Friday, June 05, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

প্রতিবন্ধীদের ক্রেডিট কার্ড পেতে বাধা কোথায়?

ব্যাংক হিসাব খোলার সময়ও বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হন তারা

আপডেট : ২৯ মার্চ ২০২২, ০৪:৩১ পিএম

প্রায় এক দশকেরও বেশি সময় যাবত একটি বেসরকারি ব্যাংকে হিসাব পরিচালনার পরও দৃষ্টিহীনতার কারণে ক্রেডিট কার্ড পাননি ভাস্কর ভট্টাচার্য। প্রথমে ব্যাংক থেকে ক্রেডিট কার্ডের জন্য তার আবেদন নাকচ করা হয়। এরপর তিনি ব্যাংকটির কল সেন্টার এবং ক্রেডিট কার্ড বিভাগে যোগাযোগ করেন। সেখান থেকেও তার কার্ড পরিচালনার সক্ষমতার অজুহাতে ক্রেডিট কার্ড সরবারহ করতে অস্বীকৃতি জানানো হয়।

তিনি ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন “আমি প্রায় ১০ বছর ধরে ডাচ বাংলা ব্যাংক লিমিটেডে (ডিবিবিএল) একটি হিসাব পরিচালনা করছি। সন্তোষজন লেনদেন থাকার পরও তারা আমাকে ক্রেডিট কার্ড দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।”

তিনি বলেন, "যদি আমি ডেবিট কার্ড ব্যবহার করতে পারি, তাহলে ক্রেডিট কার্ড কেন পাবো না?"

ভাস্কর ভট্টাচার্য সরকারের আইসিটি বিভাগের এটুআই প্রকল্পের অধীনে একজন সিস্টেম উদ্ভাবন বিশেষজ্ঞ হিসেবে কর্মরত। কাজের প্রয়োজনে স্ত্রীর ক্রেডিট কার্ডের বিপরীতে জারি করা একটি সম্পূরক কার্ড ব্যবহার করতে হচ্ছে তাকে।

জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পুরস্কারপ্রাপ্ত এই প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ গত ১৫ বছর যাবত প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য সহায়ক প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও নীতিমালা প্রণয়নে কাজ করে যাচ্ছেন। হতাশকন্ঠে তিনি বলেন, “যদি আমি প্রতিবন্ধীতার মানদণ্ড পূরণ করতে পারি এবং কার্ড পরিচালনায় সক্ষম হই, তাহলে ব্যাংক কেন আমাকে ক্রেডিট কার্ড সুবিধা থেকে বঞ্চিত করবে?”

তবে শুধু তার ক্ষেত্রেই নয়। এটি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য একটি সাধারণ সমস্যা। তারা ঋণ, ডেবিট কার্ড এবং ক্রেডিট কার্ডসহ বিভিন্ন ব্যাংকিং সেবা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার হয়ে থাকেন। এমনকি, নির্দিষ্ট কিছু ব্যাংকে হিসাব খোলার সময়ও তারা সমস্যার সম্মুখীন হন।

 আইন যা বলে

বাংলাদেশ ব্যাংকের মতে, ক্রেডিট কার্ড শুধুমাত্র এমন ব্যক্তিকে সরবারহ করা হবে- যিনি বাংলাদেশের নাগরিক বা বাসিন্দা এবং আবেদনের তারিখে যার বয়স ১৮ বছরের বেশি। যার একটি বৈধ টিআইএন রয়েছে এবং যার নিজস্ব আর্থিক সক্ষমতা ও দেনা পরিশোধেরে সক্ষমতা রয়েছে।

তবে বেশিরভাগ ব্যাংকে, একজন ব্যক্তি ক্রেডিট কার্ডের যোগ্য হন- যদি তিনি ১৮ বছরের বেশি বয়সী বাংলাদেশি নাগরিক হন এবং পরপর তিন মাস তার ন্যূনতম মাসিক আয় ২৫,০০০ টাকা হয়।

যদিও ব্যাংকগুলো গ্রাহককে ক্রেডিট কার্ড সরবারহ করার আগে বিভিন্ন ঝুঁকি এবং অন্যান্য বেশ কিছু তথ্য পর্যালোচনা করে। তবে কার্ড পাওয়ার ঝুঁকির মানদণ্ডে প্রতিবন্ধীতাকে কোথাও বাধা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।

প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার ও সুরক্ষা আইন-২০১৩ এবং দেশের অন্যান্য আইন অনুযায়ী, মৌলিক মানবাধিকারের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধী ব্যক্তি এবং সকল সাধারণ নাগরিকের অধিকার সমান।

আইন অনুযায়ী একজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি কোনো বাধা ছাড়াই অন্যান্য মানুষের মতো তাদের জীবনযাপনের সুযোগ পাবে।

অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের সভাপতি সেলিম আরএফ হুসেন বলেন, “একজন ব্যক্তি যদি ডেবিট কার্ড ব্যবহার করতে পারেন, তাহলে যোগ্যতার মানদণ্ড পূরণ সাপেক্ষে তিনি ক্রেডিট কার্ডও পেতে পারেন।” 

তিনি বলেন, “আগে, ক্রেডিট কার্ডে লেনদেন করার জন্য স্বাক্ষর অপরিহার্য ছিল। কিন্তু, এখন বেশিরভাগ লেনদেন পিওএস মেশিনে সংখ্যাসূচক প্যাডের মাধ্যমে করা হয়।”

তিনি আরও বলেন, "যদি একজন ব্যক্তি অন্ধ হওয়া সত্ত্বেও ডেবিট কার্ড ব্যবহার করতে পারেন, তবে তার জন্য ক্রেডিট কার্ড পেতে কোন বাধা নেই। সেক্ষেত্রে তাকে শুধু ক্রেডিট কার্ড প্রাপ্তির অন্যান্য মানদণ্ড পূরণ করতে হবে।" 

প্রায় একই সুরে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র সিরাজুল ইসলাম বলেন, “বরং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পাবেন। শুধুমাত্র শারীরিক অক্ষমতার কারণে যদি তাদেরকে বঞ্চিত করা হয়, তাহলে তা হবে অন্যায্য।”

বিষয়টি নিয়ে ব্যাংকগুলোর সঙ্গে কথা বলার আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।

বিষয়টি নিয়ে ভাবা জরুরি

ব্যাংক কর্তৃপক্ষ, নিয়ন্ত্রক এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের (এনএইচআরসি) মতে, তারা বৈষম্যের বিষয়টি খুব গুরুত্ব সহকারে দেখছে।

প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ক্রেডিট কার্ড প্রদানের ক্ষেত্রে বাধার বিষয়টি সম্পর্কে অবগত ছিলেন না জানিয়ে অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের সভাপতি সেলিম আরএফ হুসেন বলেন, "আমি এটি দেখব।

ভাস্কর ভট্টাচার্যের অভিযোগটি তারা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখছেন জানিয়েছেন মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান নাসিমা বেগম।

তিনি বলেন, “আমরা আমাদের পরবর্তী শুনানিতে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করার জন্য অভিযোগকারী, ব্যাংক এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর অফিসের একজন প্রতিনিধিকে ডেকেছি।”

এই বিষয়ে প্রশ্নের জবাবে, ডাচ বাংলা ব্যাংকের ই-বিজনেস বিভাগের প্রধান মো. শাহজাহান বলেন, “একজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি কীভাবে ব্যাংকিং সুবিধা পেতে পারে সে সম্পর্কে বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি নির্দেশিকা রয়েছে, তবে এতে ক্রেডিট কার্ড পরিচালনার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত নেই।”

তিনি বলেন, “কোনো ব্যাক্তি যখন ব্যাংকে কার্ড ব্যবহার করেন, তখন প্রয়োজনে ব্যাংক কর্মকর্তারা তাকে সাহায্য করতে পারেন। কিন্তু তিনি যখন কেনাকাটা বা বাণিজ্যিক কাজের জন্য কার্ড ব্যবহার করেন, তখন আমাদের পক্ষে তাকে সাহায্য করার কোনও উপায় থাকে না।"

তিনি যুক্তি দেখান যে, যদি একজন ব্যক্তি পাঁচ হাজার টাকার জিনিস ক্রয় করেন কিন্তু বিক্রেতা তার পিওএস মেশিনে দশ হাজার টাকা রাখেন তবে লেনদেন নিশ্চিত করার সময় দৃষ্টিহীন গ্রাহক পরিমাণটি যাচাই করতে পারবেন না।

তিনি বলেন, "এই ধরনের ঘটনা বিরোধের কারণ হতে পারে।" কেন্দ্রীয় ব্যাংক যদি এই বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশিকা প্রণয়ন করে, তবে ব্যাংকগুলো অবশ্যই তা অনুসরণ করবে বলে জানান তিনি।

   

About

Popular Links

x