৫ মিনিটের জন্য ফোন হাতে নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় স্ক্রল করতে শুরু করেছিলেন, অথচ যখন চোখ তুলে তাকালেন, দেখলেন চোখের পলকে পার হয়ে গেছে পুরো এক ঘণ্টা। বর্তমান প্রজন্মের প্রতিটি স্মার্টফোন ব্যবহারকারীর কাছেই এই দৃশ্যটি অত্যন্ত চেনা। চিকিৎসাবিজ্ঞান এবং প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন সমস্যা নয়; বরং এর পেছনে রয়েছে শীর্ষ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর তৈরি করা এক মনস্তাত্ত্বিক ফাঁদ।
সম্প্রতি মার্কিন স্বাস্থ্যসেবা সংস্থা ‘রিভিয়ার হেলথ’-এর এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, কীভাবে টিকটক, ইনস্টাগ্রাম রিলস কিংবা ইউটিউব শর্টসের মতো ১৫ থেকে ৩০ সেকেন্ডের ছোট ভিডিওগুলো মানুষের মস্তিষ্কের নিয়ন্ত্রণ কেড়ে নিচ্ছে।
টেক জায়ান্ট বা মেগা কোম্পানিগুলো তাদের রিলস দেখার অ্যালগরিদম এমনভাবে তৈরি করেছে, যার কোনো শেষ নেই। একটি ভিডিও শেষ হতেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে চলে আসে আরেকটি। চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা জানান, যখনই মানুষ নতুন বা আকর্ষণীয় কিছু দেখে, তখন মস্তিষ্কে ‘ডোপামিন’ নামক এক ধরনের রাসায়নিকের ক্ষরণ ঘটে, যা ভালো লাগার অনুভূতি তৈরি করে।
শর্ট ভিডিওগুলো মূলত মস্তিষ্কের এই ডোপামিন ক্ষরণকে বারবার টোকা মারে। ফলে মস্তিষ্ক আরও ডোপামিন পাওয়ার আশায় স্ক্রল করা থামাতে পারে না এবং ব্যবহারকারী ‘আর একটি মাত্র ভিডিও’ দেখার চক্রে আটকে পড়েন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই আসক্তিতে ব্যবহারকারীর নিজের কোনো দোষ নেই; সিস্টেমটিই তৈরি করা হয়েছে মানুষকে স্ক্রিনে আটকে রাখার জন্য।
রিলস দেখার এই অভ্যাস মানুষের মনোযোগের ক্ষমতা বা ‘অ্যাটেনশন স্প্যান’ মারাত্মকভাবে কমিয়ে দিচ্ছে। একটা সময় মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা মনোযোগ দিয়ে বই পড়তে পারত, যা এখন দুই পাতা পড়ার আগেই মন সরে যায়। এর কারণ, শর্ট ভিডিওগুলো মস্তিষ্ককে অভ্যস্ত করে তুলছে যে প্রতি ২০ সেকেন্ড পর পর নতুন এবং আকর্ষণীয় কিছু আসবে। ফলে পড়াশোনা, খেলাধুলা বা যেকোনো সৃষ্টিশীল কাজে যেখানে একটু দীর্ঘ সময় ও ধৈর্যের প্রয়োজন হয়, সেখানে মানুষ ধৈর্য হারিয়ে ফেলছে।
এর পাশাপাশি রাতের বেলা রিলস দেখার কারণে ব্যাঘাত ঘটছে ঘুমের চক্রে। নীল আলোর প্রভাবে মস্তিষ্ক সজাগ থাকায় ঘুম আসতে দেরি হয়, যার প্রভাব পড়ে পরদিনের কাজে বা শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার খাতায়।
রিলসে সাধারণত মানুষের চমৎকার চেহারা, নিখুঁত প্রতিভা, দামি ফোন, ব্র্যান্ডের পোশাক কিংবা বিলাসবহুল ভ্রমণের ভিডিও দেখা যায়। এগুলো দেখতে দেখতে সাধারণ ব্যবহারকারীদের মনে এক ধরনের হীনম্মন্যতা তৈরি হয়।
মনোবিজ্ঞানীরা সতর্ক করে বলছেন, এই অনুভূতিটি অত্যন্ত বিপজ্জনক। কারণ, রিলসের এই জীবনগুলো শতভাগ বাস্তব নয়, বরং সুসজ্জিত। সেরা মুহূর্তগুলো বেছে নিয়ে, ফিল্টার ব্যবহার করে এবং অনেকগুলো ‘টেক’ নেওয়ার পর একটি ভিডিও আপলোড করা হয়। পর্দার ওপাড়ের মানুষটিরও বাস্তব জীবনে ব্রণ উঠলে মেজাজ খারাপ হয়, পরীক্ষায় ফল খারাপ হয় কিংবা একাকীত্ব ভর করে; যা কখনো রিলসে দেখানো হয় না। তাই অন্যের ‘হাইলাইট রিল’-এর সঙ্গে নিজের বাস্তব জীবনের তুলনা করা একটি বড় ভুল।
বিশেষজ্ঞরা ফোন সম্পূর্ণ ছেড়ে দেওয়ার কথা বলছেন না, যা এই যুগে বাস্তবসম্মত নয়। তবে কিছু ছোট এবং কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমে এই আসক্তি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব:
১. স্ক্রিন টাইম চেক করা: ফোনের সেটিংসে গিয়ে প্রতিদিন কতক্ষণ সোশ্যাল মিডিয়ায় কাটছে তা দেখা। সমীক্ষায় দেখা গেছে, অধিকাংশ মানুষ দিনে ৩ থেকে ৫ ঘণ্টা শুধু স্ক্রল করেই কাটিয়ে দেয়।
২. খাওয়ার সময় ফোন দূরে রাখা: এই একটি অভ্যাস বদলালে দিনে অন্তত আধা ঘণ্টা সময় বাঁচবে এবং পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ তৈরি হবে।
৩. শোবার ঘরের বাইরে ফোন রাখা: ঘুমানোর সময় ফোনটি বসার ঘরে বা অন্য কোথাও চার্জে দেওয়া। শুরুতে অস্বস্তি হলেও এক সপ্তাহের মধ্যে ঘুমের মান উন্নত হবে।
৪. নোটিফিকেশন বন্ধ করা: রিলস অ্যাপগুলোর পুশ নোটিফিকেশন বন্ধ রাখা, যেন অ্যাপগুলো আপনাকে ডাকতে না পারে; বরং প্রয়োজন হলে আপনি নিজে অ্যাপ খুলবেন।
সবশেষে প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের একটাই প্রশ্ন, আপনি রিলস দেখছেন, নাকি রিলস আপনাকে দেখিয়ে নিচ্ছে? যতক্ষণ পর্যন্ত আপনি নিজে নিয়ন্ত্রণ করছেন, ততক্ষণ ঠিক আছে। কিন্তু যখন ফোনটি হাত থেকে নামাতে পারছেন না, তখন বুঝতে হবে নিয়ন্ত্রণ আপনার হাতে নেই। আপনার মনোযোগ অত্যন্ত মূল্যবান জিনিস, যা শীর্ষ কোম্পানিগুলো বিনামূল্যে হাতিয়ে নিচ্ছে। তাই ফোন না ছেড়ে, শুধু এর নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে রাখাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।



