আমার কাছে মনে হয়, আমাদের দেশের গণতন্ত্রকে অর্থবহ, উপযোগী, এবং কার্যকরী করতে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় বিপ্লবী পরিবর্তন ছাড়া সম্ভব নয়। বইয়ের পাতায় এর সংশ্লিষ্ট সংজ্ঞা যাই থাকুক; গণ-কে বা প্রতিজনকে কেন্দ্রীয় হিসেবে গণ্য করতে বা মূল্য দিতে তার মতামত বা অভিপ্রায়কে বিবেচনা করতে এবং সে অনুযায়ী তার কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য করার যে ব্যবস্থা তাকেই আমরা গণতন্ত্র বুঝি। জবাবাদিহি ব্যবস্থা জন এবং গণের যত কাছাকাছি হবে শারীরিক এবং মানসিকভাবে ততোই কার্যকরী হবে।
অনেকের মতোই আমারও দ্বিধা আছে কোন স্তরকে আমরা স্থানীয় সরকারের ভিত্তি হিসেবে ধরলে এ ব্যবস্থাকে সবচেয়ে কার্যকরী করতে পারব তা নিয়ে। এটি আলোচনায় বা তর্কে সময়মতো ঠিক করা যাবে। কিন্তু অন্য অনেকের মতো আমারও অভিমত হলো; স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় প্রাণ, গতি বা ভিত্তিমূলে জড়িয়ে আছে গণতন্ত্রের প্রাণভোমরা।
আমার কাছে মনে হয়, উপজেলা এর কেন্দ্র হওয়া উচিত। জনসংখ্যা, সাধারণ মানুষের নৈকট্য এবং পারস্পরিক জানাশোনার গণ্ডি বিবেচনায় এবং ইতোমধ্যে উপজেলা পর্যায়ে রাষট্রের বিভিন্ন দপ্তরের প্রসার হয়েছে; সেসব বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে। প্রশ্ন হতে পারে ব্যবস্থাপনার এবং অতি অবশ্যই আমাদের বর্তমানে জারি থাকা সংসদীয় আসনের ভুগোল এবং সংসদ সদস্যের সাথে এর সম্পর্ক। আরও আছে এর সাথে জেলা পরিষদের সম্পর্ক বিন্যাস নিয়ে আলোচনা। এখানে এমনভাবে মতৈক্য হতে হবে যাতে স্থানীয় সরকার এবং আইনসভার এলাকার ভৌগলিক, প্রশাসনিক বা ক্ষমতাসীমা নিয়ে পক্ষগুলোর মধ্যে কোনো টানাপোড়ন না থাকে বা কোনো দ্বন্দ্ব সৃষ্টির সম্ভাবনা না থাকে। অনেক আলোচনা, তর্কবিতর্ক এবং বাস্তবসম্মত যুক্তি দিয়ে এ বিষয়ে সিদ্ধান্তে আসতে হবে। এমন হতে পারে, দেশের একেক অংশে এর সার্বিক এগ্রইকলজি বিবেচনা করে ওই এলাকার ভৌগলিক এবং প্রশাসনিক একক ঠিক করা যেতে পারে। উদহরণ হিসেবে বলা যায়, যেসব অঞ্চল নদী কিংবা হাওড়প্রধান সেখানে এগুলোর সীমানা সংশ্লিষ্ট স্থানীয় সরকার এককের সীমানা নির্ধারণে একটি বড় নির্ধারক ভূমিকা রাখতে পারে। এখানে নেতৃত্বের একটা সরল রেখা সবার সামনে পরিষ্কার থাকতে হবে। সবার জানা থাকবে সব সংস্থা একজন স্থানীয় নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির নেতৃত্বের কাছে রিপোর্ট করছে এবং সবাই তার নেতৃত্বে চলবে।
প্রচলিত অর্থে আমরা যে প্রশাসন বা প্রশাসক জানি; ইতিহাসের গভীর গণ্ডি থেকে এগুলোকে সমূলে বিচ্ছিন্ন করতে হবে। যে ভৌগলিক এককে আমরা আস্থা রাখি, উপজেলা বা জেলা, সেখানে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি থাকবে জবাবদিহিতার কেন্দ্রে। এবং এই স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিকে সার্বিক সাহায্য করবেন একদল নির্বাচিত পরিষদ সদস্য এবং প্রশাসনিকভাবে সাহায্য সহযোগিতা করবেন একদল কর্মকর্তা বা কর্মচারী। সকল সরকারী দপ্তরের কর্মচারীরা এই নির্বাচিত স্থানীয় সরকার প্রধানের অধীনে সার্বিকভাবে ন্যাস্ত থাকবেন এবং রিপোর্ট করবেন। সরকারের সকল দপ্তর বা বিভাগ স্থানীয় সরকারের মাধ্যমেই তাদের কর্মচারীদের সাথে কাজ করবেন। সকল সরকারি কর্মচারীকে স্থানীয় সরকারের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য থাকবে। এই কর্মচারীদের প্রশাশনিকভাবে সকল আর্থিক লেনদেন, পদোন্নতি ইত্যাদি স্থানীয় সরকারের কাছে বরাদ্দ এবং ন্যাস্ত করা হবে।
একইভাবে সকল নির্বাচিত প্রতিনিধি জনগণের কাছে জবাবদিহি করবে। এর সঠিক পদ্ধতি কী হবে তা আমাদের গভীরভাবে ভাবতে হবে। বাৎসরিকভাবে তাদের কাজের মূল্যায়ন করার একটা ব্যবস্থা থাকতে হবে। বাৎসরিকভাবে পরিকল্পনা প্রণয়ন করা, বাস্তবায়ন করা, কাজের ফিরিস্তি দেওয়া, ফান্ডের বরাদ্দ এবং ব্যবহার, আয় ব্যয়ের হিসাব ইত্যাদির একটা স্বচ্ছ ব্যবস্থা প্রতিস্টা এবং বাস্তবায়ন করা। জনপ্রতিনিধিরা তাদের পরিকল্পনা মত কাজ করতে না পারলে তাদের অভিশংসনের ব্যবস্থা থাকতে হবে যাতে তাদের প্রয়োজনে পদ থেকে সারানো যেতে পারে।
বেরিয়ে আসতে হবে প্রকল্প মানসিকতা থেকে। প্রকল্প থাকতে পারে নতুন কিছু উদ্ভাবনের জন্য প্রয়োজনীয় গবেষণা করার জন্য। বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে অনেক চিন্তা ভাবনা করে। সংশ্লিষ্ট কাজে আগ্রহী সকল দাতাসংস্থা সরকারের সাথে এবং পরিকল্পনামাফিক এসব ক্ষেত্রে অংশ নেবে। তাদের কোনো আলাদা প্রকল্পের দরকার নাই। তারা এমনভাবে প্রকল্পে অংশ নেবে যা সরকারের অগ্রাধিকার। কিন্তু দেশের উন্নয়নে কাজ করবে বড় বড় প্রোগ্রাম বা কর্মসূচি। প্রোগ্রামগুলো সাজানো হবে সারাদেশের জন্য, এলাকার প্রয়োজনে বা চাহিদার ওপর ভিত্তি করে এগুলোর ব্যয় বরাদ্দ হেরফের হতে পারে। নিজের এলাকার প্রকল্প বাস্তবায়নে জবাবদিহি করতে স্থানীয় সরকার। কোনো একক সরকারি দপ্তর নয়। স্থানীয় সরকার এগুলো বাস্তবায়ন করবে সংশ্লিষ্ট সরকারী দপ্তরর সাথে এবং জনগণের সর্বাত্মক অংশগ্রহণের মাধ্যমে। জবাবদিহিতা থাকবে জনগণের কাছে।
স্থানীয় সকল প্রতিষ্ঠান যেমন স্কুল, মাদ্রাসা, কলেজ বা অন্যান্য প্রতিষ্ঠান চলবে স্থানীয় জনগণের প্রতিনিধিত্তে পরিচালিত নির্বাচিত কমিটির মাধ্যমে। এখানে বাইরের কোনো নির্বাচিত বা অনির্বাচিত প্রতিনিধির বা সরকারি কর্মকর্তার দরকার নেই। প্রতিষ্ঠান পরিচালনা কমিটির মাধ্যমে আয় ব্যয় বা অন্যান্য কার্যক্রম পরিচালিত হবে। স্থানীয়ভাবে এ কমিটি বা প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। এসবের জন্য দরকার হবে যথার্থ নীতিমালা।
করতে হবে সকল অর্থেই বিকেন্দ্রীকরণ। বেশি বেশি গণতন্ত্র বা জনগণতন্ত্র এবং বিকেন্দ্রীকরণ হাত ধরাধরি করে চলতে পারতে হবে। সকল অর্থেই তা করতে পারতে হবে। সম্পদ সংগ্রহের ক্ষেত্রেও তাই। স্থানীয়ভাবে সংগৃহীত সম্পদ স্থানীয় কাজে লাগবে। সম্পদ সংগ্রহের খাতগুলো কেন্দ্রের সাথে নেগশিয়েট করতে হবে। একইভাবে সম্পদ বরাদ্দের কাজটিও করতে হবে অগ্রাধিকের ভিত্তিতে। যেখানে যেমন দরকার সেভাবে। আমাদের গণতন্ত্র গড়তে হবে ধীরে ধীরে। সময় লাগবে। কিন্তু লক্ষ্য থাকবে স্থির, ভুল করে করে, শুধরে, আরও বেশি গণতন্ত্রের দিকে।



