Saturday, November 07, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

দেবতা ভেবে ডাইনোসরের ডিমের পূজা করছিল ভারতের এক গ্রামের মানুষ

দীর্ঘকাল ধরে বংশপরম্পরায় চলছিল এই পূজা

আপডেট : ২১ ডিসেম্বর ২০২৩, ১০:৪৬ এএম

ঐতিহাসিক পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে বিখ্যাত ভারতের মধ্য প্রদেশের ধার জেলা। এই জেলারই একটি গ্রাম “পাড়ল্যা”। গ্রামের বাসিন্দাদের কুলদেবতা “কাকর ভৈরব”। ভীল সম্প্রদায়ের গ্রামবাসীরা বংশপরম্পরায় কাকর ভৈরবের পুজো করে আসছেন দীর্ঘকাল ধরে। এক প্রতিবেদনে এ খবর জানিয়েছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি বাংলা।

তাদের বিশ্বাস শিলাকৃতির কাকর (যার অর্থ জমির সীমানা) ভৈরব (ঈশ্বর) জমি ও গবাদি পশুর রক্ষা করেন এবং দুর্দশা নির্মূল করেন।

কিন্তু তাদের ধারণাই ছিল না, যে গোলাকৃতি শিলাটি তারা নিজেদের চাষাবাদের জমির সীমানায় রেখে পূজা করছেন, সেটা আসলে ডাইনোসরের ডিমের জীবাশ্ম!পাড়ল্যার বাসিন্দা ভেস্তা মান্দোলাই বিবিসি বাংলাকে বলেন, “কিছুদিন আগে পর্যন্ত আমরা জানতামই না, ওই শিলা আসলে ডাইনোসরের ডিমের জীবাশ্ম। কত বছর ধরে আমারা কাকর ভৈরবের পুজো করে আসছি তার ইয়ত্তা নেই।"

তিনি জানান, আশপাশের অঞ্চলের কোথাও কোথাও কাকর ভৈরবকে ভিলেট বাবা বলেও পূজা করা হয়।

যেভাবে জানা গেল

নর্মদা ভ্যালি অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে খননকার্য হয়েছে। বিভিন্ন সময়ে ডাইনোসরের নেস্টিং সাইট, নেস্ট, ডিমের জীবাশ্ম, হাঙরের দাঁতের জীবাশ্মসহ আরও অনেক কিছু উদ্ধার করেছেন জীবাশ্ম বিশেষজ্ঞরা।

তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন বিশাল ভার্মা যিনি পেশায় পদার্থবিদ্যার শিক্ষক। এ পর্যন্ত তিনি ২৫৬টি ডাইনোসরের ডিম উদ্ধার করেছেন।

বিশাল ও তার মতো অন্যান্য জীবাশ্ম বিশেষজ্ঞদের নিরলস চেষ্টায় ওই অঞ্চলের প্রত্নতাত্ত্বিক ও ভূতত্ত্বগত গুরুত্ব সম্পর্কে মানুষ জেনেছে। পাড়ল্যা ও সংলগ্ন অঞ্চল থেকে উদ্ধার করা জীবাশ্ম হতবাক করেছে ভেস্তা-সহ ভীল সম্প্রদায়ের অনেককেই।

তারা জেনেছেন, গোলাকার শিলা যাকে বংশপরম্পরায় পুজো করা হয়, সেটা আসলে টাইট্যানো-স্টর্ক প্রজাতির ডাইনোসরের ডিম!

কয়েক দিন আগে বীরবল সাহনি ইনস্টিটিউট অফ প্যালিওসায়েন্সস-এর (বি‌এসআইপি) বিশেষজ্ঞদের একটি দল ধার জেলা পরিদর্শনে যান। উদ্দেশ্য ছিল ওই অঞ্চল থেকে উদ্ধার হওয়া ফসিল ও অন্যান্য প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলির সংরক্ষণ।

একইসঙ্গে ইউনেস্কো-র কাছে ধার জেলাকে “গ্লোবাল জিও পার্ক” হিসেবে চিহ্নিত করার প্রস্তাব পেশ করাও ছিল তাদের লক্ষ্য।

সে সময় বি‌এসআইপি-র ওই দলে ছিলেন ওই প্রতিষ্ঠানের ডিরেক্টর ড. মহেশ জি ঠক্কর, ড. শিল্পা পাণ্ডে, মধ্য প্রদেশ ইকো ট্যুরিজম বোর্ড-এর সিইও শমিতা রজৌরা, বন দপ্তরের আধিকারিক অন্যান্য সরকারি কর্মকর্তা এবং বিশাল ভার্মা।

এ বিষয়ে শিল্পা পান্ডে বিবিসি বাংলাকে বলেন, “বীরবল সাহনি ইনস্টিটিউট অফ প্যালিওসায়েন্সেস-এর সেন্টার ফর প্রোমশন অফ জিও হেরিটেজ অ্যান্ড জিওট্যুরিজম প্যালিওসায়েন্টিস্ট-এর তরফে আমরা ধার ও সংলগ্ন অংশে গিয়েছিলাম এই মাসে। এর আগে ২৫৬টি ডাইনোসরের ডিম পাওয়া গিয়েছে যা নথিভুক্তও করা হয়ে গিয়েছে।"

তিনি আরও বলেন, "মধ্যপ্রদেশের মনাবরের কাছে একাধিক জায়গা আছে, যেমন আখড়, কন্যাপুর ইত্যাদি যেখানে ওই নেস্টিং সাইট পাওয়া গিয়েছে। আমরা জানতে পারি গত জুন মাসে পর্যন্ত ধার অঞ্চলে ২০টি নতুন নেস্ট-এর খোঁজও মিলেছে।”

তিনি বলেন, “এখানে বংশপরম্পরায় এই পূজা হয়ে আসছে। দীপাবলির সময়, এখানকার মানুষেরা তাদের জমির একটা অংশে কাকর ভৈরব প্রতিষ্ঠা করে সন্তানসম্ভবা গবাদি পশুদের ওই শিলার ওপর দিয়ে লাফ দিয়ে পার হতে বলেন। তাদের বিশ্বাস এতে সন্তানসম্ভবা পশুটার আগত শিশুরা সুস্থ হবে, ফলে মালিকের ভবিষ্যতও সুরক্ষিত থাকবে। একই সঙ্গে সমস্ত ফাঁড়াও কাটবে।”

তিনি বলেন, “যে অঞ্চল থেকে ডাইনোসরের ডিম পাওয়া গিয়েছে তার শুধুমাত্র প্রত্নতাত্ত্বিক ও ভূতাত্ত্বিক মূল্য রয়েছে, তা কিন্তু নয়। একই সঙ্গে এই সাইটগুলোর ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্বও রয়েছে।”

বি‌এসআইপি-র ডিরেক্টর ড. ঠক্কর বলেন, “নর্মদা ভ্যালি রিজিয়নে এর আগেও অনেক বিশেষজ্ঞ দল কাজ করেছেন। ওই অঞ্চলের প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্ব রয়েছে। এই যে, টি-রেক্স সম্পর্কে আমরা এত কথা শুনি। কয়েক কোটি বছর আগে নর্মদা ভ্যালিতে কিন্তু মাংসাশী ডাইনোসর ছিল, যাকে রাজাসোরাস নরমাডেন্সিস বলা হয়। সে সম্পর্কে পৃথিবীকে জানানো আমাদের কর্তব্য। ইউনেস্কো যদি ধার জেলাকে ‘গ্লোবাল জিও পার্ক’ হিসেবে চিহ্নিত করার প্রস্তাবে সম্মতি জানায় তাহলে আমাদের সেই স্বপ্ন পূর্ণ হবে। শুধু তাই নয়, ওই অঞ্চল এবং সেখান থেকে যে জীবাশ্ম পাওয়া গিয়েছে তা সংরক্ষণ করাও সম্ভব হবে। এর কোনো কিছুই স্থানীয় মানুষের সহযোগিতা ছাড়া সম্ভব নয়।

এ বিষয়ে স্থানীয়দের আরও বোঝানো হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

   

About

Popular Links

x