সিম্পোজিয়ামের শেষ অধিবেশনের শিরোনাম ছিল 'আগামীর জন্য গড়া: প্রতিষ্ঠান, উদ্ভাবন ও মান'। সেই অধিবেশনেই আইসিডিডিআরবির ইমেরিটাস বিজ্ঞানী ড. ফেরদৌসী কাদরী বললেন, উদ্ভাবন শব্দটা তার কাছে কিছুটা ফাঁপা লাগে।
সারাদিনের সবচেয়ে ধারালো কথাটি সম্ভবত এটাই। এবং এটি বলার অধিকার সম্ভবত তারই সবচেয়ে বেশি।
প্রশ্নটা শব্দ নয়, কাজ
কাদরীর আপত্তির কারণ সহজ। উদ্ভাবন নিয়ে আলোচনা হয় অনেক, কিন্তু ফল দেখা যায় কম। তার প্রশ্ন ছিল সরাসরি: বাংলাদেশে ভ্যাকসিন তৈরি হয় না কেন?
বারো বছর আগে তারা মুখে খাওয়ার কলেরা টিকা নিয়ে কাজ শুরু করেন, দেশের প্রেক্ষাপটে সেটিকে মানিয়ে নেন, আর সবার কাছে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। তার মতে কলেরা ঠেকাতে পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন যেমন লাগে, টিকাও তেমনই লাগে, একটির বদলে আরেকটি নয়। এরপর কাজ এগোয় টাইফয়েডের টিকার দিকে, ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের মধ্য দিয়ে কার্যকারিতা প্রমাণ করে। তিনি গড়ে তুলেছেন আইদেশি, যেখানে তরুণ একটি দল থ্যালাসেমিয়া নিয়ে কাজ করছে।
তার একটি পর্যবেক্ষণ আমাকে ভাবিয়েছে সবচেয়ে বেশি। দেশে এখন একটি জাতীয় কলেরা নিয়ন্ত্রণ পরিকল্পনা আছে, কিন্তু সেটি নিয়ে কেউ কথা বলতে চায় না, কারণ কলেরা দারিদ্র্যের প্রতীক।
এই বাক্যটির ভেতরে প্রথম পর্বের পুরো তর্কটাই আছে। জিডিপি যেমন কিছু খরচকে অর্জন হিসেবে দেখায়, আমাদের জাতীয় আত্মপরিচয়ও তেমনি কিছু সাফল্যকে লুকিয়ে রাখে, কারণ সেগুলো মনে করিয়ে দেয় আমরা কোথা থেকে উঠে এসেছি। যে সূচক অস্বস্তি দেয়, সেটিকে আমরা আলোচনার বাইরে রাখি। অথচ ওই পরিকল্পনাটি একটি অর্জন, লজ্জা নয়।
কাদরীর শেষ কথাটি ছিল সরল। আমাদের সবারই কিছু না কিছু দেয়া দরকার। মানুষকে উদাহরণ দেখাতে হবে। ভালো কাজ করতে হবে।
যা কাজ করছে না, সেখান থেকেই
মানবাধিকারকর্মী অধ্যাপক হামিদা হোসেন একই কথা অন্যভাবে বললেন। তার মতে উদ্ভাবন প্রায়ই জন্ম নেয় সেখান থেকে, যা কাজ করছে না।
তার কাজের ধারাটা এই কথারই প্রমাণ। অধিকারের প্রশ্নকে সামনে রাখা, মানুষের সমস্যাটা আগে বোঝার চেষ্টা করা, আর আইনকে গুরুত্ব দেওয়া। কিন্তু আইনি সহায়তাতেই থেমে না থাকা। কাউন্সেলিং আর আশ্রয়ের প্রয়োজন দেখে সেই ব্যবস্থা গড়া, ড্রপ-ইন সেন্টার চালু করা, 'যখন তখন স্কুল' চালু করা যেখানে শিশু নিজের সময়মতো আসতে পারে। কাজ ছড়িয়ে দেওয়া শিল্প, নাটক আর সংস্কৃতির ভেতর দিয়ে। আর প্রতি বছর একটি মানবাধিকার প্রতিবেদন প্রকাশ করা।
তার নেওয়া শিক্ষা দুটি। সহযোগিতা জরুরি, আর ভালো প্রতিষ্ঠানের অবশ্যই শেখার ক্ষমতা থাকতে হবে।
শেষ কথাটি আমি আমার কাজে বারবার সত্য হতে দেখেছি। যেসব প্রতিষ্ঠান আটকে যায়, তাদের সমস্যা সাধারণত সম্পদের অভাব নয়। সমস্যা হলো, যা কাজ করছে না সেটা স্বীকার করার পথ প্রতিষ্ঠানের ভেতরে খোলা নেই। ব্যর্থতা যেখানে তথ্য, সেখানে প্রতিষ্ঠান শেখে। ব্যর্থতা যেখানে অপরাধ, সেখানে প্রতিষ্ঠান কেবল ভান করতে শেখে।
ব্যক্তির ইচ্ছাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া
পিকেএসএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ফজলুল কাদের উদ্ভাবনের সংজ্ঞাটা টানলেন আরও পেছন থেকে। ১৯৮৩ সালে তার সামনে প্রশ্ন ছিল, ন্যূনতম হস্তক্ষেপে কি মানুষের মুক্তি নিশ্চিত করা যায়?
পিকেএসএফ আসলে একটি প্রতিষ্ঠান-নির্মাতা প্রতিষ্ঠান। এনজিওগুলোকে ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানে রূপ দেওয়ার মতো একটি পরিবেশ তারা তৈরি করেছে, অর্থায়নের সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিকীকরণকে মিলিয়ে। কর্মক্ষমতার মান নির্ধারণ, নিজস্ব ও বাইরের মূল্যায়ন, নিয়মকানুন তৈরি, এই কাজগুলোর স্বীকৃতি বিশ্বব্যাংক দিয়েছিল ২০০৪ সালে।
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য আবদুল মুয়ীদ চৌধুরী মনে করিয়ে দিলেন, পিকেএসএফ দেশে গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠান, আর অনেকদিন তারা বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ন নিতে অস্বীকার করেছিল।
ফজলুল কাদেরের একটি বাক্য আমার নোটে দাগ দিয়ে রেখেছি: ব্যক্তির ইচ্ছাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হবে।
দ্বিতীয় পর্বে হুমায়ুন কবিরকে নিয়ে যা লিখেছি, এই এক লাইনে তার পুরোটা ধরা আছে। একজন মানুষের সিদ্ধান্ত মালিকানার কাঠামোয় ঢুকে গেলে সেটি আর ব্যক্তির ইচ্ছা থাকে না, প্রতিষ্ঠানের চরিত্র হয়ে যায়।
তার আরেকটি পর্যবেক্ষণ অস্বস্তিকর, আর সে কারণেই জরুরি। আমাদের সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো এলাকাভিত্তিক মানসিকতায় চলে, ফলাফলভিত্তিক নয়। দক্ষিণ কোরিয়া সমন্বিতভাবে এই জায়গাটা বদলেছিল বলেই তাদের অর্থনীতি বিস্ফোরিত হয়েছে। আর একটি তুলনা তিনি টানলেন, যেটি আমাদের আত্মবিশ্বাসের জন্য কাজে লাগে। বিদেশি ব্যাংকগুলো এখানে এসে শাখা খুলে কাজ করে, আর আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলো আফ্রিকার নানা দেশে হাজার হাজার শাখা চালায়। সুপ্ত চাহিদাকে প্রকৃত চাহিদায় রূপ দেওয়া, আর সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করা, এই দুটোই তাদের কাজ।
সস্তার বদলে মূল্য
রেনাটার এমডি ও সিইও সৈয়দ এস কায়সার কবির উদ্ভাবনের প্রশ্নটি ধরলেন একেবারে ব্যবসার জায়গা থেকে। রেনাটা এখন প্রায় ১০০টি বায়ো-ইকুইভ্যালেন্ট পণ্য তৈরি করে, আর গবেষণায় কাজ করেন ২০০ জন গবেষক, যাদের বয়স ২২ থেকে ৩০-এর ঘরে। বায়ো-ইকুইভ্যালেন্স প্রমাণ করতে পারলে রপ্তানির শর্ত পূরণ করা যায়। সে লক্ষ্যে গবেষণা বাড়াতে তারা অস্ট্রেলিয়া আর যুক্তরাজ্য থেকে বিশেষজ্ঞ যুক্ত করেছেন।
তার কৌশলটি এক বাক্যে এই: সস্তার প্রতিযোগিতা থেকে সরে এসে গবেষণার মাধ্যমে মূল্যসংযোজিত পণ্যের দিকে যাওয়া, আর সেটি বিশ্ববাজারের জন্যই। সঙ্গে একটি নীতিগত মতও দিলেন, দাম নিয়ন্ত্রণের বদলে কোম্পানিগুলোকে যুক্তিসঙ্গত মুনাফা করতে দেয়া উচিত।
এই তর্কটা আমার নিজের কাজের ঠিক মাঝখানে। পাট আর হস্তশিল্পে আমরা বহু বছর সস্তার প্রতিযোগিতায় দাঁড়িয়ে আছি। কম দামে বেশি ইউনিট, তারপর আরেকটু কম দামে আরও বেশি ইউনিট। এই দৌড়ে কারিগরের আয় বাড়ে না, বাড়ে কেবল চাপ। রেনাটা ওষুধে যা করেছে, নকশা, গবেষণা আর মানের ভিত্তিতে দাম নির্ধারণ, আমাদের কারুপণ্যেও সেটিই করার কথা। ASIX-এ চৌদ্দশ'র বেশি নারী কারিগরের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে বারবার দেখেছি, একই হাত, একই সময় আর একই দক্ষতা দিয়ে তৈরি পণ্যের দাম দ্বিগুণ হতে পারে, যদি নকশা আর গল্পটা ঠিক থাকে। পার্থক্যটা কারিগরের নয়, আমাদের কৌশলের।
শেষ কথা
সিম্পোজিয়াম শেষে অতিথিদের হাতে একটি ছোট উপহার দেওয়া হয়েছিল। কাচের বয়ামে বন্ধ একটুকরো সবুজ, টেরারিয়াম। ভেতরে শ্যাওলা, মাটি আর সামান্য জল। বয়ামটি বন্ধ, তবু ভেতরের জীবন চলতে থাকে। গাছ যা ছাড়ে মাটি তা ফিরিয়ে নেয়, জল বাষ্প হয়ে আবার ফিরে আসে। বাইরে থেকে কিছু ঢালতে হয় না।
উপহারটি হাতে নিয়ে মনে হলো, সারাদিনের আলোচনার সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত সারাংশ সম্ভবত এটিই। রেনাটা আর সাজিদার সম্পর্কটাও ঠিক এমন একটি বদ্ধ চক্র। মুনাফা বেরিয়ে যায় না, ফিরে আসে সমাজের কাজে, আর সেই কাজ থেকেই প্রতিষ্ঠানের বৈধতা তৈরি হয়।
কৌশিক বসু বলেছিলেন, প্রিজনার্স ডিলেমার ফাঁদ থেকে বেরোতে শুধু ব্যক্তির সদিচ্ছা যথেষ্ট নয়, দরকার যৌথ নৈতিক এজেন্ডা। এই তিন পর্বে যা যা শুনেছি, তার সবটাই সেই এজেন্ডার টুকরো। পরিমাপ বদলানো, মালিকানার প্রশ্ন তোলা, প্রশ্ন করার সাহস তৈরি করা, আর যা কাজ করছে না তা স্বীকার করে শেখা।
ব্যবসায়ী, নীতিনির্ধারক, উন্নয়নকর্মী, আমাদের প্রত্যেকের হাতে নিজের একটা ছোট জিডিপি আছে। প্রশ্ন দুটো। তার কতটা আমরা কাঁটাতারে খরচ করছি, আর বাকিটা দিয়ে কী বানাচ্ছি।
আসিফ ইকবাল, প্রতিষ্ঠাতা, অ্যাচিভ কনসাল্টিং; সহপ্রতিষ্ঠাতা, ASIX বাংলাদেশ; খণ্ডকালীন শিক্ষক, আইবিএ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং গীতিকবি



