Thursday, June 04, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

বাংলাদেশের দুর্বল স্বাস্থ্যব্যবস্থায় হামের প্রাদুর্ভাব ও উত্তরণের পথ

এ সংকটের পেছনে একাধিক কাঠামোগত, প্রশাসনিক এবং জনস্বাস্থ্যগত কারণ একযোগে ভূমিকা রেখেছে

আপডেট : ১৯ মে ২০২৬, ০৫:৫২ পিএম

বাংলাদেশে ২০২৬ সালের হামের প্রাদুর্ভাব একটি গুরুতর জনস্বাস্থ্য সংকটে রূপ নিয়েছে। এ সংকটের পেছনে একাধিক কাঠামোগত, প্রশাসনিক এবং জনস্বাস্থ্যগত কারণ একযোগে ভূমিকা রেখেছে।

মে ২০২৬ পর্যন্ত দেশে সন্দেহজনক হামের উপসর্গে ৩৭৭ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে, যার মধ্যে ৭৪টি মৃত্যু পরীক্ষাগারে নিশ্চিত হয়েছে। মোট আক্রান্তের সংখ্যা ৫৫,৬১১ অতিক্রম করেছে এবং দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৫৮ জেলায় সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে। আক্রান্তদের প্রায় ৭৯% পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু, যা শিশুস্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক পরিস্থিতি নির্দেশ করে (বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২০২৬)

প্রাদুর্ভাবের প্রধান কারণসমূহ

১. টিকার মজুদ সংকট: ২০২৬ সালের মার্চ মাসে হামসহ ছয় ধরনের গুরুত্বপূর্ণ টিকার মজুদ শেষ হয়ে যায়। পূর্বে তিন মাসের বাফার স্টক সংরক্ষণের যে নীতি ছিল, তা কার্যকরভাবে অনুসরণ করা হয়নি। বিশেষজ্ঞদের মতে, টিকা ক্রয় প্রক্রিয়ায় বিলম্ব এবং সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতার কারণে নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম ব্যাহত হয়, যা প্রাদুর্ভাবের অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

২. প্রশাসনিক ও নীতিগত দুর্বলতা: বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বিদ্যমান টিকা সংগ্রহ পদ্ধতি ও অর্থায়ন কাঠামো পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, যার ফলে সরবরাহ ব্যবস্থায় বিলম্ব সৃষ্টি হয়। ইউনিসেফ ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে সম্ভাব্য সংকট সম্পর্কে সতর্কবার্তা প্রদান করলেও সময়মতো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা সম্ভব হয়নি। 


৩. কোভিড-১৯ মহামারির দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব: কোভিড-১৯ মহামারি বাংলাদেশের নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিকে দীর্ঘ সময়ের জন্য ব্যাহত করে। এর ফলে বিপুল সংখ্যক শিশু নির্ধারিত সময়ে টিকা থেকে বঞ্চিত হয় এবং সংবেদনশীল জনগোষ্ঠীর আকার বৃদ্ধি পায়। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান হাম পরিস্থিতি ভবিষ্যতে অন্যান্য প্রতিরোধযোগ্য সংক্রামক রোগের পুনরুত্থানেরও পূর্বাভাস হতে পারে।

৪. টিকাদানে ঘাটতি ও অনাক্রম্য জনগোষ্ঠীর বৃদ্ধি: ২০২৫ সালে বাংলাদেশে প্রায় ৫০ লাখ শিশু পূর্ণাঙ্গ টিকাদানের আওতার বাইরে ছিল। এর মধ্যে প্রায় ৭০ হাজার শিশু কোনো ডোজই গ্রহণ করেনি এবং ৪ লাখের বেশি শিশু আংশিক টিকাপ্রাপ্ত ছিল। বর্তমান প্রাদুর্ভাবে আক্রান্তদের মধ্যে প্রায় ৭২% ছিল সম্পূর্ণ অটিকাপ্রাপ্ত এবং ১৬% আংশিক টিকাপ্রাপ্ত।

৫. ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় দ্রুত সংক্রমণ বিস্তার: ঢাকার ঘনবসতিপূর্ণ বস্তি ও শিল্পাঞ্চল-যেমন ডেমরা, যাত্রাবাড়ী, কামরাঙ্গীরচর, কড়াইল, মিরপুর এবং তেজগাঁও-সংক্রমণের উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। অতিরিক্ত জনঘনত্ব, সীমিত স্বাস্থ্যসেবা এবং নিম্ন টিকাদান কভারেজ এসব এলাকায় রোগ বিস্তারকে ত্বরান্বিত করেছে।

সরকারের গৃহীত পদক্ষেপ

পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার ৫ এপ্রিল, ২০২৬ থেকে জরুরি হাম-রুবেলা (এমআর) টিকাদান অভিযান শুরু করে। প্রথম পর্যায়ে ১৮টি অগ্রাধিকার জেলার ৩০টি উপজেলায় কার্যক্রম পরিচালিত হয় এবং ২০ এপ্রিল থেকে তা সারা দেশে সম্প্রসারণ করা হয়। এ অভিযানে ৬ মাস থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের লক্ষ্য করে টিকাদান কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।

২০২৬ সালের হামের প্রাদুর্ভাব বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় শুধু জরুরি টিকাদান অভিযান যথেষ্ট নয়; দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। ভবিষ্যতে এ ধরনের মহামারি প্রতিরোধে বাংলাদেশের জন্য নিম্নোক্ত পদক্ষেপগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

বাংলাদেশের জন্য জরুরি পদক্ষেপসমুহ: হামের এই মহামারি থেকে রক্ষা পেতে বাংলাদেশকে স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি-দুই স্তরে পদক্ষেপ নিতে হবে।

তাৎক্ষণিক করণীয় (এখনই)

১. ব্যাপক টিকাদান অভিযান সম্পন্ন করা: হাম প্রতিরোধে কার্যকর হার্ড ইমিউনিটি অর্জন করতে হলে বাংলাদেশের কমপক্ষে ৯৫% শিশুকে হামের টিকার দুটি ডোজ দিতে হবে। বর্তমানে ইউনিসেফ, ডব্লিউএইচও ও গ্যাভি’র (দ্য ভ্যাকসিন অ্যালায়েন্স) সহায়তায় ৫ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া জরুরি টিকাদান অভিযানে ৬ মাস থেকে ৫৯ মাস বয়সী ২ কোটি শিশুকে টিকা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

২. শিশুর বয়স কমিয়ে টিকার আওতা বাড়ান: কর্তৃপক্ষ হামের টিকার ন্যূনতম বয়সসীমা ৯ মাস থেকে কমিয়ে ৬ মাস করেছে, যা WHO-এর প্রাদুর্ভাব পরিস্থিতিতে সুপারিশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ - এতে ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের দ্রুত সুরক্ষা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে।

৩. ভিটামিন এ সরবরাহ নিশ্চিত করা: হামে আক্রান্ত সব সন্দেহজনক ও নিশ্চিত রোগীকে ভিটামিন এ সাপ্লিমেন্ট দেওয়া হচ্ছে, কারণ এটি হামের জটিলতার তীব্রতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে পারে।

৪. হাসপাতালের সক্ষমতা বাড়ানো: ঢাকার সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালসহ রেফারেল হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা সক্ষমতা বাড়ানো হচ্ছে এবং ভেন্টিলেটরসহ প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সংগ্রহ করা হচ্ছে।

৫. নজরদারি ও রিপোর্টিং জোরদার করা: হামের উপসর্গ শনাক্তকরণ ও রিপোর্টিং নির্ভুলতা উন্নত করতে স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে এবং জাতীয় নজরদারি ব্যবস্থা শক্তিশালী করা হচ্ছে।
মধ্যমেয়াদী করণীয় (আগামী ৬–১২ মাস)

৬. শূন্য-ডোজ শিশুদের খুঁজে বের করা: জরুরি টিকাদান পরিকল্পনায় মাইক্রো-প্ল্যানিং ও ভ্যাকসিন মোতায়েনের মাধ্যমে শূন্য-ডোজ ও আংশিক টিকাপ্রাপ্ত শিশুদের বিশেষভাবে চিহ্নিত করে টিকার আওতায় আনা হচ্ছে।

৭. ভুল তথ্য ও গুজব মোকাবেলা: তথ্য মন্ত্রণালয়ের সাথে সমন্বয় করে ৩০টি উচ্চঝুঁকির উপজেলায় হাম প্রতিরোধ বার্তা প্রচার করা হচ্ছে এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গুজব ও ভুল তথ্য পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।

দীর্ঘমেয়াদী করণীয় (কাঠামোগত সংস্কার)

৮. টিকার স্থায়ী বাফার স্টক বজায় রাখা: আগে যেমন তিন মাসের মজুদ রাখা হতো, সেই ব্যবস্থা পুনরুদ্ধার করতে হবে এবং ক্রয় প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে হবে।

৯. স্থানীয় টিকা উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি: বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারের নিজস্ব সক্ষমতা তৈরি করা এবং দীর্ঘমেয়াদি টিকাদান কর্মসূচিতে বাহ্যিক উৎসের উপর নির্ভরশীলতা কমানো অপরিহার্য।

১০. WHO ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে সমন্বয়: ইউনিসেফ, ডব্লিউএইচও ও গ্যাভি’কে নিয়মিত টিকাদান পুনরুদ্ধার, বৃহৎ পরিসরে ক্যাচ-আপ টিকাদান অভিযান পরিচালনা এবং উচ্চঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নজরদারি ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে।

প্রতিটি পরিবারের জন্য করণীয়

করণীয়

বিবরণ

 টিকা নিন
৯ মাস ও ১৫ মাস বয়সে দুটি ডোজ নিশ্চিত করুন
আইসোলেশন
আক্রান্ত শিশুকে ৪ দিন আলাদা রাখুন
হাত ধোয়া
সাবান ও পানি দিয়ে নিয়মিত হাত ধোয়ার অভ্যাস করুন
পুষ্টি
ভিটামিন A সমৃদ্ধ খাবার খাওয়ান
দ্রুত চিকিৎসা
জ্বর ও র‍্যাশ দেখা দিলে সঙ্গে সঙ্গে ডাক্তারের কাছে যান

 

২০২৬ সালের হাম প্রাদুর্ভাব শুধু একটি সংক্রামক রোগের সংকট নয়; এটি বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার দুর্বলতা, অসমতা এবং প্রস্তুতির সীমাবদ্ধতাকে সামনে এনেছে। তবে ইতিবাচক দিক হলো-বাংলাদেশ অতীতে সফল গণটিকাদান কর্মসূচির উদাহরণ তৈরি করেছে।

সঠিক পরিকল্পনা, দ্রুত সিদ্ধান্ত, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি এবং জনগণের আস্থা পুনর্গঠনের মাধ্যমে বাংলাদেশ ভবিষ্যতে এ ধরনের মহামারি কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হতে পারে।

 

 ডা. আমিনুর রহমান শাহীন, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ
প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্ত ব্যক্তিগত। ঢাকা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ এর জন্য দায়ী নয়।
   

About

Popular Links

x