প্রাণহীন প্রথমার্ধের পর দ্বিতীয়ার্ধে ছড়াল অবিশ্বাস্য রোমাঞ্চ ও উত্তেজনা। অফসাইডের খাঁড়ায় ক্রোয়েশিয়ার তিনটি গোল বাতিল এবং যোগ করা সময়ের ত্রয়োদশ মিনিটে ভিএআরের নাটকীয় সিদ্ধান্তে ২-১ ব্যবধানের জয় নিয়ে বিশ্বকাপের শেষ ষোলো নিশ্চিত করেছে পর্তুগাল।
ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর রেকর্ড গড়ার ম্যাচে পেনাল্টি গোল আর গসালো রামোসের অন্তিম সময়ের লক্ষ্যভেদে উল্লাসে মাতে পর্তুগিজরা; বিপরীতে পরাজয়ের বেদনায় বিশ্বকাপ থেকে সম্ভাব্য শেষ ম্যাচ খেলে বিদায় নিতে হলো ক্রোয়াট মহানায়ক লুকা মদ্রিচকে। আগামী রাউন্ডে স্পেনের মুখোমুখি হবে পর্তুগাল।
টরন্টো স্টেডিয়ামে বাংলাদেশ সময় শুক্রবার (৩ জুলাই) সকালে শেষ বত্রিশের রুদ্ধশ্বাস ম্যাচটি ২-১ গোলে জিতেছে পর্তুগাল।
সবকটি গোলই হয়েছে দ্বিতীয়ার্ধে। এছাড়া অফসাইডের কারণে পর্তুগালের ‘গোল বাতিল’ হয়েছে একটি, ক্রোয়েশিয়ার তিনটি। যার শেষটি নিয়েই শেষের চরম নাটকীয়তা।
ইভান পেরিসিচের ক্রস বক্সে ইগর মাতাোভিচের মাথায় হালকা ছুঁয়ে বল পান মারিও পাশালিচ। তার থেকে বল পেয়ে জালে পাঠান ইয়োশকো ভার্দিওল। ক্রোয়েশিয়া তখন তুমুল উচ্ছ্বাস। বেশ কিছুক্ষণ সময় নিয়ে ভিএআরে পর্যালোচনার পর মনিটরে দেখে অফসাইডের সঙ্কেত দেন রেফারি। তার মতে, অফসাইডে ছিলেন পাশালিচ।
রেফারির এই সিদ্ধান্ত যেন বিশ্বাসই করতে পারছিল না ক্রোয়াটরা। তাদের সমর্থকরা মাঠে বোতল ছুড়তে থাকে গ্যালারি থেকে। দীর্ঘ অপেক্ষার পর আবার শুরু হয় খেলা। একটু পরই বাজে শেষ বাঁশি। ১০ মিনিট যোগ করা সময় শেষ হয় ১৯ মিনিটে গিয়ে। শেষ ষোলোয় ওঠার উল্লাসে মাতে পর্তুগাল।
এই ম্যাচ দিয়ে সবচেয়ে বেশি বয়সী আউটফিল্ড খেলোয়াড় হিসেবে বিশ্বকাপের নকআউট ম্যাচ খেলার কীর্তি গড়েন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো (৪১ বছর ১৪৭ দিন)। ইভান পেরিসিচের গোলে পিছিয়ে পড়ার পর, রোনালদোই পেনাল্টি থেকে সমতায় ফেরান দলকে। বদলি নেমে ৯৪তম মিনিটে দ্বিতীয় গোল করেন গসালো রামোস। সেটিই গড়ে দেয় ব্যবধান।
রোনালদোর পাশাপাশি এই ম্যাচে নজর ছিল আরেক জনের ওপর, ক্রোয়েশিয়া অধিনায়ক ৪০ বছর বয়সী লুকা মদ্রিচ। ২০১২ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত এই দুজন রেয়াল মাদ্রিদের হয়ে একসঙ্গে খেলেছেন ২২২ ম্যাচ এবং চারটি চ্যাম্পিয়ন্স লিগসহ শিরোপা জিতেছেন ১৩টি। তারাই প্রথম ৪০ বা এর বেশি বয়সী দুজন আউটফিল্ড খেলোয়াড়, যারা বিশ্বকাপে মুখোমুখি হলেন।
প্রথমার্ধে আক্রমণে দাপট দেখায় পর্তুগাল। চতুর্থ মিনিটে এগিয়ে যেতে পারত তারা। বাঁ দিক দিয়ে ক্ষিপ্র গতিতে বক্সে ঢুকে কাটব্যাক করেন খাফায়েল লেয়াও, আর ব্রুনো ফের্নান্দসের শট ফিরিয়ে দেন গোলরক্ষক দমিনিক লিভাকোভিচ। ফের্নান্দসের ফিরতি শট প্রতিহত হয় রক্ষণে।
কিছুক্ষণ টানা আক্রমণ করে পর্তুগাল। দশম মিনিটে পেদ্রো নেতো দারুণ ক্রস দেন বক্সে, হেডের চেষ্টায় বলের নাগাল পাননি রোনালদো। ষোড়শ মিনিটে কর্নারে খেনাতো ভাইগার হেড উডে যায় ক্রসবারের ওপর দিয়ে।
৩০তম মিনিটে আরেকটি খুব ভালো সুযোগ পায় পর্তুগাল। ডান দিক থেকে জুয়াও কান্সেলোর ক্রসে দূরের পোস্টে বলে পা ছোঁয়াতে পারেননি ফের্নান্দস কিংবা রোনালদো।
বিরতির আগে আর উল্লেখযোগ্য সুযোগ তৈরি করতে পারেনি কেউ।
প্রথমার্ধে প্রায় ৭০% বল দখলে রেখে গোলের জন্য ৯টি শট নিয়ে একটিই শুধু লক্ষ্যে রাখতে পারে পর্তুগাল। এই সময়ে ক্রোয়েশিয়ার তিন শটের একটিও লক্ষ্যে ছিল না।
সেই ক্রোয়েশিয়া দ্বিতীয়ার্ধে গোলের জন্য ১০টি শট নিয়ে ছয়টি রাখে লক্ষ্যে। এই সময়ে পর্তুগালের ছয় শটের দুটি লক্ষ্যে ছিল।
৪৮তম মিনিটে বক্সে ঢুকে প্রতিপক্ষের দুই জনের বাধা এড়িয়ে মাতেও কোভাচিচের শট পর্তুগাল গোলরক্ষকের পা ছুঁয়ে পাশের জালে লাগে।
ম্যাচের ৫৩তম মিনিটে ডান দিক থেকে ইয়োসিপ স্তানিসিচের ক্রসে দূরের পোস্টে বল পেয়ে নিখুঁত শটে ক্রোয়াটদের এগিয়ে নেন ৩৭ বছর বয়সী উইঙ্গার ইভান পেরিসিচ। পিছিয়ে পড়ার পর মরিয়া হয়ে ওঠে পর্তুগাল। ৬১ মিনিটে রোনালদোর একটি গোল অফসাইডের কারণে বাতিল হলেও ৬৮ মিনিটে সমতায় ফেরে দলটি।
কর্নার কিকের পর ক্রোয়েশিয়ার নিকোলা ভ্লাসিচ বক্সে খেনাতো ভাইগাকে টেনে ফেলে দিলে, ভিএআর পর্যালোচনায় মনিটরে দেখে পেনাল্টি দিয়েছিলেন রেফারি।
বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে ৯ ম্যাচে রোনালদোর প্রথম গোল এটি, ৩১তম শটে।
৭৫তম মিনিটে আবার এগিয়ে যেতে পারত ক্রোয়েশিয়া। ২৫ গজ দূর থেকে কোভাচিচের নিচু শট ঝাঁপিয়ে পড়া গোলরক্ষকের হাত ছুঁয়ে পোস্টে লাগে।
পাঁচ মিনিট পর পর্তুগালের জালে বল পাঠান পেতার সুচি, কিন্তু অফসাইডের পতাকা ওঠে আরেকবার। পরের মিনিটে রোনালদোকে তুলে হুবেন নেভ্সকে নামান পর্তুগাল কোচ রবের্তো মার্তিনেস।
নির্ধারিত সময়ের পর যোগ করা সময়ের চতুর্থ মিনিটে বাঁ দিক থেকে লেয়াওয়ের ক্রসে দুর্দান্ত হেডে পর্তুগালকে ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে নেন বদলি নামা গসালো রামোস। কিন্তু আসল নাটক তখনও বাকি ছিল। ১০ মিনিট যোগ করা সময় পেরিয়ে খেলা যখন ১৯তম মিনিটে গড়ায়, তখন মারিও পাশালিচের পাস থেকে বল জালে পাঠান ক্রোয়েশিয়ার ইয়োশকো ভার্দিওল। সমতার উল্লাসে মাতে ক্রোয়াট শিবির। তবে দীর্ঘক্ষণ ভিএআর পর্যালোচনার পর রেফারি মনিটর দেখে পাশালিচের অফসাইডের কারণে গোলটি বাতিল করেন।
বিদায় নিতে হলো আসর থেকে ক্রোয়েশিয়াকে।



