এবার জবানবন্দি দিলেন সিদ্ধার্থ-মুগ্ধর বন্ধু, মিলে যাচ্ছে আসামিদের বর্ণনা

 

রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়া মহল্লায় রংপুর জিলা স্কুলের সদ্য অবসর নেওয়া শিক্ষক গনপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী, পুত্র ও কন্যাসহ চারজনকে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার আসামি মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থের বন্ধু সীমান্ত মামলার প্রধান সাক্ষী হিসেবে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন।

এদিকে, ছয় দিন অতিবাহিত হলেও চার হত্যা মামলার প্রধান আসামি মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ মাদক সেবন করেছিলেন কি না, তা নিশ্চিত করতে পুলিশ এখনো ডোপ টেস্ট করায়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে মামলার ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন আইনজীবীরা।

মঙ্গলবার কঠোর গোপনীয়তার মধ্য দিয়ে রংপুর মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে এ জবানবন্দি দেন সীমান্ত। মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট রফিকুল ইসলাম তার খাস কামরায় এ জবানবন্দি গ্রহণ করেন। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন হত্যা মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা মহানগর ডিবি পুলিশের ওসি জিন্নাত আলী।

এদিকে মঙ্গলবার সকালে পুলিশ সীমান্তকে তার বাসা থেকে ডেকে নিয়ে আসে। দিনভর এ ব্যাপারে ডিবি পুলিশ তাকে হত্যা মামলার আসামি না সাক্ষী হিসেবে আনা হয়েছে, তা জানতে গণমাধ্যমকর্মীরা একাধিকবার যোগাযোগ করলেও ডিবি পুলিশ পরে জানানো হবে বলে জানায়। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছুই জানানো হয়নি। পরে বুধবার সকালে বিষয়টি জানাজানি হয়।

গনপতি হত্যা মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ডিবি পুলিশের ওসি জিন্নাত আলী জানান, সীমান্ত মামলার অন্যতম প্রধান সাক্ষী হিসেবে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন। জবানবন্দিতে তিনি বলেছেন, গত বৃহস্পতিবার গভীর রাতে শিক্ষক গনপতি চক্রবর্তীর বাড়িতে যাওয়ার আগে তার দুই বন্ধু মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ তাদের বাসায় এসেছিল। তার বাসায় এসে তারা দুজনেই ইয়াবা সেবন করেছে।

তিনি আরও জানান, সীমান্ত আদালতে যে জবানবন্দি দিয়েছেন, তা আসামি মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ দাসের দেওয়া আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির সঙ্গে মিল রয়েছে। আসামিরা সীমান্তের বাড়িতে ইয়াবা সেবনের যে তথ্য দিয়েছিল, সীমান্ত আদালতে সেই কথাই জানিয়েছেন।

এর আগে স্কুলশিক্ষক গনপতি চক্রবর্তীসহ চারজনকে তাদের বাসায় নৃশংসভাবে হত্যার অভিযোগে গ্রেপ্তার দুই আসামি মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনারকে জানিয়েছিলেন, তারা হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করার আগে তাদের বন্ধু সীমান্তের বাসায় গিয়ে মাদক ইয়াবা সেবন করেছিলেন। পুলিশ কমিশনার সংবাদ সম্মেলন করে এ দাবি করেছিলেন।

এদিকে ছয় দিন অতিবাহিত হলেও চার হত্যা মামলার প্রধান আসামি মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ মাদক সেবন করেছিলেন কি না, তা নিশ্চিত করতে ডোপ টেস্ট করা হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।

এ বিষয়ে রংপুরের শীর্ষ আইনজীবী ও ফৌজদারি আইন বিশেষজ্ঞ রইছ উদ্দিন বাদশা বলেন, ‌‌‘‘দুই আসামিকে গ্রেপ্তারের পরপরই তারা মাদক সেবন করেছিল কি না, তা জানতে রংপুর মেডিকেল কলেজে ডোপ টেস্ট করা উচিত ছিল। তাদের প্রস্রাব ও রক্ত পরীক্ষা করা উচিত ছিল।’’

তিনি বলেন,‘‘ ছয় দিন ধরে তারা কারাগারে আটক আছে। এখন যদি ডোপ টেস্ট করা হয় এবং তাদের শরীরে মাদক সেবনের কোনো আলামত পাওয়া না যায়, তাহলে মামলাটির বিচারের সময় আইনগত সমস্যা হতে পারে।’’

তিনি আরও বলেন, ‘‘পুলিশ বলছে, দুই আসামি হত্যার আগে তাদের বন্ধু সীমান্তের বাসায় বসে ইয়াবা সেবন করেছে। এরপর তারা শিক্ষক গনপতি চক্রবর্তীর বাসার ছাদে গিয়ে মাদক সেবন করার সময় শিক্ষক গনপতি বাধা দেওয়ায় তাকে সহ একে একে তার স্ত্রী, পুত্র ও কন্যাকে হত্যা করেছে। এরপর তারা তার বাসাতেও ইয়াবা সেবন করেছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।’’

রইছ উদ্দিন বাদশা বলেন, ‘‘সে ক্ষেত্রে মাদক সেবনকারী হিসেবে আসামিদের ডোপ টেস্ট করা পুলিশের দায়িত্ব। আর যদি ডোপ টেস্টে প্রমাণিত না হয় যে তারা মাদক সেবনকারী, তাহলে এর প্রভাব মামলার বিচারের সময় পড়তে পারে।’’

তবে এ বিষয়ে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ডিবি পুলিশের ওসি জিন্নাত আলী জানান, আসামিদের ডোপ টেস্টের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, ‘‘ডোপ টেস্টের জন্য সোমবার সকালে ডকেট পেয়েছি। ইতোমধ্যে ডোপ টেস্টের জন্য আবেদন করেছি। আজ ডোপ টেস্ট করার পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’’

রংপুরে একই পরিবারের চার খুনের আলোচিত এ হত্যাকাণ্ড নিয়ে মানুষের মনে থাকা বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর তদন্তের মাধ্যমে খোঁজা হবে জানিয়ে জিন্নাত আলী বলেন, ‘‘এই হত্যাকাণ্ড ঘিরে মানুষের মনে যতগুলো প্রশ্ন আছে, সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে তার উত্তর খোঁজা হবে। এ মামলায় ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা হবে।’’

উল্লেখ্য, চার খুনের ঘটনায় গত রোববার নগরীর কোতোয়ালি থানায় নিহত গনপতি চক্রবর্তীর বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন। প্রথমে কোতোয়ালি থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মিলন চ্যাটার্জিকে মামলাটির তদন্ত কর্মকর্তা করা হয়। পরে মামলার তদন্তভার কোতোয়ালি থানা পুলিশের কাছ থেকে মহানগর ডিবিতে হস্তান্তর করা হয়। বর্তমানে ডিবির পরিদর্শক জিন্নাত আলীকে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়েছে।