Thursday, May 23, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

বৈশাখের জন্যই বাঁচা

নতুন বছর সব জাতিই বরণ করে অনন্য উদযাপনে। কিন্তু বাঙালির বরণ অনেকের চেয়ে ভিন্ন। চলে যাওয়া বছরের শেষ দিন থেকে উৎসবের শুরু। চৈত্র সংক্রান্তি নামে শুরু হয়ে গতি প্রাপ্ত হয়ে চলে তা বৈশাখের প্রথম দিনে

আপডেট : ১৪ এপ্রিল ২০২২, ১২:০৪ এএম

“এ পর্যন্ত যত কিছু উদ্ভাবন করা হয়েছে, এর মধ্যে জীবনই সর্বশ্রেষ্ঠ।”

:গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ


প্রবীণ বটবৃক্ষের নাম গোপাল মুখার্জি। জনপদের মানুষের অন্তরঙ্গতায় তিনি পরিচিত “গোপাল মুহুইজ্জা” নামে। বরিশালের কীর্তনখোলা পাড়ের রঙ্গশ্রী ইউনিয়নের জমজমাট বোয়ালিয়া বাজারে গোপালের মিষ্টির দোকান। “গৌরনদী মিষ্টান্ন ভাণ্ডার” নাম এর। ব্যবসা এখন গোপালের ছেলেরাই দেখে। সর্বশেষ বিশ্বযুদ্ধের কিছু পরে জন্ম নেওয়া মানুষের শরীরে আর কত সয়! গোপাল বাড়ি থাকেন অধিকাংশ সময়। কালেভদ্রে দেখে যান নিজের সৃষ্টি ব্যবসা কেন্দ্র।

কিন্তু এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহ থেকেই গোপালের উপস্থিতি নজরে আসে মিষ্টির দোকানে। জীবন্ত উৎসবের ডাকে তার ব্যস্ততার শেষ নেই। হালখাতার আয়োজন নিয়ে গোপাল সক্রিয়। তার তারুণ্যের একটি অনুষঙ্গ এখন অনুপস্থিত। “আগে হইতে ঘোড় দৌড়. . . . .গুড়া গাড়ায় মজা পাইতে দেইখ্যা।”

গোপালের জ্বলজ্বলে চোখে রেসকোর্সের হুল্লোড় সনাক্ত হয়। বৈশাখ আসছে . . . .

সূর্যের উপর নির্ভর করে সৌর ক্যালেন্ডারের চল ছিল বাংলা অঞ্চলে। এ বৈদিক বর্ষপঞ্জির প্রচলন ছিল সম্রাট অশোকের আমল থেকেই। অনুসরিত হচ্ছিল তা বাংলা, বিহার, উড়িষ্যা, আসাম অঞ্চলে। মুসলিম শাসন আমলে তা বদলে যায়। এ বর্ষপঞ্জির বদলে তখন থেকে অনুসরিত হয় হিজরি ক্যালেন্ডার। সাড়া জাগানো মোঘল অধিপতি আকবরের শাসনামলে এর সীমাবদ্ধতা গোচরে আসে। রাজস্ব সংগ্রহ আধুনিক পর্যায়ে রূপদানের লক্ষ্যে আকবর একটি সামঞ্জস্যপূর্ণ বর্ষপঞ্জির প্রয়োজন অনুভব করেন। প্রাজ্ঞ পণ্ডিত ফতেউল্লাহ সিরাজের তত্ত্বাবধানে হিজরি ক্যালেন্ডার ও বৈদিক এর সমন্বয় করে প্রণয়ন করা হয় নতুন বাংলা বর্ষপঞ্জি। ১৫৮৪ সাল থেকে শুরু হলো নতুন বর্ষপঞ্জি বঙ্গাব্দের পথচলা।

রাজস্ব সংগ্রহ বলপ্রয়োগের সংস্কৃতির বাইরে একটু ভিন্ন মাত্রা পায়। রাজা প্রজায় একটি সৌহার্দ্য সম্পর্কের শুরু হয়। প্রজারা বছরের প্রথম দিনে খাজনা দিয়ে যায়। আর জমিদার তাদের আপ্যায়িত করেন মিষ্টি দিয়ে।

আশ্চর্য রকম প্রাকৃতিক সম্পদে পরিপূর্ণ। অধিবাসীদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ দক্ষ কারিগর। তাদের সৃষ্টিশীল পণ্যের সুনাম দুনিয়া জোড়া। উর্বর ভূমি। এর লোভেই যেন দুর্ভাগ্য আসে। বারবারই ঔপনিবেশিক শাসনে আক্রান্ত বাংলা অঞ্চল। কিন্তু এর দরিদ্র মানুষের মনোজগৎ বিস্ময় জাগানিয়া। কোনো ভবিষ্যৎ ভাবনায় জর্জরিত না হয়ে তারা আনন্দে মাতে অবিরাম। বাংলা অঞ্চল যেন এক উৎসবের পাড়া। প্রচলিত প্রবাদ অনুযায়ী, এখানে বারো মাসে তের পার্বণ। এ পার্বণ হতে পারে ধর্মীয় উদযাপনকে কেন্দ্র করে। কিংবা সামাজিক পারিবারিক কোনো উপলক্ষে। কিন্তু এর প্রধান বৈশিষ্ট্য সর্বজনীনতা। ধর্ম, বর্ণ, জাতি, গোত্র নির্বিশেষে বাঙালি পাগল উৎসবে। আর তার সব উৎসবের সেরা উৎসবটি এই বর্ষবরণ।

নতুন বছর সব জাতিই বরণ করে অনন্য উদযাপনে। কিন্তু বাঙালির বরণ অনেকের চেয়ে ভিন্ন। চলে যাওয়া বছরের শেষ দিন থেকে উৎসবের শুরু। চৈত্র সংক্রান্তি নামে শুরু হয়ে গতি প্রাপ্ত হয়ে চলে তা বৈশাখের প্রথম দিনে। দু’দিনের উৎসব। পুরনো বছর বিদায়ে শুরু আর নতুন বছর বছর বরণে শেষ।

শুধু বাঙালির নয়। শুধু সমতলের নয়। সর্বজনীন এই বর্ষবরণ। পাহাড় সেজে উঠছে বিজু বৈসাবির, সাংগ্রাইয়ের রঙে। পাহাড়ি ঝরায় ফুল ভাসিয়ে শুরু । প্রতিটি ক্ষুদ্র জাতি সত্ত্বার জন্য অনিবার্য এই উৎসব। একই সময়ে শুরু হওয়া এই বর্ষ বরণ মহোৎসব ছাড়া আর কী?

আজকে দিনে অনেক কিছু বদলেছে। কিন্তু উৎসব কাটেনি। কৃষিভিত্তিক সমাজ এখন নেই। কিন্তু সব পালন মনে করিয়ে দেয় কৃষিভিত্তিক সমাজের রেশ। মেলা ছাড়া তা হয় না। বৈশাখের উৎসবের কেন্দ্র বিন্দু এই মেলা। প্রতিটি উন্মুক্ত মাঠ এখন পরিচিত মেলা নামে। ভুলে যাওয়া লোকজ পণ্যও আছে। তা হাজির নাগরিক সকাশে। শুধু কী পণ্য? দৃশ্যমান সব ঐতিহ্য। পান্তা ইলিশ, বাতাস, হাওয়াই মিঠাই, নাগরদোলা... সব সব। মনের ভেতর গুণ-গুনিয়ে যায়, “আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম. . . . .।” আজকের মানুষ জানতে পারে কেমন ছিল আগের সময়। সাম্প্রতিক জীবন, উন্নয়নের অসারতাও একটু যেন কাঁটার মতো বিধে নাগরিকের বুকে।

কী হত তখন, যদি গ্রাহ্য হতো আমাদের উৎসব “হিন্দুয়ানী” নামে? রবীন্দ্রনাথ যদি বন্দি থাকতেন সেন্সরশিপে ?

আমরা আসলেই বড় থেকে তুচ্ছাতি তুচ্ছ বিষয়ের জন্য যুদ্ধ করতে পারি। সে যুদ্ধে আবার জিতেও আসতে পারি। কারণ আমরা জানি- কোনো কিছুই বিচ্ছিন্ন না। আর পুরোটা মিলেই আমরা। রমনার বটমূল ছায়ানটের দূরদৃষ্টিতে কেন্দ্র হয়ে থাকে জাতিসত্তার। গ্রেনেডের শব্দ ভেসে যায়। কানে আসে শুধু একত্রিত সুর . . . . এসো . . . .এসো . . .। আমার সুরের সাথে তোমার সুর মেলাও।

নতুন হাওয়া লাগানো বারণ নয় এখানে। অনেক নতুন কিছু যুক্ত হয়েছে ইদানিংয়ের বর্ষবরণ উৎসবে। বিদেশি পোশাকের পরিবর্তে দেশিয় বুটিক শিল্প এখন উড়ন্ত। লাল পেড়ে সাদায় তারা মুখরিত। টার্ন ওভারে ঈদের সঙ্গে পাল্লা দিচ্ছে এখন বৈশাখী সেল।

কোনো বিপণন চলে না এখন বৈশাখ ছাড়া। সব কিছুর ভেতর থাকবেই “বৈশাখী অফার”। রবীন্দ্র ছাড়া চলে বাঁচা যায় না। রবীন্দ্র সঙ্গীতের সাথে নতুন মাত্রা হয়ে এখন আছে সবখানের “ওপেন ইয়ার কনসার্ট”। শূন্য স্থান পূরণ করা বৈশাখী মেলায় এখন আকর্ষিত হয় বেশি প্লাস্টিক পণ্য।

দুরবস্থা কোনো নিয়তি নয়। কেন তাকে বয়ে বেড়াতে হবে অহর্নিশ? পুরনো বছর ফেলে সামনে এগুনোর মূল ডাক এই। এ উপলক্ষে নতুন ভাবে উদ্দীপ্ত হওয়া। অনবদ্য আগামীর উদযাপন ছাড়া আর কিছু মাথায় রাখা ভুল। এখনই স্থলাভিষিক্ত হচ্ছে গ্রীষ্ম। যার বৈশাখ সব্বাইকে বাঁচতে শেখায়।


লেখক, ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক ও স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাতা হাসান শাওনের জন্ম, বেড়ে ওঠা রাজধানীর মিরপুরে। পড়াশোনা করেছেন মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয়, সরকারি বাঙলা কলেজ, বাংলাদেশ সিনেমা ও টেলিভিশন ইনিস্টিটিউটে। ২০০৫ সাল থেকে তিনি লেখালেখি ও সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত। কাজ করেছেন সমকাল, বণিক বার্তা, ক্যানভাস ম্যাগাজিন ও আজকের পত্রিকায়।

২০২০ সালের ১৩ নভেম্বর হাসান শাওনের প্রথম বই “হুমায়ূনকে নিয়ে” প্রকাশিত হয়।


প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্ত ব্যক্তিগত। ঢাকা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ এর জন্য দায়ী নয়।



About

Popular Links