে শিশু ও নারীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য জিঙ্ক ঘাটতি পাওয়া গেছে। আমাদের খাদ্যের বড় অংশ উদ্ভিজ্জ উৎস থেকে আসায় ফাইটেটের মতো উপাদান জিঙ্ক শোষণ কমাতে পারে। তাই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ আটা ফর্টিফিকেশন নীতিতে জিঙ্ক অন্তর্ভুক্ত করার সম্ভাবনাও বৈজ্ঞানিকভাবে মূল্যায়ন করা যেতে পারে।
ভিটামিন বি১২-এর কথাও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। এটি স্বাভাবিক লোহিত রক্তকণিকা তৈরি, স্নায়ুতন্ত্রের কার্যক্রম এবং ডিএনএ সংশ্লেষণের জন্য প্রয়োজন। ভিটামিন বি১২ প্রধানত প্রাণিজ খাবার থেকে আসে। যেসব পরিবারের খাদ্যে মাছ, মাংস, ডিম, দুধ ও অন্যান্য প্রাণিজ খাবার পর্যাপ্ত নয়, তাদের মধ্যে বি১২-এর অপর্যাপ্ত গ্রহণের ঝুঁকি থাকতে পারে। ফলে আয়রন ও ফলিক অ্যাসিডের পাশাপাশি ভিটামিন বি১২-এর প্রয়োজনীয়তাও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে পরীক্ষা করা উচিত।
থায়ামিন বা ভিটামিন বি১ খাবার থেকে শক্তি উৎপাদন এবং স্নায়ুতন্ত্রের স্বাভাবিক কাজের জন্য প্রয়োজন। নিয়াসিন বা ভিটামিন বি৩ শরীরের শক্তি বিপাক, ত্বক ও স্নায়ুতন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যক্রমে ভূমিকা রাখে। গম অতিরিক্ত পরিশোধনের সময় এসব পুষ্টি উপাদানের একটি অংশ কমে যেতে পারে। তাই পরিশোধিত ময়দায় এগুলো পুনরায় যোগ করার পেছনে যথেষ্ট পুষ্টিবৈজ্ঞানিক যুক্তি রয়েছে।
ক্যালসিয়ামের গুরুত্বও শুধু হাড় ও দাঁতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। পেশির সংকোচন, স্নায়ুর সংকেত আদান-প্রদান এবং শরীরের বিভিন্ন জৈবিক কার্যক্রমে এটি প্রয়োজন। যুক্তরাজ্যে আটায় ক্যালসিয়াম যোগ করা হয়। তবে বাংলাদেশকেও একই মাত্রায় ক্যালসিয়াম দিতে হবে এমন নয়। আমাদের জনগোষ্ঠীর ক্যালসিয়াম গ্রহণ, খাদ্যাভ্যাস এবং প্রকৃত ঘাটতির তথ্য বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
বাংলাদেশে খাদ্য ফর্টিফিকেশন নতুন ধারণা নয়। আয়োডিনযুক্ত লবণ আমাদের সবচেয়ে পরিচিত উদাহরণ। ভোজ্যতেলে ভিটামিন এ যোগ করার আইনগত ব্যবস্থাও রয়েছে। অর্থাৎ প্রতিদিনের খাবারের মাধ্যমে কোটি মানুষের কাছে অল্প পরিমাণে গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি পৌঁছে দেওয়ার অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের ইতিমধ্যেই রয়েছে।
এখন সেই অভিজ্ঞতাকে আটা ও ময়দার ক্ষেত্রে আরও বিস্তৃতভাবে কাজে লাগানো যায় কি না, সেটিই বিবেচনা করা প্রয়োজন।
এর একটি বড় সুবিধা হলো কেন্দ্রীয়ভাবে উৎপাদিত আটা-ময়দায় ফর্টিফিকেশন তুলনামূলকভাবে নিয়ন্ত্রণযোগ্য। ভিটামিন ও খনিজের একটি নির্ধারিত প্রিমিক্স মিলে অত্যন্ত অল্প কিন্তু সুনির্দিষ্ট পরিমাণে আটার সঙ্গে মেশানো যায়। সঠিক যন্ত্রপাতি থাকলে প্রতি টন আটায় নির্দিষ্ট পরিমাণ প্রিমিক্স যোগ করা এবং পুরো ব্যাচে সমভাবে ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব।
তবে শুধু আইন করলেই কাজ শেষ হবে না। ফর্টিফিকেশন একটি নিয়ন্ত্রিত খাদ্যপ্রযুক্তিগত প্রক্রিয়া। প্রিমিক্সের গুণগত মান নিশ্চিত করতে হবে, ডোজিং যন্ত্র নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে, মিশ্রণ সমান হচ্ছে কি না পরীক্ষা করতে হবে এবং বাজার থেকে নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষাগারে যাচাই করতে হবে। এক প্যাকেট আটায় খুব কম এবং অন্য প্যাকেটে অতিরিক্ত পুষ্টি থাকলে ফর্টিফিকেশনের উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হবে।
ছোট ও মাঝারি মিলগুলোকেও এই ব্যবস্থার মধ্যে আনতে হবে। তাদের জন্য সহজ প্রযুক্তি, মানসম্মত প্রিমিক্স, প্রশিক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তার ব্যবস্থা থাকতে হবে। অন্যথায় শুধু বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান ফর্টিফাইড আটা উৎপাদন করবে আর বাজারের বড় অংশ সাধারণ আটা ব্যবহার করবে-এমন পরিস্থিতিতে জাতীয় জনস্বাস্থ্যগত সুফল সীমিত থেকে যাবে।
অবশ্যই এর জন্য কিছু অতিরিক্ত খরচ হবে। প্রিমিক্স কিনতে হবে, ডোজিং যন্ত্রপাতি লাগবে, পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করতে হবে, কর্মীদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে এবং সরকারি তদারকি বাড়াতে হবে। কিন্তু ভিটামিন ও খনিজ অত্যন্ত অল্প পরিমাণে যোগ করা হয় এবং একটি বড় উৎপাদনব্যবস্থার মাধ্যমে লাখ লাখ মানুষের কাছে পৌঁছানো যায়। ফলে প্রতি ব্যক্তির হিসাবে খরচ তুলনামূলকভাবে কম হতে পারে। এর বিপরীতে অপুষ্টির কারণে চিকিৎসা ব্যয়, কর্মক্ষমতা হ্রাস, শিশুদের বিকাশে সমস্যা এবং মাতৃস্বাস্থ্যের জটিলতার অর্থনৈতিক মূল্য অনেক বড় হতে পারে।
তবে আটা-ময়দা ফর্টিফিকেশনকে কখনোই সুষম খাদ্যের বিকল্প হিসেবে দেখা উচিত নয়। আটায় ফলিক অ্যাসিড যোগ করা হলে শাকসবজি ও ফল খাওয়ার প্রয়োজন শেষ হয়ে যায় না। আয়রন যোগ করা হলে মাছ, মাংস, ডাল বা অন্যান্য আয়রনসমৃদ্ধ খাবারের গুরুত্ব কমে না। জিঙ্ক ও বি১২ যোগ করলেও বৈচিত্র্যময় খাদ্যের প্রয়োজন একই থাকে। ফর্টিফিকেশন হচ্ছে জনগণের খাদ্যব্যবস্থায় একটি অতিরিক্ত পুষ্টিগত নিরাপত্তাবেষ্টনী।
বাংলাদেশে বাধ্যতামূলক আটা-ময়দা ফর্টিফিকেশন চালু করার আগে তাই একটি হালনাগাদ জাতীয় মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট জরিপ করা প্রয়োজন। আয়রন, ফোলেট, ভিটামিন বি১২, জিঙ্ক, ক্যালসিয়াম, ভিটামিন এ, ভিটামিন ডি ও আয়োডিনসহ গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদানের বর্তমান অবস্থা জানতে হবে। একই সঙ্গে দেশের মানুষ অঞ্চল ও বয়সভেদে প্রতিদিন কতটুকু আটা ও ময়দা গ্রহণ করে সেটিও নির্ধারণ করা দরকার।
এই তথ্যের ভিত্তিতে বাংলাদেশ নিজস্ব একটি ফর্টিফিকেশন মান তৈরি করতে পারে। যুক্তরাজ্যের সূত্র হুবহু নকল করার প্রয়োজন নেই। বাংলাদেশের মানুষের প্রয়োজন অনুযায়ী আয়রন, ফলিক অ্যাসিড, জিঙ্ক, ভিটামিন বি১, বি৩ এবং প্রয়োজন প্রমাণিত হলে ভিটামিন বি১২ বা অন্য পুষ্টি উপাদানের উপযুক্ত সমন্বয় নির্ধারণ করা যেতে পারে।
যুক্তরাজ্যের কাছ থেকে আমাদের সবচেয়ে বড় শিক্ষা তাই প্রতি ১০০ গ্রাম আটায় ঠিক কত মিলিগ্রাম আয়রন বা ক্যালসিয়াম রয়েছে সেটি নয়। বড় শিক্ষা হচ্ছে প্রতিরোধমূলক পুষ্টির ধারণা। রোগ হওয়ার পর চিকিৎসা করার পাশাপাশি প্রতিদিনের সাধারণ খাবারের মাধ্যমেই যদি মানুষের পুষ্টির কিছু ঘাটতি কমিয়ে আনা যায়, তার সুফল একটি পুরো প্রজন্ম পেতে পারে।
বাংলাদেশ আয়োডিনযুক্ত লবণ এবং ভিটামিন এ সমৃদ্ধ ভোজ্যতেলের মাধ্যমে এরইমধ্যেই দেখিয়েছে যে প্রধান খাদ্যের মাধ্যমে জনস্বাস্থ্য উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব। এখন সময় এসেছে আটা ও ময়দাকেও সেই আলোচনার কেন্দ্রে আনার।
বাংলাদেশ ভাতের দেশ-এটি আমাদের খাদ্যসংস্কৃতির বাস্তবতা। কিন্তু চাল ধোয়া, ভিজিয়ে রাখা এবং রান্নার বৈচিত্র্য, সেই সঙ্গে ফর্টিফাইড চালের প্রযুক্তি ও নিয়ন্ত্রণের জটিলতার কারণে নিকট ভবিষ্যতে কেন্দ্রীয়ভাবে উৎপাদিত আটা ও ময়দা একটি তুলনামূলক সহজ, নিয়ন্ত্রণযোগ্য ও বাস্তবসম্মত ফর্টিফিকেশন মাধ্যম হতে পারে। ভবিষ্যতে প্রযুক্তি, অর্থনীতি ও খাদ্যাভ্যাসের তথ্য অনুকূল হলে চালের সম্ভাবনাও আলাদাভাবে বিবেচনা করা যেতে পারে।
প্রতিদিনের একটি রুটি বা পরোটায় থাকা কয়েক মিলিগ্রাম কিংবা কয়েক মাইক্রোগ্রাম অতিরিক্ত পুষ্টি খুব সামান্য মনে হতে পারে। কিন্তু যখন কোটি মানুষ প্রতিদিন এবং বছরের পর বছর সেই খাবার গ্রহণ করে, তখন সেই ক্ষুদ্র পরিমাণই বড় জনস্বাস্থ্যগত পরিবর্তনের ভিত্তি তৈরি করতে পারে।
বাংলাদেশের লক্ষ্য তাই শুধু ‘ফর্টিফাইড আটা’ তৈরি করা নয়; লক্ষ্য হওয়া উচিত-সঠিক বৈজ্ঞানিক তথ্যের ভিত্তিতে, সঠিক মাত্রায় এবং নিরাপদ উপায়ে প্রতিদিনের খাবারের মাধ্যমে মানুষের পুষ্টির ঘাটতি কমানো।
ড. শহীদুল ইসলাম, খাদ্যবিজ্ঞানী, গবেষক এবং খাদ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ



