কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে স্থানীয় আওয়ামী লীগের দ্বন্দ্বে ২০১২ ও ২০১৭ সালে জয় পেয়েছিলেন বিএনপির মনিরুল হক সাক্কু। ২০২২ সালে নৌকার প্রার্থী হন আরফানুল হক রিফাত। ঐক্যবদ্ধ প্রচারণায় দলের বহিষ্কৃত নেতা সাক্কুর জয়ের ধারা ভেঙে দেন তিনি। এমনকি একই সময়ে বিএনপিতে উত্থান হয় নিজাম উদ্দিন কায়সারের।
বিএনপি নির্বাচনে অংশ না না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলে সাক্কু ও কায়সার উভয়েই স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দেন। বহুল আলোচিত নির্বাচনের এক মাস আগে ২০২২ সালের ১৯ মে তাদের মনোনয়ন নিশ্চিত হওয়ার পর তারা দল থেকে পদত্যাগও করেন।
সাক্কু দীর্ঘদিন জেলা দক্ষিণ শাখার যুগ্ম সম্পাদক ও কায়সার নগর শাখার সেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি ছিলেন। পেশায় ব্যবসায়ী কায়সার দলের কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদকও ছিলেন।
সাক্কু দীর্ঘদিন জেলা দক্ষিণ শাখার যুগ্ম সম্পাদক ও কায়সার নগর শাখার সেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি ছিলেন। পেশায় ব্যবসায়ী কায়সার দলের কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদকও ছিলেন।
দেরি না করে শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে তাদের আজীবনের জন্য বহিষ্কার করে বিএনপি। এর দুই দিন পর দলটি তার নেতাকর্মীদের বহিষ্কৃত নেতাদের পক্ষে প্রচারণা করতেও নিষেধ করে।
এ কারণে দুই প্রার্থীর পক্ষে কাজ করতে পারেননি বিএনপির অনেক নেতাকর্মী। এছাড়া বিএনপি সমর্থকদের ভোট দুইজনের মধ্যে বিভক্ত হয়ে যায়। যা ১৫ জুন অনুষ্ঠিত প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থীকে জয়ী করতে সহায়তা করে।
সদর আসনের (কুমিল্লা-৬) বর্তমান সংসদ সদস্য আ ক ম বাহাউদ্দিন বাহার নগরীর ভোটারদের কাছে রিফাতকে পরিচয় করিয়ে দিতে ও দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল কমাতে প্রচারণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
অবশেষে রিফাত ৫০,৩১০ ভোট পেয়ে মেয়র হন। তিনি সাক্কুকে ৩৪৩ ভোটে পরাজিত করেন। মেয়র পদে কায়সার ২৯,০৯৯ ভোট পেয়ে তৃতীয় হন।
কায়সারের শ্যালক ও বিএনপির জেলা (দক্ষিণ) শাখার সাধারণ সম্পাদক আমিনুর রশিদ ইয়াসিনের নেতৃত্বে থাকা সাক্কুর প্রতিপক্ষ দল অভিযোগ করে, তৎকালীন মেয়র সাক্কু ক্ষমতার অপব্যবহার করে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প থেকে জনগণের টাকা লুটপাট করেন ও এমপি বাহারের আশীর্বাদে দায়মুক্তি ভোগ করেন। ইয়াসিন ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে বাহারের কাছে পরাজিত হয়েছিলেন।
২০১২ সালে মেয়র পদে দলীয় মনোনয়ন পেতে ব্যর্থ হয়ে সাক্কু বিএনপির কুমিল্লা জেলা (দক্ষিণ) শাখার যুগ্ম মহাসচিবের পদ থেকে পদত্যাগ করেন। পরে, দলীয় প্রধান খালেদা জিয়া তাকে তার পদ ফিরিয়ে দেন ও ২০১৭ সালের নির্বাচনে তাকে সমর্থন করেন।
ডিসেম্বর বা জানুয়ারিতে আগামী সাধারণ নির্বাচনের আগে সাক্কু এবং কায়সার উভয়েই আশা করছেন দল তাদের বহিষ্কারের আদেশ প্রত্যাহার করবে।
ঢাকা ট্রিবিউনের সঙ্গে আলাপকালে সাক্কু কুমিল্লা সদর আসন থেকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার আগ্রহ জানান। দল তাকে মনোনয়ন দেয় বা না দেয় সে দৌড়ে জয়ের ব্যাপারেও তিনি আশাবাদী। জাতীয় পার্টি তাকে পদের প্রস্তাব দিলেও সাক্কু বলেন, “তিনি বিএনপিতে ফিরতে চান।
অন্যদিকে কায়সার বলেন, “সিটি নির্বাচনে কারচুপি না হলে তিনি জয়ী হতেন।”
সাক্কু জনপ্রিয়তা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “সাবেক মেয়র মেরুকরণের রাজনীতি করেন। তার নিজস্ব ভোট ১০,০০০-১৫,০০০। তাই জাতীয় নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার হুমকি দিয়ে কোনো লাভ নেই। তৃণমূলের নেতাকর্মীরা কুমিল্লা জেলা দক্ষিণ বিএনপির মূলধারার সঙ্গে রয়েছে।”
সাক্কু, কায়সার এখনো অবাঞ্ছিত
প্রায় এক বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো তাদের বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করা হয়নি। এ কারণে দলের কোনো কর্মসূচিতে তাদের আমন্ত্রণ জানানো হয় না। আদৌ তাদের দলে ফিরিয়ে আনা হবে কি না তা বলতে পারেননি দুই নেতা।
২০২২ সালে দুই নেতাই বলেছিলেন, দলীয় নেতাদের চাপে তারা নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন। তবে পরাজিত হওয়ার পর একে অপরকে ক্ষমতাসীন দলের সুবিধাভোগী আখ্যা দেন তারা। কিন্তু কেউই দলে ফেরার সবুজ সংকেত পাননি।
২০২২ সালের ২৬ নভেম্বর বিএনপির কুমিল্লা বিভাগীয় সভায় নেতাকর্মীদের নিয়ে অংশ নেন সাক্কু ও কায়সার। কিন্তু মঞ্চে কেউ জায়গা পাননি। এরপর থেকে তারা দলের লাইমলাইটের বাইরে।
সাক্কু অবশ্য তাদের উদ্যোগে আয়োজিত অনানুষ্ঠানিক সভায় অংশগ্রহণ করেন ও বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশ নেন। বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদলে তার দীর্ঘদিনের অনুসারীরা বহিষ্কারের ভয়ে এখন তার সঙ্গে কাজ করেন না।
২০০৬ সালে বিএনপির সাবেক মন্ত্রী কর্নেল (অব.) আকবর হোসেন বীরপ্রতীকের মৃত্যুর পর থেকে জেলা বিএনপির মধ্যে দ্বন্দ্ব শুরু হয়। সাক্কু ও ইয়াসিনের অনুসারীরা পৃথক কর্মসূচিতে যোগ দিতে শুরু করে এবং বেশ কয়েকবার সংঘর্ষও হয়।
২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে জেলা শাখার সভাপতি বেগম রাবেয়া চৌধুরীর উদ্যোগে দুই দল ঐক্যবদ্ধ হয়। এ কারণে ২০১৭ সালের সিটি নির্বাচনে বিএনপি ভালো ফল পেয়েছিল।
কিন্তু পুরোনো বিরোধ কিছুদিন পর আবার মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে, যা ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে প্রভাব ফেলে। ইয়াসিন আওয়ামী লীগের বাহারের কাছে হেরে যান। এসময় ইয়াছিন পরাজয়ের জন্য মেয়রের অনুসারীদের দায়ী করেন।
নেতারা কি বলছেন?
সম্প্রতি দুই নেতার সঙ্গে তাদের পরিকল্পনা ও স্থানীয় রাজনীতি নিয়ে কথা বলেছেন এই প্রতিবেদক। বিএনপি তাদের ফিরিয়ে না আনলেও তারা অন্য দলে যাবেন না বলেও জানান।
ওই সময় বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত মেনে নেন কায়সার। এখন তিনি নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়ে দলের হাইকমান্ডের কাছে আবেদন জানিয়েছেন ও আগামী নির্বাচনের আগে ভালো খবর পাওয়ার আশা করছেন।
তিনি বলেন, “দলের কোনো পদে না থাকলেও আমি বিএনপির কর্মী হিসেবে কাজ করছি। কুমিল্লা বরাবরই বিএনপির ঘাঁটি। নেতাকর্মীদের চাপে এবং কাউকে গোল করার সুযোগ না দেওয়ার জন্য নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছি।”
সিটি নির্বাচনে পরাজয়ের জন্য তার প্রতিদ্বন্দ্বীকে দায়ী করে সাক্কু বলেন, “কায়সার তার ভোট কাটাতে ক্ষমতাসীন দলের পক্ষে কাজ করেছেন। তবে সংসদ নির্বাচনে প্রার্থীতা নিয়ে কোনো আপস করব না।”
তিনি বলেন, “বহিষ্কারের বিষয়ে দলের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছি। দল বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করলে আমি মনোনয়ন চাইব। তবে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার না হলেও নির্বাচনে অংশ নেব। কুমিল্লা-২ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করব।”
জাতীয় পার্টির (জাপা-এরশাদ) চেয়ারম্যান জিএম কাদেরের সঙ্গে তার বহুল আলোচিত বৈঠক প্রসঙ্গে সাক্কু বলেন, “তিনি জাতীয় নেতা। তাই তার আমন্ত্রণে তার সঙ্গে দেখা করেছি। তিনি ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) সম্পর্কে জানতে চেয়েছিলেন। আমাকে তার দলে যোগ দিতে বলেছে।”
সাক্কু বলেন, “তিনি বিএনপির হয়ে কাজ করতে চান। আমি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারি, কিন্তু অন্য কোনো দলে যোগ দেব না।”



