১৯৭২ সালের ১৩ অক্টোবর আন্দিজ পর্বতমালায় ঘটে ইতিহাসের ভয়াবহ এক বিমান দুর্ঘটনা। ওই দুর্ঘটনায় ঘটনাস্থলে প্রাণ হারান ২৯ জন। এরপর দুর্গম পাহাড়ে শুরু হয় বেঁচে থাকা ২৯ জনের অন্য এক লড়াই। উদ্ধার হওয়ার অপেক্ষায় থাকা ওইসব যাত্রীদের ১৩ জনের মৃত্যু হয় তুষারধসে। যদিও ততোদিনে পার হয়ে গেছে ঘটনার প্রায় তিন সপ্তাহ।
বেঁচে থাকা ১৬ যাত্রী ৭২ দিন পাহাড়ের খাঁজে আটকা পড়ে ছিলেন। খাবার ও পানি ছিল না। দুর্গম পাহাড়ে আটকা এসব যাত্রী বেঁচে থাকার জন্য “নরখাদক” হতে বাধ্য হন। বেঁচে থাকার জন্য মৃত সহযাত্রীদের মাংস আগুনে পুড়িয়ে খান তারা।
দুর্ঘটনার ৭২ দিন পর ওই বছরের ২৩ ডিসেম্বর ১৬ যাত্রীকে জীবিত উদ্ধার করা হয়।
দুর্ঘটনার শিকার সে চার্টার্ড উড়োজাহাজটি ছিল উরুগুয়ের বিমানবাহিনীর। একটি রাগবি দল তাদের পরিবার, বন্ধুদের নিয়ে উড়োজাহাজটি উরুগুয়ে থেকে চিলি যাচ্ছিল।
গত ১৩ অক্টোবর এ দুর্ঘটনার ৫০তম বার্ষিকীতে বেঁচে থাকা যাত্রীদের নিয়ে “মিরাক্যাল ইন দ্য আন্দিজ” শীর্ষক এক অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। সেখানে ভয়াবহ সেই ৭২ দিনের কথা স্মরণ করেন বেঁচে ফেরা যাত্রীরা। এক প্রতিবেদনে এ খবর জানায় যুক্তরাজ্যের সংবাদমাধ্যম ডেইলি মেইল।
অনুষ্ঠানে ওই যাত্রীরা জানান, বেঁচে থাকার জন্যই সহযাত্রীর মাংস খান তারা। এ নিয়ে তাদের অনুশোচনা নেই। প্রথমে তারা চামড়া ও ত্বক ঝলসিয়ে খান। এরপর খান মাংস ও মস্তিষ্ক।
ওই বিমান দুর্ঘটনায় বেঁচে ফেরা যাত্রীদের একজন রবার্তো কানেসা। সেই সময়ে উরুগুয়ের মন্টেভিডিও মেডিকেল কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র ছিলেন রবার্তো। “মিরাক্যাল ইন দ্য আন্দিজ” অনুষ্ঠানে রবার্তো জানান, প্রাণ যখন যায় যায় অবস্থা, তখন তিনিই প্রথম ভাঙা কাঁচ দিয়ে সহযাত্রীদের মাংস খুবলে তা ঝলসিয়ে খাওয়া শুরু করেন। তাকে দেখে বেঁচে থাকা অন্যরাও একইভাবে খেতে শুরু করেন।
রবার্তো বলেন, “আমাকে পরে সেসব সহযাত্রীর পরিবারের কাছে গিয়ে বিষয়টি ব্যাখ্যা করতে হয়েছিল।”
বাঁচার জন্য এমন কাজ করায় অনুশোচনা না থাকলেও রবার্তো জানান, ওই দিন তিনি যদি মারা যেতেন এবং অন্যরা যদি বাঁচার জন্য তার মাংস খেয়ে ফেলতেন, তবে তিনি এটিকে সম্মান হিসেবে বিবেচনা করতেন।
বেঁচে ফেরা যাত্রীদের একজন র্যামন সাবেললা। তিনি বলেন, “অবশ্যই মানুষের মাংস খাওয়ার এই ধারণা ছিল ভয়ানক ও ঘৃণ্য। বন্ধুদের মাংস মুখে তোলাও ছিল কঠিন। কিন্তু নিরুপায় আমরা সেটা করতে করতে একসময় অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিলাম। একটা দিক বিবেচনায় নিলে আমাদের বন্ধুরা ছিল বিশ্বে প্রথম, যারা নিজেদের অঙ্গদান করেছিল। জীবন–মৃত্যুর সে সন্ধিক্ষণে মাংস খাওয়ার সুযোগ করে দিয়ে বেঁচে থাকতে সাহায্য করেছিল।”
তারা জানান, দুর্ঘটনার ১০ দিনের মাথায় রেডিওর মাধ্যমে জানতে পারেন, তাদের উদ্ধারে যে অভিযান শুরু হয়েছিল, তা প্রতিকূল পরিস্থিতির জন্য তা বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
১৯৭২ সালের ২২ ডিসেম্বর একটি হেলিকপ্টারে করে উদ্ধারকারী একটি দল দুর্ঘটনাস্থল পৌঁছান। পরদিন ১৬ যাত্রীকে উদ্ধার করেন তারা। এ ঘটনা নিয়ে পিয়ের্স পল নামে এক লেখক “অ্যালাইভ: দ্য স্টোরি অব আন্দিজ সারভাইভার্স” নামে বই লেখেন । ১৯৯৩ সালে এ ঘটনা নিয়ে হলিউডে একটি চলচ্চিত্রও মুক্তি পায়।



