রেকর্ড বৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্ত চট্টগ্রামের প্রায় ১৯৭ কিমি সড়ক

টানা আট দিনের ভারী বৃষ্টিতে চট্টগ্রাম নগরের ১৯৬.৭৯ কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা গত ছয় বছরে প্রতিটি বর্ষা মৌসুমে রেকর্ড হওয়া ক্ষতির চেয়েও বেশি।  

বৃষ্টির পানিতে সড়কের বিটুমিন, ইট ও বালু ধুয়ে গিয়ে বিভিন্ন স্থানে ছোট-বড় গর্ত তৈরি হয়েছে। এতে যান চলাচল ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বেড়েছে।

সংবাদমাধ্যম দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড - এর বরাতে এ তথ্য জানা গেছে।  

চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) হিসাবে, ক্ষতিগ্রস্ত সড়কগুলো মেরামতে ৩৪৭ কোটি ৮২ লাখ টাকা প্রয়োজন। কিন্তু ২০২৬-২৭ অর্থবছরে জরুরি  সংস্কারকাজের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে মাত্র ২২ কোটি টাকা।

চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের সচিব মোহাম্মদ আশরাফুল আমিন বলেন, “এবার রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টিপাতের কারণে বিভিন্ন সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বন্দরের আশপাশের আট টন ধারণক্ষমতার সড়কে ২০ থেকে ২২ টন ওজনের পণ্যবাহী যান চলাচল করছে। এতে এসব সড়ক আরও বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।”

আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ৫ জুলাই ভোর ৬টা থেকে ১২ জুলাই বিকেল ৩টা পর্যন্ত সাত দিনে চট্টগ্রামে ১,৩৫৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। এর মধ্যে ৭ জুলাই বিকেল ৩টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় নগরে ৪১২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়, যা গত ৪৩ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।

ভারী বৃষ্টিতে নগরের প্রায় ৮০% এলাকা কয়েক দিন জলাবদ্ধ ছিল। এতে অধিকাংশ সড়কের বিভিন্ন স্থানে বিটুমিন, ইট ও বালু উঠে গিয়ে খানাখন্দ গর্ত তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে পানি জমে থাকা সড়কে ভারী যানবাহন চলাচলের কারণে ক্ষয়ক্ষতি আরও বেড়েছে বলে জানিয়েছেন চসিকের প্রকৌশলীরা।

প্রকৌশলীরা বৃষ্টির পর পুরো নগরকে ছয়টি অঞ্চলে ভাগ করে মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ করেন। গত সোমবার ক্ষতিগ্রস্ত সড়কের তালিকা চূড়ান্ত করা হয়।

তালিকা অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আগ্রাবাদ, পাঠানটুলি, মাদারবাড়ী ও গোসাইলডাঙ্গা এলাকার ছয়টি ওয়ার্ডের সড়ক। এসব এলাকায় মোট ৬৭.৮২ কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দরে যাতায়াতকারী পণ্যবাহী যানবাহন নিয়মিত এসব সড়ক ব্যবহার করে।

এছাড়া দক্ষিণ পাহাড়তলী, জালালাবাদ, পাঁচলাইশ, পশ্চিম ষোলশহর ও শুলকবহর ওয়ার্ডে ২৮.৬২ কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এবার এসব এলাকায় তুলনামূলক বেশি পানি জমেছিল।

চট্টগ্রাম নগরে মোট ৩,৪৫৯টি সড়ক রয়েছে, যেগুলোর সম্মিলিত দৈর্ঘ্য ১,৪৪২.৫ কিলোমিটার। এর মধ্যে ১,০৪৬ কিলোমিটার দীর্ঘ ১,৭৫০টি অ্যাসফল্ট সড়ক, ৩৬৪ কিলোমিটার দীর্ঘ ১,৪২৭টি কংক্রিট সড়ক, ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ ১৪১টি  ব্রিক সলিং সড়ক এবং ১৭.৫ কিলোমিটার দীর্ঘ ১৪১টি কাঁচা সড়ক রয়েছে।

এবারের ক্ষয়ক্ষতি ২০২০ সালের পর প্রত্যেক বর্ষা মৌসুমের রেকর্ড ছাড়িয়েছে। ২০২৫ সালে ১৪২.২৮১ কিলোমিটার, ২০২৪ সালে ৪২ কিলোমিটার, ২০২৩ সালে ৫০.৭১ কিলোমিটার, ২০২২ সালে প্রায় ১০০ কিলোমিটার, ২০২১ সালে ৩৬.২৭ কিলোমিটার এবং ২০২০ সালে ১৭০ কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।

তবে ২০১৭ সালে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরও বেশি ছিল। ওই বছর প্রায় ৩০০ কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।

প্রকৌশল বিভাগের তথ্যমতে, প্রতি অর্থবছরে সড়ক মেরামত বা প্যাচওয়ার্কের জন্য চসিকের বাজেটে আলাদা বরাদ্দ রাখা হয়। সংস্থাটির নিজস্ব অ্যাসফল্ট প্ল্যান্টে তৈরি ইট, বালু, সিমেন্ট ও বিটুমিনের মিশ্রণ দিয়ে বর্ষায় ক্ষতিগ্রস্ত সড়কের ছোট গর্তগুলো ভরাট করা হয়।

চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে প্যাচওয়ার্কের উপকরণ কিনতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২২ কোটি টাকা। এর আগে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ২৬ কোটি টাকা বরাদ্দের বিপরীতে ব্যয় হয়েছিল ৯ কোটি ৭০ লাখ টাকা। 

চসিকের প্রধান প্রকৌশলী মো. আনিসুর রহমান সোহেল বলেন, “যোগাযোগব্যবস্থা সচল রাখা আমাদের প্রথম অগ্রাধিকার। প্রাথমিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত সড়কের গর্তগুলো ইট দিয়ে ভরাট করা হবে। সড়ক শুকিয়ে গেলে প্যাচওয়ার্ক করা হবে। আর যেসব সড়কে উন্নয়নকাজ চলছে, সেগুলোর সংস্কারে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের সম্পৃক্ত করা হবে।”