Friday, June 05, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

নববর্ষের আয়োজন ও সামাজিক দ্বন্দ্ব

বাঙ্গালি উৎসব প্রিয় এক জাতি, তারা যেকোনো উপলক্ষ পেলেই উদযাপন করতে পছন্দ করে

আপডেট : ১৪ এপ্রিল ২০২৩, ০৭:০১ পিএম

আজ পহেলা বৈশাখ। বাংলা বর্ষ-পঞ্জিকার প্রথম দিন। একটি বছর বিদায় নিয়ে আরেক বছরে পদার্পণ করলো আমাদের জীবন। এই সময়ে অনেকেই হিসাব-নিকাস করছেন, এক বছরের পাওয়া না পাওয়া নিয়ে। আবার কেউ কেউ বর্ষবরণ নিয়ে উচ্ছ্বসিত।

বাঙ্গালি উৎসব প্রিয় এক জাতি। তারা যেকোনো উপলক্ষ পেলেই উদযাপন করতে পছন্দ করে। হোক তা ধর্মীয়, কিংবা ভিন্ন কিছু। ফলে আমরা দেখি সব ধরণের ঝক্কি-ঝামেলা কাঁধে নিয়ে দুই ঈদে মানুষ ঘরে ফেরে। আবার হিন্দুরাও বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনা নিয়ে তাদের পূজা-পার্বণ, বিশেষত দুর্গা পূজা উদযাপন করে। এর বাইরে পহেলা বৈশাখ দীর্ঘদিন ধরেই ভিন্ন এক আমেজ নিয়ে উদযাপিত হচ্ছে। অপরদিকে শহুরে মধ্যবিত্তরা উদযাপন করে থার্টি ফার্স্ট নাইট। এর বাইরে ফুটবল বিশ্বকাপ বা ক্রিকেট বিশ্বকাপের মতো ইভেন্টে এদেশের হৈচৈ প্রিয় মানুষের লম্ফ-ঝম্প দেখলে মনে হতে পারে, বাংলাদেশ বুঝি এবারের আসরের বিশ্ব সেরার মুকুট পরতে যাচ্ছে।

সব উৎসব-পার্বণে আনন্দ-উল্লাসের ধরণ অভিন্ন হলেও উদযাপনের ধরণ মোটেও একই রকম নয়। মুসলমানদের ঈদের কথাই ধরুন। এখানে উদযাপন শুরু হয় ঈদগাহে সবাই মিলে আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে। পুরো আয়োজনে বিপুল আনন্দ-উচ্ছ্বাস থাকলেও সব কাজের মধ্যে এই সুর থাকে যে, আমরা এক আল্লাহর বান্দা। তার শুকরিয়া আদায় ও গুণকীর্তনের মধ্যেই বান্দার প্রকৃত আনন্দ।

অপরদিকে হিন্দু-সম্প্রদায়ের পূজা-পার্বণে ঢাক-ঢোল বাদ্য-বাজনা পুরো আয়োজনে এক ভিন্ন ধরণের আমেজ তৈরি করে। থার্টি ফার্স্ট নাইট বা পহেলা বৈশাখ উদযাপনেও হৈ-হুল্লোড় আনন্দ-উল্লাস একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান, কিন্তু উদযাপনের ধরণ মোটেই ঈদ কিংবা পূজার মতো নয়।

আবার পহেলা বৈশাখ উদযাপনে শহর ও গ্রামের আয়োজনেও ভিন্নতা আছে। গ্রামে-গঞ্জে অনেক জায়গায় এ উপলক্ষে মেলা বসে। সেখানে নানা খেলাধুলার আয়োজন হয়। সেই সাথে হরেক রকম জিনিসপত্রের বিকিকিনি চলে। কোথাও কোথাও দিন শেষে নাচ-গানের আসরও বসে। শহরাঞ্চলে পান্তা-ইলিশ আর মঙ্গল শোভাযাত্রার মধ্য দিয়ে পহেলা বৈশাখ উদযাপন একটি নতুন সংযোজন যার ইতিহাস খুব বেশি আগের নয়।

গাঁও গেরামের আবহমান আয়োজন যেখানে নিরেট আনন্দের আসর, সেখানে হাল আমলের শহুরে আয়োজনে এটাকে একটি সাংস্কৃতিক আদল দেয়ার বিশেষ প্রয়াস লক্ষ্য করা যায়।

এদেশের মানুষ মোটা দাগে হুল্লোড় প্রিয় হলেও এদের একটি বড় অংশের জীবনে ধর্মের উল্লেখযোগ্য প্রভাব রয়েছে।

এদের অনেকেই খুব নিষ্ঠার সাথে ধর্ম পালন করেন না, কিন্তু তাদের সামগ্রিক জীবনাচারে ধর্মের সুস্পষ্ট প্রভাব দেখতে পাবেন। অনেকেই হয়তো নিয়মিত নামাজ পড়েন না, কিন্তু অন্তত জুমার জামাতে শরিক হওয়ার চেষ্টা করেন। রমজান এলে দেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠী নিষ্ঠার সাথে সিয়াম সাধনা করেন, এমনকি যারা নিয়মিত নামাজ পড়েন না তারাও। সামষ্টিকভাবে দিনে রোজা ও রাতে তারাবি পালনের মধ্য দিয়ে দেশ জুড়ে এক অনন্য সাধারণ ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের সৃষ্টি হয়। এ সময়ে আবার আর্থিকভাবে সচ্ছল মুসলমানদের মধ্যে বাৎসরিক যাকাত ও ঈদ উপলক্ষে সদকায়ে ফিতর আদায়ের বিশেষ তৎপরতা দেখা যায়। একইভাবে এদেশে কমবেশি সব মুসলিমের মনেই জীবনে অন্তত একবার হজ পালনের ইচ্ছা থাকে।

নামাজ, রোজা, যাকাত ও হজের এই আচার-আয়োজন এ দেশের সামগ্রিক মুসলিম জীবনে যে গভীর প্রভাব ফেলে, তা একটু গভীরভাবে নজর দিলেই দেখা যায়। এ দেশে ধার্মিক মানুষদের বিশেষ সম্মানের দৃষ্টিতে দেখা হয়। সমাজ এ ধরণের লোকদের আদর্শ স্থানীয় মনে করে। যারা খুব একটা ধর্মনিষ্ঠ নন তাদের মনেও ধর্ম পালনের তাগিদ কাজ করে। সাধারণভাবে বলা চলে, ধর্ম ও ধার্মিকতা এখানে পুরো সমাজের জীবনাচরণ ও কৃষ্টি-কালচারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হিসেবে কাজ করে।

এদেশের আনাচে-কানাচে গড়ে উঠা বিপুল সংখ্যক মসজিদ-মাদ্রাসা ও এসবকে কেন্দ্র করে যুগ যুগ ধরে আলেম ওলামাদের দাওয়াত ও তাবলীগ জনমানসে ধর্মের এই গভীর প্রভাব তৈরিতে মূল ভূমিকা পালন করেছে।

জীবনাচারে ধর্মের এই গভীর প্রভাবের কারণে পহেলা বৈশাখ কিংবা থার্টি ফার্স্ট নাইট পালনের ডাক এলেই অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে, এ অনুষ্ঠান ধর্মীয় বিশ্বাস ও কৃষ্টি-কালচারের সাথে সাংঘর্ষিক নয় তো? এসব প্রশ্নের জবাব তারা আলেম ওলামাদের বিচার-বিশ্লেষণের সঙ্গে মিলিয়ে নিতে চায়।

একটি জনগোষ্ঠী যখন নতুন কোনো ধর্ম, মতবাদ কিংবা সংস্কৃতিতে দীক্ষা নেয়, তার এতো দিনকার আচরিত কৃষ্টি-কালচারে অবধারিতভাবেই পরিবর্তন আসে। এটা নিয়ে স্বভাবতই কিছু অস্থিরতা ও টানাপোড়েনের সৃষ্টি হয়। এই টানাপোড়েন দীর্ঘ দিন ধরে চলতে পারে। যা সময়ের পরিক্রমায় সমাজ ধীরে ধীরে অভিযোজন করে।

ঐতিহ্যবাদীরা নানা কায়দায় তাদের পুরনো ঐতিহ্য সংরক্ষণের প্রয়াস পায়। আর পরিবর্তন প্রত্যাশীরা নতুনকে আলিঙ্গন করে এগিয়ে যেতে চায়। মানব সমাজে এটি একটি স্বাভাবিক ও চলমান প্রক্রিয়া। এখানে বিশেষ কায়দাকানুন করে জনমানসকে প্রভাবিত করার চেষ্টা কতটা ফলদায়ক হবে তা বলা মুশকিল। এ ধরণের প্রচেষ্টায় বরং প্রতিক্রিয়া হয়ে উল্টো ফল ফলা অস্বাভাবিক নয়। এমনও তো হতে পারে যে, আপনি যেটা ঠেকাতে চাচ্ছেন সেটাই উল্টো আগ্রাসীভাবে ফিরে এসে আপনাকে আচ্ছন্ন করে ফেলছে।

সবাইকে নববর্ষের শুভেচ্ছা!


ড. মুহম্মদ দিদারে আলম মুহসিন

লেখক- অধ্যাপক ও সভাপতি, ফার্মেসী বিভাগ

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।


প্রকাশিত নিবন্ধ লেখকের ব্যক্তিগত মতামত। ঢাকা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ এর জন্য দায়ী নয়।

   

About

Popular Links

x