রংপুরের তারাগঞ্জে রূপলাল দাস ও প্রদীপ লালকে হত্যার ঘটনায় করা মামলার এজাহার পুলিশ উদ্দেশ্যমূলকভাবে পাল্টে দিয়েছে বলে নিহতদের পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ।
শুধু তাই নয়, প্রকারান্তরে “হত্যার দায়”” নিহতদের ওপরই চাপানো হয়েছে বলেও মনে করেন নিহত রূপলালের ছেলে ও মেয়ে।
এজাহারে পুলিশ রূপলালের স্ত্রী মালতী ওরফে ভারতী রাণীর যে ফোন নম্বরটি দিয়েছে, তা টঙ্গাইল এলাকার আরেক ব্যক্তির নম্বর। তবে তারাগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত (ওসি) কর্মকর্তা এম এ ফারুক অবশ্য এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
গত ৯ আগস্ট রূপলাল দাস ও তার ভাতিজি জামাই প্রদীপ লালকে বাড়িতে ফেরার পথে বুড়ির হাটে আটক করে মব তৈরি করে ধরে নিয়ে বুড়ির হাট উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। পরে ওই ঘটনার ভিডিও ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে৷ ভিডিওতে কারা রূপলাল ও প্রদীপকে পিটিয়ে হত্যা করেছে তা-ও দেখা যায়। ভিডিও ফুটেজে হত্যাকারীদের চিহ্নিত করা গেলেও তাদের কাউকে পুলিশ এখনো গ্রেপ্তার করতে পারেনি। যে চারজনকে আটক করা হয়েছে, তাদের ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়নি বলে তারাগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ডয়চে ভেলেকে জানিয়েছেন।
এজাহার নিয়ে বিতর্ক
হত্যা মামলা হয় ১০ আগস্ট। কিন্তু মামলার এজাহারে কী আছে তা নিহতদের পরিবারের সদস্যরা জানতেন না। দুইদিন আগে ব্যাংকের কাজে ওই এজাহার সংগ্রহ করা হয়। রূপলাল দাসের মেয়ে নুপুর রাণী দাস ডয়চে ভেলেকে বলেন, "মামলায় অনেক ঘটনা পাল্টে দেওয়া হয়েছে। আর হত্যার জন্য আমার বাবাকেই দায়ী করা হয়েছে।” মামলায় কী কী বিষয় পাল্টে দেওয়া হয়েছে জানতে চাইলে নুপুর বলেন, "আমার বাবাকে আমি বুড়ির হাট মাঠে গিয়ে মৃত অবস্থায় পাই। কিন্তু এজাহারে লেখা হয়েছে তিনি হাসপাতালে মারা গেছেন। আর হত্যাকাণ্ডের সময় সেখানে পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। ভিডিওতেও চার-পাঁচজন পুলিশ সদস্যকে দেখা যায়। কিন্তু এজাহারে তার কোনো উল্লেখ নাই। আমি গিয়ে আমার বাবাকে চিহ্নিত করি। তখনো প্রদীপ দাদা বেঁচে ছিলেন।”
"পুলিশ সব দোষ আমার বাবার ঘাড়েই চাপিয়েছে। আমার বাবা নাকি নিজের কারণেই মারাগেছে। এখন তো আর উনি বেঁচে নাই। ওনাকে দোষ দিলে উনি তো আর প্রতিবাদ করতে পারবেন না। ঘটনার পরের দিন আমার বিয়ের তারিখ ঠিক করতে যাওয়ার কথা ছিল। তাদের ব্যাগে পানীয় ছিল, যেটা আমাদের বিয়ে শাদীতে খায়। কিন্তু ব্যাগে আপেল, কমলা , ডালিম, পেয়ারা, মিষ্টিও ছিল। সেগুলো নিয়ে গেছে। এজাহারে ওই ফল ও মিষ্টির কথা বলা হয়নি। বলা হয়েছে, ব্যাগে দুর্গন্ধযুক্ত পানীয় এবং ঔষধ পায়। কয়েকজন তাদের আটকে তা পান করলে তারা অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং উত্তেজিত জনতা তাদের গণপিটুনি দেয় বলে দাবি করা হয়েছে,” বলেন তিনি।
তার অভিযোগ, "পুলিশ আমার মায়ের কাছ থেকে একটি কাগজে সই নেয়। ওই কাগজে কী লেখা ছিল শোকার্ত অবস্থায় তা তিনি দেখেননি। কিন্তু এখন আমরা দেখছি, পুলিশ তার ইচ্ছেমতো এজাহার দিয়েছে, যার সঙ্গে বাস্তবের মিল নাই।”
আর এজাহারে আসামির সংখ্যা অনেক বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে। ভিডিও ফুটেজে স্পষ্ট যে, ২০-২৫ জন লোক তাদের হত্যা করেছে। কিন্তু আসামি করা হয়েছে ৭০০ জনকে। ভিডিও ফুটেজে যাদের দেখা গেছে, তাদের কাউকেই এখনো আটক করা হয়নি।''
"এছাড়া এজাহারের আমার মায়ের ফোন নম্বর হিসাবে যে নম্বর দিয়েছে, তা আমাদের পরিবারের কারো নম্বর নয়। আমরা ওই নম্বরে ফোন করে দেখেছি সেটা টাঙ্গাইলের একজনের নম্বর,” বলেন নুপুর।
এজাহারের ওই ফোন নম্বরে ডয়চে ভেলের পক্ষ থেকেও ফোন করা হয়। ফোন করে জানা যায় ওই নম্বরটি টাঙ্গাইল সদরের একজন পুলিশ সদস্যের। তারাগঞ্জের মামলার ব্যাপারে তিনি কিছুই জানেন না বলে দাবি তার। ওই পুলিশ সদস্য বলেন, আরও অনেকের ফোন পাচ্ছেন তিনি।
তবে তারাগঞ্জ থানার ওসি এম এ ফারুক ডয়চে ভেলের কাছে দাবি করেন, "মামলার এজাহারে পুলিশ কোনো পবির্তন বা বিকৃতি ঘটায়নি। তাদের পরিবার যে এজাহার দিয়েছে, সেই এজাহার অনুযায়ী মামলা হয়েছে। পুলিশ কোনো উদ্দেশ্য নিয়ে কিছু করেনি।”
অন্যের ফোন না নম্বর রূপলালের স্ত্রী-র হিসেবে দেখানোর বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, "ভুল হতে পারে।”
তিনি দাবি করেন, "এখন পর্যন্ত চারজনকে আটক করেছি। তবে ভিডিও ফুটেজে যাদের চিহ্নিত করা হয়েছে, তাদের আটকের চেষ্টা করা হচ্ছে। এখনো আটক করতে পারিনি।”
পুলিশ এজাহারে অজ্ঞাত আসামি ৭০০ বানিয়ে বিষয়টিকে গণরোষ হিসাবে দেখানোর চেষ্টা করেছে, এজাহারেও সেরকম গণপিটুনির কথা বলা হয়েছে। ফলে এই মামলা আসামিদের সুযোগ করে দেবে বলে এমন আশঙ্কা করা হচ্ছে। রূপলালের ছেলে জয়দাস ডয়চে ভেলেকে বলেন, "মামলাটি সাজানো হয়েছে এমনভাবে, যেন আমার বাবা ও দাদাই তাদের মৃত্যুর জন্য দায়ী। আসামিরা যাতে রেহাই পায়, তার ব্যবস্থা করা হয়েছে।”