Friday, June 05, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

যেভাবে করবেন ক্রেডিট কার্ড

ব্যাংকগুলো প্রধানত ভিসা, মাস্টারকার্ড, ডিসকভার এবং আমেরিকান এক্সপ্রেস- এই চার মূল ধরনের ক্রেডিট কার্ড গ্রাহকদের সরবরাহ করে থাকে

আপডেট : ১৩ মার্চ ২০২২, ১০:১৮ এএম

ব্যাংক কর্তৃক জারি করা প্লাস্টিকের পাতলা আয়তক্ষেত্রাকার কার্ড বা এক কথায় ক্রেডিট কার্ড-এর ধারকদের যে কোনো পণ্য ও পরিষেবা ক্রয়ের জন্য অর্থ ঋণের সুবিধা দিয়ে থাকে। প্রযোজ্য সুদসহ এই ঋণকৃত অর্থটি কার্ডধারককে ফেরত দিতে হয় একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে।

ব্যাংকগুলো প্রধানত ভিসা, মাস্টারকার্ড, ডিসকভার এবং আমেরিকান এক্সপ্রেস- এই চার মূল ধরনের ক্রেডিট কার্ড গ্রাহকদের সরবরাহ করে থাকে। কেবল অর্থ ঋণই নয়; বিভিন্ন উপলক্ষে এই কার্ডগুলো গ্রাহকদের বিভিন্ন ধরনের সুযোগ-সুবিধা দিয়ে থাকে। চলুন জেনে নিই, কীভাবে একটি ক্রেডিট কার্ড করা যায়।

ক্রেডিট কার্ড-এর সুবিধাগুলো

দৈনন্দিন জীবনে বিভিন্ন পণ্য বা পরিষেবা ক্রয়ের ক্ষেত্রে ক্রেডিট কার্ড-এর আকর্ষণীয় সুযোগ-সুবিধাগুলোর কারণে প্রতিদিনই এই কার্ডের জনপ্রিয়তা বাড়ছে।

> ব্যয়বহুল পণ্য বা পরিষেবা তাৎক্ষণিকভাবে কেনা যায়।

> অনলাইনে কোনো ঝামেলা ছাড়াই কেনাকাটা করা যায়।

> ক্রেডিট কার্ড দিয়ে কেনাকাটায় রিওয়ার্ড পয়েন্ট-এর সুযোগ থাকে, যেটি বাড়ার ফলে ক্রেডিট কার্ড থেকে খরচের মাধ্যমেই আয়সহ বিভিন্ন মূল্যছাড় এমনকি ফ্রিতে পণ্য বা পরিষেবা ক্রয়ের সুযোগ সৃষ্টি হয়।

> যথেষ্ট পরিমাণে কেনাকাটার পাশাপাশি সময়মত ক্রেডিট কার্ড-এর বিল প্রদান করলে ক্রেডিট কার্ডধারীর সংশ্লিষ্ট ব্যাংক থেকে ঋণ লাভের যোগ্যতার সূচক সংখ্যা বা সিআইবি রেকর্ড বাড়ে।

> ব্যবহৃত ক্রেডিট কার্ড-এর চার্জ বেশি বা অন্য কোনো ক্রেডিট কার্ড-এর সুযোগ-সুবিধা মনে হলে সহজেই বর্তমান কার্ড থেকে সেই কার্ড-এ স্থানান্তরিত হওয়া যায়।

> পেমেন্ট গেটওয়ে বা মার্চেন্ট সেবায় কোনো অসামঞ্জস্যতা ধরা পড়লে ক্রেডিট কার্ড-এ সহজেই টাকা ফেরতের জন্য আবেদন করা যায়, যার জন্য কাগজের চেক অপেক্ষা ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার অধিক নিরাপদ।

> ক্রেডিট কার্ড চুরি বা হারিয়ে গেলে নিকটবর্তী সংশ্লিষ্ট ব্যাংক থেকে দ্রুত অর্থ ফেরতসহ একদম নতুন কার্ড পাওয়া যায়।


ক্রেডিট কার্ড পাওয়ার পূর্বশর্ত

ক্রেডিট কার্ড-এর মাধ্যমে মূলত গ্রাহককে পণ্য বা পরিষেবা ক্রয়ের জন্য অর্থ ঋণ দেওয়া হয়। তাই এই কার্ড দেওয়ার পূর্বে ক্রেডিট কার্ড ইস্যুকৃত ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানটি প্রথমে যাচাই করে নেয় যে, গ্রাহকের সেই অর্থ পরিশোধের সক্ষমতা আছে কি-না।

গ্রাহকের যোগ্যতার উপর নির্ভর করে অর্থ খরচের একটি সীমা নির্ধারণ করা হয় যাকে ক্রেডিট লিমিট বলে। এর অতিরিক্ত খরচ করা যায় না।

ক্রেডিট কার্ড নেওয়ার জন্য মাসিক আয় কমপক্ষে ৩০ হাজার টাকা হতে হয়। মাসিক আয় যত বেশি হয় সেই আয়ের ধরন ও ব্যাংকের নীতিমালা অনুযায়ী ক্রেডিট লিমিটের পরিমাণও বেড়ে যায়।

যেমন প্রতি মাসে ৫০ হাজার টাকা আয় হলে ১ লাখের আশেপাশে (কম-বেশি) কোনো পরিমাণ ক্রেডিট লিমিট পাওয়া যায়।

ক্রেডিট কার্ড আবেদনকারীদের যোগ্যতার ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলো সাধারণত চাকরিজীবীদের নূন্যতম ৬ মাস চাকরি এবং ব্যবসায়ীদের কমপক্ষে ১ বছরের ব্যবসায়ীক লেনদেন যাচাই করে থাকে।

কিছু ব্যাংক ফিক্সড ডিপোজিটের উপর ভিত্তি করে ক্রেডিট কার্ড দিয়ে থাকে। ডাচ-বাংলা, ইস্টার্ন ব্যাংক ৫০ হাজার টাকা ফিক্সড ডিপোজিটের উপর ক্রেডিট কার্ড সরবরাহ করে থাকে।

ক্রেডিট কার্ড আবেদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র

→ প্রার্থীর জাতীয় পরিচয়পত্র

→ দুই কপি পাসপোর্ট সাইজের ছবি

→ টিআইএন (ট্যাক্স আইডেন্টিফিকেশন নাম্বার) সার্টিফিকেট

→ চাকরিজীবীর ক্ষেত্রে নিয়োগপত্র কিংবা স্যালারি সার্টিফিকেট, যেখানে কমপক্ষে ৩০ হাজার টাকার স্যালারি হতে হবে এবং ৬ মাসের ব্যাংক স্টেটমেন্ট।

* ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে ট্রেড লাইসেন্স, মেমোরেন্ডাম অব অ্যাসোসিয়েশন, ১০ লাখ টাকার ব্যবসায়িক লেনদেনসহ ১ বছরের ব্যাংক স্টেটমেন্ট।

*অন্যান্য পেশাজীবীদের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট পেশা নিয়োগের সনদপত্র এবং রেফারেন্স হিসেবে ইউটিলিটি বিলের কপি।

→ রেফারেন্স।

ক্রেডিট কার্ড-এর জন্য আবেদন পদ্ধতি

বর্তমানে প্রতিটি ব্যাংকেরর ওয়েবসাইটে ক্রেডিট কার্ড-এর আবেদন ফর্ম দেওয়া থাকে। সেখান থেকে ডাউনলোড করে যাবতীয় প্রয়োজনীয় তথ্য সরবরাহ পূর্বক সঠিকভাবে ফর্মটি পূরণ করে ব্যাংকের ইমেইলে পাঠানো যেতে পারে। স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক, লঙ্কা বাংলা, সিটি ব্যাংক, ঢাকা ব্যাংক এবং ইস্টার্ন ব্যাংক-এর নিজস্ব অনলাইন আবেদন গ্রহণ সিস্টেম আছে।

আবেদন ফর্ম পূরণের আগে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের ওয়েবসাইট থেকে ক্রেডিট কার্ড সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ তথ্যসমূহ ভালো করে জেনে নিতে হবে। এক্ষেত্রে ব্যাংকের হটলাইনে যোগাযোগ করে সঠিক নির্দেশনা নিয়ে ক্রেডিট কার্ডের আবেদন করা যেতে পারে।

আবেদনের সাথে সকল প্রয়োজনীয় কাগজপত্র স্ক্যান করে ইমেইলে সংযুক্ত করে দিতে হবে। তবে অনলাইন বা অফলাইন যে মাধ্যমেই আবেদন করা হোক না কেন, ক্রেডিট কার্ডটি চূড়ান্তভাবে হাতে আসতে কমপক্ষে ১০ কার্যদিবস সময় লাগতে পারে। কোন কোন ব্যাংকে দুই সপ্তাহ পর্যন্ত সময় লেগে যেতে পারে।

ক্রেডিট কার্ড-এর যাবতীয় খরচ

ক্রেডিট কার্ড-এর প্রধান খরচ হচ্ছে নবায়ন ফি যেটি বছরে একবার পরিশোধ করতে হয়। ডাচ-বাংলা ব্যাংকের ক্ষেত্রে এফডিআর এবং ক্রেডিট কার্ডের ধরনের উপর ভিত্তি করে বার্ষিক খরচ ৫০০ থেকে ২০,০০০ টাকা হতে পারে। সুদ ছাড়া ঋণ পরিশোধের সময় ৫০ দিন।

লঙ্কা বাংলায় বার্ষিক চার্জ ১০০০ থেকে ২৫০০ টাকা। ইস্টার্ন ব্যাংকে ১৭২৫ থেকে ১৩৮০০ টাকা, সিটি ব্যাংকে ৫০০ থেকে ২৫০০০ টাকা, ব্র্যাক ব্যাংকে ১৫০০ থেকে ১৫০০০ টাকা এবং স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকে ১৫০০ থেকে ১২০০০ টাকা। এই ব্যাংকগুলোতে সুদ উপেক্ষা করতে হলে ৪৫ দিনের মধ্যে ঋণ পরিশোধ করতে হয়।

এই খরচগুলো সবই ভ্যাটের বাইরে। এর সাথে আছে স্বল্প পরিমাণে এসএমএস অ্যালার্ট ফি, কার্ডের পিন নাম্বার পরিবর্তনের এবং ফান্ড উত্তোলনের ফি। নতুন নতুন সুবিধা যোগ করা হলে আরও কিছু ফি বাড়ে।


ক্রেডিট কার্ড করার সময় যে বিষয়গুলো জানা জরুরি

ক্রেডিট কার্ড সক্রিয়করণ

ক্রেডিট কার্ড ইস্যু করার পর এর সিস্টেম চালু হতে ১ থেকে ৩ কর্মদিবস সময় লাগতে পারে। কার্ড অ্যাকটিভ হলে মোবাইলে কিংবা ইমেইলে বার্তা চলে আসে। এই সময়টি অবশ্য নির্ভর করে ব্যাংকের উপর। তাই শুরুতেই ক্রেডিট কার্ড সেবাদাতার হটলাইন নাম্বারে যোগাযোগ করে অ্যাকটিভেশন সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে নেয়াটা উত্তম।

পিন নাম্বার

এটিএম বুথ এবং সুপারশপের পস (পয়েন্ট অব সেল)-এ কেনাকাটার সময় ক্রেডিট কার্ডের চার সংখ্যার পিন নাম্বার দরকার হয়। এটি সাধারণত কার্ডের প্যাকেটের ভেতর ভাঁজ করা কাগজে প্রিন্ট করা থাকে। নতুবা হেল্পলাইন নাম্বারে ফোন করে পিন নাম্বারটি সংগ্ৰহ করে নিতে হবে।

ক্রেডিট কার্ড-এর খরচ ও শর্তাবলি

ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারের ওপর বিভিন্ন শর্ত ও চার্জ প্রযোজ্য থাকে। যেমন, ক্রেডিট কার্ডটি মাস্টারকার্ড শ্রেণীর হলে, কেবল মাস্টারকার্ড চিহ্নিত এটিএম বুথ, পস এবং ই-কমার্স সাইটেই এটি ব্যবহার করা যাবে। এ ধরনের তথ্যগুলোর ব্যাপারে নিশ্চিত হয়ে নেওয়া জরুরি।

এছাড়া প্রতিবার এবং প্রতিদিন সর্বোচ্চ কতবার ট্রানজেকশন করা যাবে, ক্রেডিট লিমিট, পরিশোধের দিনক্ষণ ইত্যাদি ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারের ক্ষেত্রে অতীব দরকারি বিষয়।

ক্রেডিট কার্ডের তথ্যাবলি

ক্রেডিট কার্ড নেওয়ার সময় ব্যাংকে যেসব তথ্য প্রদান করা হয়েছে তার একটি অনুলিপি নিজের কাছে রাখা উচিত। কোনোদিন কার্ড হারিয়ে গেলে বা কোনো কারণে নতুনভাবে কার্ড তোলার সময় এই তথ্যগুলো দরকার হবে।

কাদের জন্য ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করা উচিত নয়

ক্রেডিট কার্ড সংগ্রহের যোগ্যতাগুলো অর্জন করে তবেই ক্রেডিট কার্ড নেওয়া উচিত। অন্যথায় আর্থিকভাবে নানা সংকটে পড়তে হয়। এমনকি যোগ্যতা অর্জনের পরেও জীবনের দৈনন্দিন কাজে ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারে সতর্ক থাকতে হয়।

প্রতিটি ব্যাংকেই ক্রেডিট কার্ড-এর বিল পরিশোধে একটি নির্দিষ্ট সুদের হার ধার্য করা থাকে। ক্রেডিট লিমিটের নির্ধারিত সময় ৪৫ দিন পেরিয়ে গেলে সেই সুদসহ ঋণ পরিশোধ করতে হয়। এছাড়া দেরিতে বার্ষিক ফি প্রদান করা হলেও জরিমানার খরচ গুনতে হয়।

এ জন্য প্রতি মাসের একটি নির্দিষ্ট সময়েই সেই নূন্যতম ৩০ হাজার আয় হওয়া আবশ্যক। চাকরিজীবীদের ক্ষেত্রে বেতন গ্রহণে বিলম্ব বা অনিয়মিত হলে সঠিক সময়ে ক্রেডিট কার্ড-এর বিলে পরিশোধে সমস্যা হতে পারে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে অনিয়মিত আয়ের সময়টি ক্রেডিট কার্ড-এর নির্ধারিত সময় ছাড়িয়ে গেলে বিল পরিশোধ নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়তে পারে।

শেষাংশ

শুধু প্রয়োজনীয়তাই নয়; এর পাশাপাশি ভাবতে হবে জীবনযাত্রার অন্যান্য ব্যয়ভার বহন করে ক্রেডিট কার্ড পরিচালনার যথেষ্ট সক্ষমতা আছে কি না। ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে কেনাকাটার পথ সুগম হওয়াতে অহেতুক খরচের প্রবণতা বাড়ে। এটি সম্পূর্ণ মনস্তাত্ত্বিক ব্যাপার হলেও এর ফলে সৃষ্টি হয় চরম আর্থিক অস্থিতিশীলতা। তাই একটি নির্ভরযোগ্য আর্থিক সচ্ছলতার পরেও ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারের ক্ষেত্রে জীবনযাত্রার খরচগুলোতে ভারসাম্যতা বজায় রাখা বাঞ্ছনীয়।

   

About

Popular Links

x