বিশ্ব ফুটবলের আগামী পরাশক্তি হয়ে ওঠার সব সম্ভাবনা বহন করছে উত্তর আফ্রিকার দেশ মরক্কো, বক্তব্যটি আপাতদৃষ্টিতে সাহসী মনে হলেও দেশটির ফুটবলকেন্দ্রিক দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও আধুনিক পরিকাঠামো তা শতভাগ বাস্তবায়ন করে চলেছে। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে প্রথম আফ্রিকান দেশ হিসেবে সেমিফাইনালে উঠে ইতিহাস গড়া মরক্কো চলতি বিশ্বকাপেও দুর্দান্ত পারফর্ম করে কোয়ার্টার ফাইনালে উঠার পাশাপাশি বিশ্বমঞ্চে নিজেদের অবস্থান পাকাপোক্ত করেছে। ২০৩০ সালের বিশ্বকাপের অন্যতম সহ-আয়োজক দেশটি কেবল অবকাঠামোগত উন্নয়নই নয়, বরং মাঠের পারফরম্যান্সেও এক অপরাজেয় ফুটবল সাম্রাজ্য গড়ে তোলার বার্তা দিয়ে চলেছে।
মরক্কো ফুটবলের এই অভাবনীয় উত্থান কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং এটি রাজপ্রাসাদের প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতা ও সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার ফসল। রয়্যাল মরক্কান ফুটবল ফেডারেশনের (আরএমএফএফ) মাধ্যমে দেশটির রাজা ষষ্ঠ মোহাম্মদের নির্দেশে ফুটবলে বিপুল অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগ করা হয়েছে। বিশ্বমানের অত্যাধুনিক ট্রেনিং সেন্টার, ন্যাশনাল একাডেমি, আঞ্চলিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, উন্নত স্টেডিয়াম এবং তৃণমূল পর্যায়ে হাজার হাজার অপেশাদার পিচ তৈরি করা হয়েছে।
ইউরোপের শীর্ষ লিগে খেলা তারকা ফুটবলাররা জাতীয় দলে এসে আন্তর্জাতিক মানের এই সুযোগ-সুবিধা পেয়ে আরও উৎসাহিত হচ্ছেন। তবে শুধু ফুটবলেই নয়, সমালোচকদের আশ্বস্ত করে ২০২৬ সালের রাষ্ট্রীয় বাজেটে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতেও বড় বরাদ্দ বাড়িয়ে ভারসাম্য রক্ষা করেছে সরকার। ফুটবলের এই বিকাশ এখন আন্তর্জাতিক দরবারে মরক্কোর রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার অন্যতম হাতিয়ার হয়ে উঠেছে।
মরক্কোর সাফল্যের অন্যতম বড় চাবিকাঠি হলো ইউরোপজুড়ে ছড়িয়ে থাকা তাদের বিশাল ‘ডায়াসপোরা’ বা প্রবাসী জনগোষ্ঠী। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, বিদেশে বসবাসরত ৫০ লাখের বেশি মরক্কানের মধ্যে ফুটবল প্রতিভাদের খুঁজে বের করতে ফ্রাঙ্কো-ইউরোপীয় অঞ্চলে পূর্ণকালীন স্কাউট নিয়োগ করেছে আরএমএফএফ।
ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস, স্পেন ও জার্মানির মতো দেশগুলোতে বেড়ে ওঠা প্রতিভাদের খুব ছোটবেলা থেকেই নজরদারিতে রাখা হচ্ছে। চলতি বিশ্বকাপ স্কোয়াডের ২৬ জন খেলোয়াড়ের মধ্যে ১৯ জনই জন্মসূত্রে প্রবাসী। ফরাসি অনূর্ধ্ব দলে খেলা আইয়ুব বুয়াদ্দির মতো তরুণ তুর্কিরা যেমন মরক্কোর হয়ে খেলতে বেছে নিয়েছেন, তেমনি জাতীয় দলের প্রতি তাদের এই আবেগ মাঠেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
শুধু প্রবাসীদের ওপর নির্ভর না করে স্থানীয় একাডেমিগুলো থেকেও সমপরিমাণ আন্তর্জাতিক মানের ফুটবলার তৈরির দিকে নজর দিচ্ছে ফেডারেশন। দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের অংশ হিসেবে ২০৩০ সালের মধ্যে দলে প্রবাসী ও স্থানীয় ফুটবলারদের অনুপাত সমান করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
সুপরিকল্পিত এই অবকাঠামোর সুফল ইতিমধ্যে হাতেনাতে মিলছে। অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপজয়ী কোচ মোহাম্মদ ওয়াহবিকে পরবর্তীতে বয়সভিত্তিক দল থেকে পদোন্নতি দিয়ে সিনিয়র জাতীয় দলের প্রধান কোচের দায়িত্ব দেওয়া হয়। তারুণ্যনির্ভর এই মরক্কো দলটিই এখন চলতি বিশ্বকাপের অন্যতম তরুণ ও পরাক্রমশালী দল হিসেবে বিশ্বজুড়ে নিজেদের জানান দিচ্ছে। ২০৩০ সালের যৌথ বিশ্বকাপকে সামনে রেখে বিশ্বের দৃষ্টিনন্দন স্টেডিয়াম বানানোর পাশাপাশি ভেতর থেকে এক অপরাজেয় দল গঠন করে মরক্কো এখন আগামী দিনের ফুটবল পরাশক্তি হওয়ার দৌড়ে সবার চেয়ে এগিয়ে রয়েছে।



