Wednesday, July 22, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

রেলসেবার মান বাড়াতে প্রয়োজন জনবল ও জবাবদিহিতা

ব্রিটিশ-ভারত থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত রেলওয়ে নেটওয়ার্ক বর্তমানে বর্ধিত চাহিদা মেটাতে সক্ষম হচ্ছে না

আপডেট : ০২ মে ২০২৪, ১১:১৫ এএম

দেশের যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে রেল যোগাযোগ ব্যবস্থার ভূমিকা অপরিসীম। পৃথিবীর জনবহুল দেশগুলোতে রেলপথ গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। তেমনি বাংলাদেশেও উৎসবসহ যেকোনো প্রয়োজনে সাধারণ জনগণের প্রথম পছন্দ ট্রেন। ফলে আমরা দেখতে পাই ঈদের সময় ট্রেনে উপচেপড়া ভিড়। কিন্তু বছরের পর বছর লোকসানি খাত হিসাবে সর্বত্র বিবেচিত হচ্ছে।

বাংলাদেশ রেলওয়ে একটি জাতীয় প্রতিষ্ঠান। ১৮৬২ সালের ১৫ নভেম্বর দর্শনা-জগতি স্টেশনের মধ্যে তদানীন্তন ইস্ট বেঙ্গল রেলওয়ের ট্রেন চলাচলের মাধ্যমে দেশে রেলযাত্রার শুরু। স্বাধীনতার ৫০ বছরে দেশে অনেক খাতের উন্নয়ন ঘটলেও এ খাতটির উন্নতি হচ্ছে অনেক ধীরগতিতে। অথচ বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে নিম্ন ও মধ্য আয়ের মানুষের যাতায়াত ব্যবস্থার জন্য এই ট্রেনই প্রথম পছন্দ। 
যোগাযোগব্যবস্থার মধ্যে রেল সবচেয়ে সম্ভাবনাময় খাত হলেও এটি অন্য খাতের তুলনায় পিছিয়ে আছে বহু দিক থেকেই। 

বাংলাদেশের রেলওয়ে খাতের পিছিয়ে থাকার কারণ হিসেবে অনেকেই দুর্নীতিকে দায়ী করলেও এর পেছনে আছে যথাযথ দেখাশোনার অভাব। আর তাই বাংলাদেশ সরকার ২০১১ সালে পৃথক রেলপথ মন্ত্রণালয় গঠন এবং প্রতি বছর এর উন্নয়নে বিপুল বরাদ্দ দিচ্ছে। তবে এর অধিকাংশই অবকাঠামোগত প্রকল্প। এসব প্রকল্পের মধ্যে সব থেকে অধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে রেলওয়ে নেটওয়ার্কিংয়ে। ব্রিটিশ-ভারত থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত রেলওয়ে নেটওয়ার্ক বর্তমানে বর্ধিত চাহিদা মেটাতে সক্ষম হচ্ছে না। বর্তমান প্রেক্ষাপট অনুযায়ী রাজধানীমুখী রেলওয়ে নেটওয়ার্ক পরিবর্তন, চট্টগ্রাম বন্দর ও গুরুত্বপূর্ণ শহরের মধ্যে বিদ্যমান দূরত্ব কমানো এবং রেলওয়ে নেটওয়ার্কের বহির্ভূত জেলাগুলোকে নেটওয়ার্কভুক্ত করতে বিভিন্ন প্রকল্প নিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। 

দোহাজারী থেকে রামু হয়ে কক্সবাজার এবং রামু থেকে মিয়ানমারের নিকটবর্তী ঘুমধুম পর্যন্ত রেল সংযোগ, খুলনা-মোংলা রেল সংযোগ, খুলনা-দর্শনা ডবল লাইন নির্মাণ ইত্যাদি চলমান প্রকল্পগুলোর মাধ্যমে রেলওয়ের বিদ্যমান নেটওয়ার্ক বর্ধিতকরণ/পুনরায় চালু হচ্ছে। বাংলাদেশ সরকার সপ্তম-পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার অধীনে কয়েকটি মেগা প্রকল্প যেমন- পদ্মা সেতু রেল সংযোগ, দোহাজারী-কক্সবাজার রুট ইত্যাদি বাস্তবায়ন করেছে। সরকার বিভিন্ন মেয়াদে সব জেলা ও গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোয় রেলপথ সংযোগের লক্ষ্যে ৩০ বছর মেয়াদী (২০১৬-৪৫) মাস্টারপ্ল্যান গ্রহণ করেছে।

এছাড়া বর্তমানে টঙ্গী-জয়দেবপুর, আখাউড়া থেকে লাকসাম পর্যন্ত ডুয়েলগেজ ডবল রেললাইন, খুলনা-দর্শনা জংশন সেকশনে ডবল লাইন নির্মাণ প্রকল্প চলমান। যমুনা নদীর ওপর বিদ্যমান বঙ্গবন্ধু সেতুর সমান্তরালে ডুয়াল গেজ ডাবল ট্র্যাকসম্পন্ন ‘‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব রেলওয়ে সেতু’’ নির্মাণ শীর্ষক প্রকল্প  দৃশ্যমান। 
এছাড়া চীন ভারত ও ইন্দোনেশিয়া থেকে কোচ ও লোকো কেনা হচ্ছে।

এসব পদক্ষেপে রেলসেবার মান উন্নীত হলেও কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে উন্নীত হতে এখনো পিছিয়ে আছে। এর কারণ দক্ষ জনবল ও যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাব। রেলওয়েতে বর্তমানে ৪৭ হাজার ৬৩৭ জনবলের অনুমোদন রয়েছে কিন্তু কর্মরত প্রায় ২৫ হাজার। বাকি প্রায় ২২ হাজার পদ শূন্য। যার ফলশ্রুতিতে বাংলাদেশ রেলওয়ে বর্তমানে অপারেশনাল জনবল যেমন স্টেশন মাস্টার, লোকো মাস্টার (চালক), পোর্টার, লেভেল ক্রসিং গেটম্যান ইত্যাদি জনবল সংকটে রয়েছে। 

তাই ট্রেনের শিডিউল বিপর্যয়, সিগন্যালজনিত বারবার রেল দুর্ঘটনা, টিকিট কালোবাজারি, রেলের বগি অপরিষ্কার, স্টেশনের দুরাবস্থা, বাথরুমে পানি-আলো না থাকা, সিট ভাঙা, বিনা টিকেটের যাত্রীদের দৌরাত্ম্য, ক্যাটারিংয়ে নিম্ন মান ইত্যাদি কারণ দেখাশোনার জন্য পর্যাপ্ত জনবল না থাকায় সেবার মান বাড়ছে না। তাই রেলখাতের চাকরির সুযোগ-সুবিধা বাড়িয়ে খাত অনুসারে দক্ষ জনবল নিয়োগ এখন সময়ের দাবি।

দেশের রেলখাত পিছিয়ে থাকার একটি বড় কারণ টিকেট কালোবাজারি। দীর্ঘদিন সনাতন পদ্ধতিতে টিকেট বিক্রি হয়ে আসছিল। লম্বা লাইনে সারাদিন দাঁড়িয়েও অনেক সময় ট্রেনের টিকেট মেলে না। আবার ঈদ ও বিভিন্ন সরকারি ছুটির সময় টিকেট পাওয়া আরও কষ্টকর হয়ে ওঠে। বর্তমানে নতুন কোম্পানির কাছে অনলাইন টিকেট ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব দেওয়া হলে টিকিট বিক্রয়ের পুরো প্রক্রিয়া নতুন করে শুরু হয়। কালোবাজারি বন্ধে জাতীয় পরিচয়পত্র দিয়ে অনলাইন নিবন্ধন করে টিকিট ক্রয় করার নিয়ম চালু হয়। 

দেশে ট্রেনে ভ্রমণকারীদের অধিংকাশ মানুষের কাছে অনলাইন টিকেটিং প্রক্রিয়া জটিল। পাশাপাশি চেকিং যথাযথ না হওয়ায় কালোবাজারি এখনো বন্ধ করা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। প্রায়ই রেলওয়ের একশ্রেণির অসাধু কর্মী যাত্রীদের থেকে টাকার বিনিময়ে নামাজের জায়গা ,খাবারের কোচে অবৈধভাবে যাত্রীদের বসার সুযোগ করে দেয়। ফলে ট্রেনে স্ট্যান্ডিং টিকেট ব্যবস্থা থাকলেও তা থেকে কাঙ্ক্ষিত অর্থ রেল পাচ্ছে না।

এছাড়া আন্তঃনগর ট্রেনে খাবারের দাম ও মান নিয়ে যাত্রীদের প্রায়ই সময় নানা অভিযোগ থাকে। বাংলাদেশ রেলওয়ের সব আন্তঃনগর ট্রেনে যাত্রীদের মানসম্মত খাবার পরিবেশনের সুবিধার্থে ক্যাটারিং সার্ভিসে অভিন্ন খাদ্যমূল্য প্রণয়ন করে। বাস্তবিক ক্ষেত্রে অনেক সময় এর থেকে বেশি দামে খাবার বিক্রি হয়। এছাড়া খাবারের মান ভালো রাখার কার্যকরি কোনো ব্যবস্থা দেখা যায় না।

ট্রেনের নিরাপত্তা আরেকটি বড় ইস্যু। বাংলাদেশ রেলওয়ের নিজস্ব রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীসহ (আরএনবি) রেলওয়ে পুলিশ নিয়োজিত আছে এ কাজে। তবুও প্রায়ই যাত্রীরা  চুরি-ছিনতাইয়ের সম্মুখীন হন। ট্রেনে পাথর নিক্ষেপ আরেকটি ভয়ের কারণ। বিশেষ করে মফস্বল কিংবা গ্রামীণ স্টেশনগুলোতে এবং কমিউটার ও মেইল ট্রেনগুলোতে এই সমস্যা বেশি দেখা যায়। 

এছাড়া রেল লাইন, স্লিপার চুরি হয় প্রায়ই। ফলশ্রুতিতে ঘটে দুর্ঘটনা। তাই  এই নিরাপত্তার জন্য অধিক জনবল নিয়োগ দেওয়া জরুরি।

সরকার নতুন স্টেশন তৈরি এবং পুরোনো স্টেশন সংস্কার করলেও কিছু কিছু ক্ষেত্রে সিগন্যাল জটিলতায় ক্রসিংয়ে অনেক সময় নষ্ট হয়, যা একই সঙ্গে রেলওয়ের এবং যাত্রীসাধারণের সময়ের অপচয়। 

বর্তমানে বাংলাদেশ রেলওয়ে পূর্বাঞ্চল ও পশ্চিমাঞ্চলে বিভক্ত। প্রতি অঞ্চলে দুটি করে মোট চারটি পরিচালন বিভাগ রয়েছে। কিন্তু কেবল দুটি অঞ্চল দিয়ে পুরো দেশের নেটওয়ার্ক পরিচালনা কঠিন। তাই রেলওয়েকে আরও অঞ্চলে বিভক্ত করে  রেল নেটওয়ার্ককে আরও বিস্তার করা উচিত।

বাংলাদেশে রেলওয়ে প্রতিদিন তিন লাখ যাত্রী পরিবহন করতে সক্ষম। কিন্তু বাস্তবে এই সংখ্যা অনেক বেশি। বাংলাদেশের মতো জনবহুল দেশে গণপরিবহন হিসেবে রেলওয়ের গুরুত্ব অপরিসীম। অথচ দীর্ঘদিন রেলওয়ে সেক্টর অবহেলিত ছিল। 
বাংলাদেশ রেলওয়েকে একটি শক্তিশালী পরিবহন নেটওয়ার্ক হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে সরকার সচেষ্ট। এ লক্ষ্যে বহুমুখী পদক্ষেপ ও প্রকল্প নেওয়া হয়েছে এবং বাস্তবায়নের মাধ্যমে প্রত্যাশিত সমৃদ্ধ ও উন্নত বাংলাদেশ বিনির্মাণে রেলওয়ে নিরন্তর কাজ করে যাচ্ছে। কিন্তু যাত্রীসেবার মান উন্নয়নে তারা ব্যর্থ হচ্ছে।  নিরাপদ, সাশ্রয়ী, পরিবেশবান্ধব হওয়া সত্ত্বেও জনগণের মাঝে রেলভ্রমণের আগ্রহ আশানুরূপ বৃদ্ধি পাচ্ছে না। 

এ অবস্থার উত্তরণে রেলওয়ের উচিত যাত্রীসেবার মান বাড়াতে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নেওয়া জনবল বৃদ্ধি এবং যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা নেওয়া। পরিশেষে রেল ব্যবস্থাপনায় যাত্রীসেবায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে সবার আগে।

প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্ত ব্যক্তিগত। ঢাকা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ এর জন্য দায়ী নয়।
   

About

Popular Links

x